ন্যাশনাল ব্যাংকের স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। এদিন ব্যাংকটির সাধারণ গ্রাহকেরা তাঁদের আমানত তুলতে পারবেন চাহিদা অনুযায়ী। আমানত ফেরত চেয়ে গত চার দিনে যেসব গ্রাহক আবেদন করেছেন, তাঁদের আজ আমানত ফেরত দেওয়া শুরু করবে ব্যাংকটি।
ন্যাশনাল ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, আর্থিক সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করতে এরই মধ্যে ৭ হাজার কোটি টাকা ধার পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টির বিপরীতে এই টাকা দিয়েছে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক। গ্যারান্টির বিপরীতে ধারের এই টাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক একগুচ্ছ শর্তও দিয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংককে। যার অন্যতম হলো এই অর্থ থেকে ব্যাংকটির সাবেক বা বর্তমান কোনো পরিচালকের আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া ধারের এই অর্থে কোনো ঋণ দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক গত সোমবার ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো চিঠিতে এসব নির্দেশনা দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ধার হিসেবে দেওয়া তারল্য সহায়তার সুদহার হবে ১০ শতাংশ এবং মেয়াদ ৩ মাস।
জানতে চাইলে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবু জাফর প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের পর ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের চাপ এমনিতেই কমে এসেছে। আমদানি ব্যবসাও বাড়তে শুরু করেছে। এখন জমা ও উত্তোলনের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। আজ থেকে গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
এদিকে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী টাকা ফেরত দিতে ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর ব্যাংকটি গ্রাহকদের কাছ থেকে আবেদন সংগ্রহ করে। ন্যাশনাল ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গত চার দিনে প্রায় ১১ হাজার গ্রাহক দুই হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন জমা দিয়েছেন। গ্রাহকদের এই চাহিদার কথা দেশজুড়ে থাকা ব্যাংকটির শাখা পর্যায় থেকে প্রধান কার্যালয়কে জানানো হয়। সেই অনুযায়ী, প্রধান কার্যালয় থেকে শাখাগুলোকে অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে। শুরুতে কয়েক দিন আবেদনকারী গ্রাহকদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে অন্যদেরও টাকা ফেরত দেওয়া হবে।
এদিকে গ্রাহকের আমানত ফেরত দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে ন্যাশনাল ব্যাংক ধারের যে টাকা পেয়েছে, তা খরচে মানতে হবে ১১ শর্ত। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব শর্ত বেঁধে দিয়েছে। শর্তের মধ্যে রয়েছে ধারের টাকা শোধের আগপর্যন্ত ব্যাংকটি কোনো নগদ লভ্যাংশ দিতে পারবে না। এ ছাড়া ব্যাংকটির সাবেক ও বর্তমান কোনো পরিচালক এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কোনো ঋণ বা বিনিয়োগ, সাবেক বা বর্তমান পরিচালকের নামে বা বেনামে থাকা কোনো আমানত পরিশোধ, নতুন ঋণ/বিনিয়োগ বা বিদ্যমান ঋণ বাড়াতে ব্যবহার যাবে না। এমনকি আগে অনুমোদিত ঋণের অবিতরণকৃত অংশও এই টাকা থেকে বিতরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও বলেছে, ধারের টাকা ব্যাংকটির বিদ্যমান কোনো আন্তব্যাংক দায় বা প্লেসমেন্টের অর্থ পরিশোধ, অন্য কোনো ব্যাংকের ঋণ বা বিনিয়োগ অধিগ্রহণ, ফোর্সড ঋণ বা এলটিআরের (আস্থার বিপরীতে ঋণ) বিপরীতে ঋণপত্রের দায় পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রা কেনা, অন্য কোনো ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখা যাবে না।
এ ছাড়া গ্যারান্টি বহাল থাকা অবস্থায় নতুন সংগৃহীত আমানত শুধু তারল্য পরিস্থিতি উন্নয়নে এবং সাধারণ আমানতকারীদের দায় পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে। ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে ৫ শতাংশের বেশি বাড়ানো যাবে না এবং গ্যারান্টির অর্থ ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ে কাজে লাগানো যাবে না। গ্যারান্টি অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা প্রতি সপ্তাহে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানাতে হবে বলেও নির্দেশনায় বলা হয়।
ব্যাংকটির আর্থিক চিত্র
ব্যাংকটির তথ্য অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ব্যাংকটির আমানত ছিল ৩৩ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। আর ঋণের স্থিতি ছিল ৪৩ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। ফলে ঋণ আমানত অনুপাত (এডিআর) দাঁড়িয়েছে ১৩২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, একটি ব্যাংক ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ৮৭ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে, অর্থাৎ এডিআর হতে পারে ৮৭ শতাংশ। গত জুন শেষে ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৬৬ শতাংশই খেলাপি ছিল।
সর্বশেষ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক, অন্যান্য ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে ন্যাশনাল ব্যাংকের নেওয়া ধারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকটি ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সিকদার গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এ সময় নানা আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটে। এতে ব্যাংকটি বড় ধরনের লোকসানের পাশাপাশি আর্থিক সংকটে পড়ে।
