সৌদি আরবে শ্রমবাজারের সংকট, বিমানবন্দরে হামলা বা নিরাপত্তাঝুঁকি, ফ্লাইট বাতিল, ভিসার অনিশ্চয়তা কিংবা কর্মীদের আটকে পড়া-প্রতিটি ঘটনা বাংলাদেশের সামনে একটি নির্মম প্রশ্ন তুলেছে: যে শ্রমিকের ঘামে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়, বিপদের দিনে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো প্রস্তুতি রাষ্ট্রের কতটুকু? প্রবাসীর পাঠানো অর্থের হিসাব রাখতে আমরা যতটা তৎপর, তাঁর জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় কি ততটাই দায়িত্বশীল?
এটি নিছক প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক দূরদর্শিতা ও নাগরিকের মর্যাদার প্রশ্ন। প্রবাসী শ্রমিককে আমরা অর্থনীতির যোদ্ধা বলি, রেমিট্যান্সকে উন্নয়নের প্রাণশক্তি বলি।
অথচ সংকট এলে তাঁদের সুরক্ষার কার্যকর পরিকল্পনা না থাকলে উন্নয়নের এই দর্শনেই গভীর অসংগতি প্রকাশ পায়। যে রাষ্ট্র নাগরিকের উপার্জনকে জাতীয় সম্পদ মনে করে, সেই রাষ্ট্র কি তাঁর বিপদকে একান্ত ব্যক্তিগত দুর্ভাগ্য বা আকস্মিক বিপর্যয় বলে পাশ কাটাতে পারে?
সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটির নির্মাণ, পরিবহন, পরিচ্ছন্নতা, গৃহকর্মসহ বিভিন্ন খাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। সেখানে কর্মসংস্থান সংকুচিত হলে, নিয়োগনীতি বদলালে কিংবা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে হাজারো পরিবার ও বাংলাদেশের অর্থনীতি একসঙ্গে চাপে পড়ে। অথচ কয়েকটি শ্রমবাজারের ওপর অতিনির্ভরতা, সীমিত দক্ষতা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি আমাদের অভিবাসনব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে রেখেছে।
আমরা কি কখনো জাতীয় পর্যায়ে যথাযথভাবে হিসাব করেছি, সৌদি আরবে কয়েক মাসের জন্য শ্রমিক নিয়োগ কমে গেলে কতজন কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, কত পরিবার আয় হারাবে, কত মানুষ ঋণের কিস্তি দিতে পারবেন না? সংকট দীর্ঘায়িত হলে তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকে প্রস্তুত না থাকলে আকস্মিক পরিস্থিতির অজুহাতে দায় এড়ানো যায় না। বিপর্যয় আকস্মিক হতে পারে, কিন্তু তার ক্ষতি কমানোর প্রস্তুতি আকস্মিকভাবে তৈরি হয় না।

একটি দেশের শ্রমবাজারে সুযোগ পাওয়া আর তার ওপর নিজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে ফেলা এক কথা নয়। বাংলাদেশের উচিত বৈদেশিক শ্রমবাজারকে শুধু কর্মী পাঠানোর সুযোগ নয়, জাতীয় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। মধ্যপ্রাচ্যের এক বা দুটি বাজারে চাহিদা বাড়লেই আমরা কর্মী পাঠাতে উৎসাহী হই; কিন্তু বাজার সংকুচিত হলে বিকল্প কর্মসংস্থান, পুনর্বাসন ও আর্থিক সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির অভাব দেখা যায়। ফলে শ্রম অভিবাসন পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কৌশলের বদলে অনেকাংশে সুযোগনির্ভর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। দূরদর্শী রাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত, একটি বাজারে সংকট দেখা দিলেই যেন হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত না হয়ে পড়ে।
