চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ১৩টি ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং ৬ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিএনপির নেতাকর্মী বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত সংগঠনটির জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ, সংগঠনটির নিজস্ব তথ্য ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৩ জনের মধ্যে বিএনপির ৪৬, জামায়াতের ৮ এবং আওয়ামী লীগের ৬ জন। বাকি ১৩ জনের মধ্যে ১২ জনের রাজনৈতিক পরিচয় অজানা অথবা তাঁরা অন্যান্য দলের সদস্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশ ঘটনায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা দলটির সঙ্গে অন্য রাজনৈতিক দলের সংঘাতের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের সংঘর্ষের ৩২১টি ঘটনায় ১১ জন নিহত এবং ২ হাজার ১৯০ জন আহত হয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক ৪০২টি সহিংসতার ঘটনায় ১৩ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬২৩ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত নয় মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে কারাগারে ৯৫ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ১৭ জনের মৃত্যুর তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে হত্যাকাণ্ডের ৪৬৫টি ঘটনায় ৪৯১টি মরদেহ উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছে সংগঠনটি। এ সময়ে অন্তত একটি গুম এবং একজনকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে ২ হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৯ জনকে।
একই সময়ে ১ হাজার ৮১০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৯৪ জন প্রাণ হারিয়েছে। শ্রমিক নির্যাতনের ৫৮২টি ঘটনায় ১৪৫ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৩ জন আহত হয়েছেন। কর্মক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষাসামগ্রীর অভাবে দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৫৬টি হামলার ঘটনায় ৬২ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা ও ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানির ২৮৮টি ঘটনায় ২৯৭ জন আহত, ৮৭ জন লাঞ্ছিত এবং ৭৭ জন হুমকির মুখে পড়েছেন। এ ছাড়া ২০ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার ৫৮টি ঘটনায় ৪৩৯ জন আহত এবং ৪৬ জন আটক হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টির বেশি মামলায় ৫ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
The post ৯ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭৩ প্রাণহানি, নিহতদের বেশিরভাগই বিএনপির appeared first on ভোরের চেতনা.
