দেশে ব্যবসা পরিচালনা করা বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে গেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) ব্যাংকগুলোর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে দেশে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় কমেছে প্রায় ২২ শতাংশ। তবে মুনাফা ও আয় কমলেও বিদেশে পাঠানো (মুনাফা প্রত্যাবাসন) অর্থের পরিমাণ কমেনি; বরং বেড়েছে। একই সময়ে বিদেশে মুনাফা ও আয়ের অর্থ পাঠানো বেড়েছে ২৫ শতাংশেরও বেশি। দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। তবে প্রতিবেদনে মুনাফা কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলেও এর নির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এ বিষয়ে পলিসি থিঙ্ক অ্যান্ড
রিসার্চের (পিটিআর) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলো সাধারণত বড় আকারের ঋণ ও বিনিয়োগে অভ্যস্ত। কিন্তু বর্তমানে দেশীয় ব্যাংকগুলোই বিনিয়োগে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। তারা ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায় ঋণ দেওয়ার পরিবর্তে ট্রেজারি মার্কেটে বিনিয়োগ করে মুনাফা করছে। এতে অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি কমছে। আর দেশীয় ব্যাংকের বিনিয়োগ না বাড়লে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আস্থাও বাড়বে না। মুনাফা প্রত্যাবাসন বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের রিটার্ন নিয়ে সংশয় এবং দেশের ঋণমান নিয়ে নেতিবাচক বার্তার কারণে বিদেশিরা বেশি হারে মুনাফা নিজ দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
‘বাংলাদেশের বৈদেশিক ব্যাংকসমূহের কার্যক্রম : প্রবণতা এবং পরিচালনাগত অন্তর্দৃষ্টি’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি গতকাল প্রকাশ করা হয়। এতে দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফা, পুনর্বিনিয়োগ ও বিদেশে অর্থ পাঠানোর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে কার্যরত ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৬৭টি শাখা ও ৬টি উপশাখা রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানতের ৪ শতাংশ এবং মোট ঋণ ও অগ্রিমের ২ দশমিক ৭ শতাংশ এসব ব্যাংকের দখলে রয়েছে। যদিও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে তাদের সংগৃহীত আমানত সামান্য কমেছে। গত জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। গত বছরের জুনে এর পরিমাণ ছিল ৮৭ হাজার ৪৯০ কোটি ১০ লাখ টাকা। তবে আমানত কমলেও ঋণ বিতরণ বেড়েছে। এ সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৭০৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ৩৫৫ কোটি ২০ লাখ টাকা।
নিট মুনাফা কমেছে ১৭.৫ শতাংশ : প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলোর করপূর্ববর্তী মুনাফা হয়েছে ৩ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। গত বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে এ মুনাফা ছিল ৪ হাজার ৪৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে করপূর্ববতী মুনাফা কমেছে ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ। কর দেওয়ার পরও মুনাফা কমার প্রবণতা দেখা গেছে। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা ছিল ২ হাজার ৮১৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩২১ কোটি ৫০ লাখ টাকায়। সে হিসাবে নিট মুনাফা কমেছে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
বিদেশে পাঠানো অর্থ বেড়েছে ২৫ শতাংশ : মুনাফা কমলেও বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফা ও আয়ের অর্থ বিদেশে পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে এ খাতে বিদেশে পাঠানো হয়েছে ১ হাজার ৫৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে মুনাফা ও আয়ের অর্থ পাঠানো বেড়েছে ৩১৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা বা ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আগের ছয় মাসের সঙ্গে তুলনা কররেও মুনাফা প্রত্যাবাসন বেড়েছে। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর এই ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মুনাফা প্রত্যাবাসনের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় কমেছে : বিদেশি ব্যাংকগুলোর আয়ের একটি অংশ দেশে পুনর্বিনিয়োগ করা হয়। কিন্তু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৮০ কোটি ১০ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ২ হাজার ৮০৩ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরে পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় কমেছে ৬২৩ কোটি টাকা বা ২২ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলো লভ্যাংশ দেওয়ার জন্য ১৩২ কোটি ৭০ লাখ টাকা সংরক্ষণ করেছে। তবে এ সময়ে লভ্যাংশ বাবদ বিদেশে অর্থ পাঠানোর কোনো হিসাব প্রতিবেদনে নেই। এর আগের ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বরে লভ্যাংশ বাবদ বিদেশে পাঠানো হয়েছিল ৫৬২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এদিকে মুনাফার বিপরীতে করের অনুপাতও কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে মুনাফার ওপর করের অনুপাত ছিল ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ। একই বছরের জুলাই-ডিসেম্বরে তা কমে ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এ হার আরও কমে হয়েছে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ।
খেলাপি ঋণও বেড়েছে : বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণের মানেও কিছুটা অবনতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৬ দশমিক ১ শতাংশ খেলাপি ছিল, যা ২০২৬ সালের জুনে বেড়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।
রপ্তানি-আমদানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা : মুনাফার চিত্রে নিম্নমুখী প্রবণতা থাকলেও দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে। একই সময়ে মোট আমদানি পেমেন্টের ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুন সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় এসেছে ৩৯৪ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩৮১ কোটি ১৫ লাখ ডলার। ফলে এক বছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, এসব ব্যাংকের মাধ্যমে আমদানি পেমেন্ট হয়েছে ৪৬২ কোটি ২০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪০৮ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। সে হিসাবে আমদানি পেমেন্ট বেড়েছে ১৩ শতাংশ।
মূলধন ও তারল্যে শক্ত অবস্থান : বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন ও তারল্য পরিস্থিতিও শক্তিশালী রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে এসব ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিএআর) ছিল ৪১ দশমিক ২১ শতাংশ। একই সময়ে সাধারণ ইক্যুইটি টায়ার-১ মূলধন অনুপাত ছিল ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ ছাড়া মোট সম্পদের বিপরীতে তরল সম্পদের অনুপাত ছিল ৪৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। স্বল্পমেয়াদি দায়ের বিপরীতে তরল সম্পদের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২০৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। তারল্য কভারেজ অনুপাত (এলসিআর) ছিল ৩৫৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং নিট স্থিতিশীল তহবিল অনুপাত (এনএসএফআর) ছিল ১৩৩ দশমিক ৪০ শতাংশ।
