অনলাইন ডেস্ক
দেশে আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর বিচার ও তদন্ত দ্রুত এগোলেও অধিকাংশ মামলাই দীর্ঘ সময় ধরে তদন্তের জটিলতায় আটকে থাকে। রাজধানীর পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মাত্র চার কার্যদিবসে বিচার শেষ করে দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘটনা দ্রুত বিচারের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, অসংখ্য মামলা মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর তদন্ত পর্যায়েই থমকে থাকে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, যেসব ঘটনা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার পায় কিংবা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নজরে আসে, সেসব মামলার তদন্তে তুলনামূলক তৎপরতা দেখা যায়। অন্যদিকে প্রচারের বাইরে থাকা অধিকাংশ ভুক্তভোগী ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় পার করেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সারা দেশে ৫ হাজার ৪৪৮টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতেই দায়ের হয়েছে ৪১৩টি মামলা। আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব মামলার মধ্যে মাত্র ৬৫টির অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে এবং ১০টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাকি অধিকাংশ মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, ডিএনএ পরীক্ষা, মেডিক্যাল রিপোর্ট এবং বিভিন্ন ফরেনসিক পরীক্ষার ফল পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়াই তদন্ত বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ। অনেক ক্ষেত্রে একটি মেডিক্যাল প্রতিবেদন পেতে এক বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়।
বান্দরবানের থানচিতে এক খিয়াং নারীর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বিচার দাবিতে মানববন্ধন, বিশিষ্ট নাগরিকদের বিবৃতি এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি উঠলেও এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মামলার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, এখনো অভিযুক্তদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
একইভাবে কুমিল্লার মুরাদনগরে স্কুলছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও তদন্ত শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্ট থানার দাবি, অভিযুক্তরা পলাতক এবং ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদনও এখনো হাতে আসেনি।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২৬) অনুযায়ী, আসামি গ্রেপ্তারের পর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান রয়েছে। প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমতি নিয়ে সময় বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে। সাম্প্রতিক সংশোধনীতে ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা শিথিল করে আদালতের বিবেচনার ওপর নির্ভর করার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ধর্ষণ মামলার তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার লক্ষ্যে সময়সীমাও কমিয়ে আনা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিমের মতে, তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ফরেনসিক ও মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়িয়ে সময়মতো প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি মনে করেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ধর্ষণ ও হত্যা মামলার তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আলোচিত ও অনালোচিত—সব মামলার ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত পরিচালনা করা জরুরি। অন্যথায় বিচারপ্রত্যাশীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি আইনের শাসনও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
