আজকের পত্রিকা ডেস্ক

হুতি বিদ্রোহীদের হামলার পর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় সৌদি আরবে ব্যক্তিগত জেট বা বিমানের ভাড়া ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল ও যুদ্ধঝুঁকির বিমা খরচ বৃদ্ধির মধ্যে দেশ ছাড়তে আগ্রহী ধনী যাত্রী ও প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের চাহিদা বেড়েছে বলে বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও দালালেরা জানিয়েছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, গত ১০ অক্টোবর থেকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট আসা-যাওয়া বন্ধ রয়েছে। হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক প্রাণঘাতী হামলার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, গত রোববারই বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু হবে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি পরে এ বিষয়ে কোনো হালনাগাদ তথ্য দেয়নি। বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারণা, বিমানবন্দর চালু হলেও স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে সময় লাগবে।
বিমান চলাচল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, হামলা শুরুর পর সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল এমন ৫ হাজার ৫০০ টির বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। জার্মানির লুফথানসা ও ইতালির আইটিএ এয়ারওয়েজ সৌদি আরবে ফ্লাইট স্থগিত করেছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ ও এয়ার ফ্রান্স এর আগেই দেশটিতে তাদের ফ্লাইট পিছিয়ে দিয়েছিল।
বিমানের টিকিট বিক্রি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ও দালালদের ভাষ্য, ব্যক্তিগত জেটের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় ভাড়া বেড়েছে। চলতি মাসে সহিংসতা শুরুর পর কয়েকটি বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সৌদি আরবে সেবা বন্ধ করে দেয়। গত সপ্তাহে রিয়াদের উত্তরে আল-কাসিম বিমানবন্দর থেকে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাগামী একটি ফ্লাইটের ভাড়া ছিল ৯৪ হাজার ইউরো। ১৪ যাত্রী বহনে সক্ষম বোম্বার্ডিয়ার গ্লোবাল ৬০০০ মডেলের বিমানটি এ যাত্রায় ব্যবহৃত হয়।
বেসরকারি বিমান পরিবহন প্রতিষ্ঠান লাক্স জেটসের আলেকজান্ডার গ্রাহামের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দর বন্ধ হওয়ার আগে একই ধরনের ফ্লাইটের ভাড়া ছিল প্রায় ৬০ হাজার ইউরো। গ্রাহাম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘বিমানের প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে বলেই ভাড়া বাড়ছে। ফলে যারা এই পরিস্থিতিতেও ফ্লাইট পরিচালনা করতে রাজি আছেন, তাদের কাছ থেকে কিছুটা বেশি ভাড়া দিতে হবে।’
চারজন ব্যক্তিগত জেট পরিবহন নির্বাহীর তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদ ছাড়তে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা এখন শহর থেকে ২০০ মাইলের বেশি দূরের ছোট বিমানবন্দর আল-কাসিম থেকে ব্যক্তিগত বিমান ভাড়া করছেন। ব্যক্তিগত জেট ভাড়ার সামর্থ্য নেই এমন কিছু যাত্রী বাণিজ্যিক ফ্লাইট ধরতে প্রতিবেশী বাহরাইন বা কাতারে গেছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান ফ্লাইটরাডার ২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের স্থানীয় বিমান সংস্থাগুলো আল-কাসিম থেকে দুবাই, কায়রো ও বাহরাইনসহ বিভিন্ন গন্তব্যে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। চারজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাষ্য, কয়েকটি পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান রিয়াদে অবস্থানরত শীর্ষ কর্মকর্তাদের দুবাই বা নিজ নিজ দেশের বাজারে সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করতে তাদের নির্বাহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পরের মতো ব্যাপকভাবে লোকজন সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা এখনো ঘটেনি। সে সময় কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ দুবাই ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। ইরানের ওই হামলাগুলোর সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে প্রায় ৩ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করা হয়েছিল। সৌদি আরবের ওপর এখন পর্যন্ত হামলার সংখ্যার তুলনায় এ সংখ্যা অনেক বেশি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুলনায় সৌদি আরবে পশ্চিমা প্রবাসীর সংখ্যাও কম। সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অঞ্চলের প্রধান আর্থিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ব্যক্তিগত বিমান বুকিংয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এন্টারজেটসের প্রতিষ্ঠাতা চার্লস রবিনসন বলেন, সৌদি আরব থেকে ইউরোপগামী ব্যক্তিগত জেটের ভাড়া সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতগামী ফ্লাইটের ভাড়া ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলারের মধ্যে রয়েছে।
রবিনসন বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দরগুলোতে যাতায়াত করতে আগের চেয়ে কমসংখ্যক বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রাজি হচ্ছে। যারা এখনো এই বাজারে রয়েছে, তারা বিষয়টি ভালোভাবেই জানে। চাহিদা বেশি এবং প্রতিযোগী কম থাকায় কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে অতিরিক্ত ভাড়া যোগ করছে।’
রবিনসনের ভাষ্য, ব্যক্তিগত বিমানের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্রাহক এখন অঞ্চলটির তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ কোনো স্থানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। সেখান থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা। গ্রাহাম জানান, গ্রাহকদের ইউরোপে নিতে বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খালি বিমানও সৌদি আরবে পাঠাচ্ছে।
যুদ্ধের ঝুঁকি ও হামলার খবরের মধ্যেও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে এবং এ অঞ্চলের ভেতরে বিমান চলাচলের চাহিদা শক্তিশালী রয়েছে বলে জানান এডওয়ার্ডস। তিনি বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো বৃহত্তর অঞ্চলের বিমান চলাচলে তেমন কোনো প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে না।’ এডওয়ার্ডসের উদাহরণ অনুযায়ী, সম্প্রতি এক নতুন গ্রাহক পরিবার নিয়ে তুরস্কের আনতালিয়া থেকে দুবাই গিয়ে সেখানে এক সপ্তাহের ছুটি কাটিয়েছেন।

