সমুদ্রের নীল জলরাশির পাশে পরিবারের সঙ্গে কাটবে আনন্দের কিছু মুহূর্ত- এমনই ছিল পরিকল্পনা। অথচ সেই আনন্দযাত্রাই মুহূর্তে পরিণত হলো ভয়াবহ শোকে। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন কেড়ে নিল ১০টি প্রাণ। সেই আগুনে নিভে গেল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলার জীবনও। যে মেয়েটি স্বপ্ন দেখতেন গবেষণাগারে নতুন ওষুধ উদ্ভাবন করে বাঁচাবেন অসংখ্য মানুষের প্রাণ, তার নিজের জীবনটাই রক্ষা করা গেল না। দেশের মাটিতে থেকে গবেষক হওয়ার যে স্বপ্ন তিনি বুকে লালন করেছিলেন, তা আর পূর্ণতা পেল না। টেস্টটিউব, বিকার আর গবেষণার নোটে সাজানো ভবিষ্যৎ পড়ে রইল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে। আর নাবিলা চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
নাবিলার বয়স হয়েছিল ২৭ বছর। মেধা আর অধ্যবসায়ের জোরে বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা ভালো চাকরির সুযোগ তার সামনে খোলা ছিল। কিন্তু তার স্বপ্ন ছিল নিজের দেশকে ঘিরে। সহপাঠীদের বলতেন, বিদেশে নয়, বাংলাদেশেই থাকবেন; দেশের মানুষের জন্য কাজ করবেন। উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশের কোনো শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে গবেষক হিসেবে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। গবেষণার মাধ্যমে এমন ওষুধ উদ্ভাবন করতে চেয়েছিলেন, যা অসুস্থ ও মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচাতে কাজে আসবে। সেই স্বপ্ন পূরণে দিনরাত পরিশ্রম করছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের গবেষণাগারে।
বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল ইসলামের নির্দেশনায় ‘এমএএইচ-এমএমআর রিসার্চ গ্রুপ’-এর হয়ে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন নাবিলা। সাদা ল্যাব কোট গায়ে জড়িয়ে টেস্টটিউব আর বিকারের মধ্যে খুঁজতেন নতুন সম্ভাবনা। গবেষণার প্রতি তার নিষ্ঠার স্বীকৃতিও এসেছিল। সম্প্রতি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নিজের গবেষণার জন্য অর্জন করেন সম্মানজনক ‘বেস্ট পোস্টার প্রেজেন্টেশন অ্যাওয়ার্ড’। দেশ-বিদেশের গবেষকদের অংশগ্রহণে আয়োজিত সেই সম্মেলনে পুরস্কার পাওয়ার পর সহপাঠীদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। স্বপ্ন দেখেছিলেন, একদিন ওষুধশিল্পের গবেষণায় নিজের অবস্থান তৈরি করবেন। অথচ সেই স্বপ্নের পথে আর এগোনো হলো না তার।
শনিবার সকালে ইনানীর রিসোর্টে আগুন লাগার পর প্রাণ বাঁচাতে প্রাণান্ত চেষ্টা করেছিলেন নাবিলা ও তার স্বজনেরা। দাউদাউ আগুনের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়ায় শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বাঁচার পথ খুঁজে না পেয়ে নাবিলার ভগ্নিপতি আশিকুল ইসলাম দোতলার জানালা দিয়ে নিচে লাফ দেন। শরীরে আঘাত পেলেও প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু চোখের সামনে হারিয়ে ফেলেন নিজের স্ত্রীসহ পরিবারের প্রিয়জনদের। কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। আর কয়েকটি মিনিট সময় পেলে হয়তো স্ত্রী ও নাবিলাকে নিচে নামিয়ে আনতে পারতেন- এমন আক্ষেপই বারবার প্রকাশ করছিলেন তিনি। নিজের বেঁচে ফেরাটাও যেন তার কাছে হয়ে উঠেছে অসহনীয় যন্ত্রণা।
ঢাকার খিলগাঁওয়ের বাসায় একের পর এক মুত্যুসংবাদ পৌঁছানোর পর নেমে আসে শোকের ছায়া। নাবিলার বাবা-মায়ের কান্না থামানোর ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না স্বজনেরা। মেয়েকে হারিয়ে ভেঙে পড়েন মা। পরিবারের একাধিক সদস্যকে একসঙ্গে হারানোর শোক তাকে যেন বাকরুদ্ধ করে দেয়। যে মেয়েকে ঘিরে ছিল পরিবারের আশা-আকাক্সক্ষা, যার সামনে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, সেই মেয়ের এমন মর্মান্তিক বিদায় মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে সবার জন্য।
নাবিলার মৃত্যুতে শোক নেমে এসেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন ও কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন যৌথ শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় উপাচার্য বলেন, নাবিলার মতো মেধাবী গবেষকের আকস্মিক প্রয়াণ বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি প্রয়াত শিক্ষার্থীর আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
শুধু একটি পরিবারের নয়, নাবিলার মৃত্যুতে অপূর্ণ থেকে গেল দেশের গবেষণাক্ষেত্রে অবদান রাখার সম্ভাবনাও। তার গবেষণার খাতা, গবেষণাগারের টেবিল আর টেস্টটিউব হয়তো আগের মতোই থাকবে। কিন্তু সেখানে আর ফিরবেন না সাদা ল্যাব কোট পরা সেই তরুণী, যিনি প্রতিটি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে খুঁজতেন নতুন কোনো আবিষ্কারের পথ। নাবিলার অসমাপ্ত গবেষণার পাশে পড়ে থাকবে তার অপূর্ণ ভবিষ্যতের স্মৃতি। আগুনে শুধু একটি প্রাণই নিভে যায়নি, থেমে গেছে দেশের মানুষের জন্য কিছু করার এক তরুণ গবেষকের স্বপ্নযাত্রাও।