যুদ্ধ বা নিরাপত্তাঝুঁকিতে বিমান চলাচল ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন সেই শ্রমিকেরা, যাঁদের চাকরি ও জীবিকা বিদেশযাত্রার ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের মধ্যে থাকেন ছুটিতে দেশে ফেরা কর্মী, নতুন চাকরিতে যোগ দিতে যাওয়া শ্রমিক এবং বিদেশে আটকে পড়া মানুষ। ফ্লাইট বাতিল হলে টিকিটের অর্থ নষ্ট, চাকরিতে যোগদানের সময়সীমা পার হওয়া, চাকরি হারানো, ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়া, আবাসন ও খাবারের ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা আয় বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব পরিস্থিতি শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই সরকারের দায়িত্ব শুধু পরিস্থিতির খবর দেওয়া নয়, কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা।
প্রথমেই নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি। কোন বিমানবন্দর সচল, কোন রুটে ফ্লাইট চলছে, কারা কোথায় আটকে আছেন এবং তাঁদের কী সহায়তা প্রয়োজন-এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ রাখতে হবে। দূতাবাস, কনস্যুলেট, বিমান সংস্থা, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা না থাকলে মানুষ গুজবের ওপর নির্ভর করবেন, দালালের ফাঁদে পড়বেন কিংবা সমাধানের জন্য এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরবেন।
সরকারের উচিত সৌদি আরবে আটকে পড়া কর্মী, দেশে ফিরে কর্মস্থলে ফিরতে না পারা শ্রমিক এবং নতুন নিয়োগ নিয়ে যাত্রার অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের পৃথক তালিকা তৈরি করা। তাঁদের অবস্থান, ভিসার মেয়াদ, চাকরির চুক্তি, নিয়োগকর্তার পরিচয়, বকেয়া বেতন ও আর্থিক দায় নথিভুক্ত করে সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেইস গড়ে তুলতে হবে। দূতাবাস, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি), বিমান সংস্থা ও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সমস্যার ধরন অনুযায়ী সহায়তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। শুধু ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা নয়, কতজনের সমস্যার সমাধান হয়েছে, তাও নিয়মিত জানাতে হবে।
প্রবাসীদের জন্য একটি স্থায়ী জরুরি সুরক্ষা তহবিল ও ঝুঁকিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা থাকা ভীষণ দরকার। যুদ্ধ, মহামারি, বিমান চলাচল বন্ধ কিংবা হঠাৎ শ্রমবাজার সংকুচিত হলে কীভাবে সহায়তা দেওয়া হবে, কোন সংস্থা কী দায়িত্ব পালন করবে এবং অর্থ কোথা থেকে আসবে-এসব আগে থেকেই নির্ধারিত থাকতে হবে।
সংকটের শুরুতেই বহুভাষিক হটলাইন, অনলাইন নিবন্ধন ও জরুরি সহায়তা ডেস্ক সক্রিয় করা প্রয়োজন। আটকে পড়া কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার, নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দিতে হবে। যাঁদের দেশে ফেরানো প্রয়োজন, তাঁদের প্রত্যাবর্তনে সৌদি কর্তৃপক্ষ ও বিমান সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। পাশাপাশি ফ্লাইটের অবস্থা, বিকল্প যাত্রাপথ ও সরকারি নির্দেশনা নিয়মিত জানাতে হবে, যাতে গুজব ও প্রতারণায় তাঁরা আরও বিপদে না পড়েন।
সবচেয়ে জরুরি হলো, যাঁদের ভিসা বা চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মেয়াদ বৃদ্ধি, চাকরি বহাল রাখা কিংবা বৈধভাবে পুনর্নিয়োগের ব্যবস্থা করা। দেশে ফিরে আটকে পড়া শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ নিশ্চিত করতে নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে হবে। নতুন নিয়োগ নিয়ে অপেক্ষমাণ কর্মীদের জন্য বিনা অতিরিক্ত খরচে টিকিট পুনর্নির্ধারণ, অর্থ ফেরত এবং বিকল্প ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার উদ্যোগও হতে হবে বৈধ, যাচাইকৃত এবং কর্মীর সম্মতিভিত্তিক।
এর পাশাপাশি জরুরি আর্থিক সহায়তা, খাবার, আবাসন, চিকিৎসা ও আইনি পরামর্শের জন্য বিশেষ তহবিল সক্রিয় করা জরুরি। যাঁরা বিদেশে যাওয়ার জন্য ঋণ করেছেন অথচ চাকরিতে যোগ দিতে পারছেন না, তাঁদের জন্য ঋণ পরিশোধে সাময়িক ছাড়, কিস্তি পুনর্নির্ধারণ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য সরকারকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। কারণ, ফ্লাইট বাতিলের খবর সংবাদমাধ্যমে এক দিনের শিরোনাম হলেও একজন শ্রমিকের পরিবারের কাছে এর আর্থিক পরিণতি বহু মাসের সংকটে পরিণত হতে পারে।
প্রবাসীদের জন্য একটি স্থায়ী জরুরি সুরক্ষা তহবিল ও ঝুঁকিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা থাকা ভীষণ দরকার। যুদ্ধ, মহামারি, বিমান চলাচল বন্ধ কিংবা হঠাৎ শ্রমবাজার সংকুচিত হলে কীভাবে সহায়তা দেওয়া হবে, কোন সংস্থা কী দায়িত্ব পালন করবে এবং অর্থ কোথা থেকে আসবে-এসব আগে থেকেই নির্ধারিত থাকতে হবে।
সংকটকালে দূতাবাসের ভূমিকা হওয়া উচিত নাগরিকের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। কার্যকর হটলাইন, হালনাগাদ নির্দেশনা, অভিযোগ নিষ্পত্তি ও জরুরি আইনি সহায়তা না থাকলে প্রবাসীকে নিজের উদ্যোগেই পথ খুঁজতে হয়। তাই দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ শাখায় পর্যাপ্ত জনবল ও কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। প্রবাসী শ্রমিককে শুধু বিদেশযাত্রার সময় নয়, চাকরির পুরো মেয়াদজুড়েই রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এসব উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক তৎপরতায় সীমাবদ্ধ না রেখে সময়নির্দিষ্ট জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীর অভিযোগের জন্য একটি অনুসরণযোগ্য শনাক্তকরণ নম্বর চালু করে কোন কর্মকর্তা দায়িত্বে আছেন, কখন সমাধান হবে এবং কী অগ্রগতি হয়েছে-এসব তথ্য কর্মী ও তাঁর পরিবারকে জানাতে হবে।
সরকার কতটি সভা করেছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কতজন শ্রমিকের চাকরি রক্ষা পেয়েছে, কতজনের ভিসার মেয়াদ বেড়েছে, কতজন বকেয়া বেতন পেয়েছেন এবং কত পরিবার জরুরি সহায়তা পেয়েছে। প্রশাসনিক তৎপরতার প্রকৃত মাপকাঠি সভা, বিবৃতি বা আশ্বাসের সংখ্যা নয়, বিপন্ন শ্রমিকের সমস্যার বাস্তব সমাধান। সংকট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়তি সৌজন্য নয়; জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
সৌদি আরবের চলমান সংকট আমাদের সতর্ক করছে-আমরা কি প্রতিবার সাময়িক উদ্যোগ নিয়ে আবার পুরোনো নির্ভরতায় ফিরব, নাকি বিকল্প বাজার, দক্ষতা, সামাজিক সুরক্ষা ও জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তুলব? সংকট একদিন কেটে যাবে। কিন্তু প্রস্তুতির অভাব ও একটি বাজারের ওপর অতিনির্ভরতা থাকলে পরবর্তী সংকটেও একই পরিস্থিতি ফিরে আসবে।
মনে রাখতে হবে, প্রবাসী শ্রমিক কোনো রেমিট্যান্স মেশিন নন; তিনি একজন নাগরিক, একটি পরিবারের শেষ ভরসা। বিপদের সময়ে রাষ্ট্র যদি শুধু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে, তবে উন্নয়নের দাবি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সংকট আসবেই, কিন্তু নাগরিককে একা ফেলে রাখা অনিবার্য নয়। এটি প্রস্তুতি, নীতির অগ্রাধিকার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার পরীক্ষা। প্রবাসীর অর্থ দেশের সম্পদ, তাঁর জীবন রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ড. সেলিম রেজা সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (সিএমএস), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।
* মতামত লেখকের নিজস্ব
