The Sangbad · সাধারণ
অন্ধকার থেকে আলোর বার্তা: মহাঅষ্টমীতে ঐতিহ্যবাহী কুমারী ও সন্ধিপূজা
১৯/১০/২০২৬

শারদীয় দুর্গোৎসবের মহাঅষ্টমীর পবিত্র দিনটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, আনন্দ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে। এদিন রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে কুমারী পূজা এবং অশুভ শক্তি বিনাশের কামনায় ঐতিহ্যবাহী সন্ধিপূজা সম্পন্ন হয়েছে।কুমারী পূজা: জীবন্ত দেবীতে মাতৃরূপের আরাধনাশারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ মহাঅষ্টমীর কুমারী পূজা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মহাবিশ্বের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মূল চালিকাশক্তি বা পরমাদ্যা শক্তি ক্ষুদ্র বীজরূপে প্রাক-বয়ঃসন্ধিকালীন কন্যাকুমারীর মাঝে অবস্থান করে। এই গভীর বিশ্বাস থেকেই মহাঅষ্টমীর দিন কুমারীকে দেবী দুর্গার জীবন্ত রূপ হিসেবে আরাধনা করা হয়।উপমহাদেশের রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠগুলোতে সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের আদর্শ অনুসরণ করে এই ঐতিহ্য পালিত হয়ে আসছে। বহু বছর আগে শ্রীরামকৃষ্ণ তার সহধর্মিণী সারদা দেবীকে 'জগন্মাতা' রূপে পূজা করেছিলেন। কুমারী পূজার মাধ্যমে মানবজাতির প্রতি শ্রদ্ধা, নারীজাতির মর্যাদা রক্ষা এবং ঈশ্বরের প্রতি পরম ভক্তিভাব প্রকাশ পায়।ঢাকায় রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারী পূজায় পূজিত ‘উমা’ঢাকার গোপীবাগে অবস্থিত রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনে সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে কুমারী পূজা শুরু হয়। এ বছর দেবী দুর্গার প্রতীক কুমারী হিসেবে আসন গ্রহণ করে ছয় বছর বয়সী কন্যাকুমারী আর্যা চক্রবর্তী। পূজার নিয়ম অনুযায়ী তার ধর্মীয় নামকরণ করা হয় ‘উমা’। পূজা ও শাস্ত্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে পুণ্যার্থীদের উদ্দেশে আশীর্বাদ জানিয়ে ছোট আর্যা বলে, ‘সবার মঙ্গল হোক।’রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজ জানান, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বিধান অনুযায়ী তারা এই দুর্গোৎসবে প্রাক-বয়ঃসন্ধিকালীন কন্যাকুমারীকে পরমাদ্যা শক্তির জীবন্ত প্রতীক হিসেবে পূজা করে থাকেন।বিবেকানন্দের আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাবেলুর মঠে প্রথম দুর্গোৎসব উদযাপনের স্মৃতিচারণ করে স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ মহারাজ জানান, স্বামী বিবেকানন্দ নিজে উদ্যোগী হয়ে কুমারী পূজার সূচনা করেছিলেন। সেই প্রথম কুমারী পূজায় একসঙ্গে নয়জন কন্যাকুমারীকে পূজা করা হয় এবং স্বামীজি নিজে তাদের একজনকে সশরীরে আরাধনা করেন।কুমারী পূজার উদার ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সাধারণত ধারণা করা হয় শাস্ত্রে কেবল ব্রাহ্মণ কন্যাকে পূজার বিধান রয়েছে। কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ শুধু ব্রাহ্মণ কন্যা নয়, অব্রাহ্মণ কন্যাদেরও কুমারী হিসেবে আরাধনা করেছেন। এমনকি তিনি একজন অমুসলিম কন্যাকেও পরমাদ্যা শক্তির জীবন্ত প্রতীক হিসেবে পূজা করেছিলেন।’ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ১০৮ প্রদীপে সন্ধিপূজা সম্পন্নএদিকে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সোমবার সকালে ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান আচার ‘সন্ধিপূজা’ সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকের বাদ্য, উলুধ্বনি, কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ এবং মন্ত্রোচ্চারণে মুখরিত পরিবেশে ভক্তেরা দেবীর চরণে ১০৮টি পদ্মফুল ও ১০৮টি বেলপাতা নিবেদন করেন। এই পূজার মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং দেশ ও জাতির শান্তি-প্রার্থনা করা হয়।মহানগর সর্বজনীন পূজা মণ্ডপের পুরোহিত বরুণ চক্রবর্তী জানান, অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট - এই দুই তিথির সংযোগস্থলে মোট ৪৮ মিনিট ধরে পঞ্জিকা মতে নির্ধারিত শুভ মুহূর্তে এই পূজা সম্পন্ন হয়।সন্ধিপূজার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য ও নিখুঁত প্রস্তুতিসন্ধিপূজার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে পুরোহিত বরুণ বলেন, ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানোর মূল উদ্দেশ্য হলো মানবজীবনকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে পরিচালিত করা এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। কৈলাশ থেকে মর্ত্যলোকে দেবীর আগমন বার্তা নিয়ে এই পূজায় অশুভ শক্তির বিনাশ কামনা করা হয়।স্বল্প সময়ের এই পূজা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করতে বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানান মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ। তিনি বলেন, ‘মাত্র ৪৮ মিনিটের এই সময়ে ব্যবহারের জন্য পদ্মফুলগুলো সম্পূর্ণ অক্ষত রাখা এবং প্রদীপের শিখা স্থির রাখতে স্বেচ্ছাসেবকেরা ফ্যান বন্ধ রাখাসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।’মহাপ্রসাদ বিতরণ ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থাউৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আগের দিন থেকেই পদ্মফুল সংগ্রহ ও নানা আয়োজন শুরু হয়। মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ জানান, মহানবমীতে ভক্তদের মাঝে বিতরণের জন্য প্রায় আড়াই শ থেকে তিন শ বড় হাঁড়িতে মহাপ্রসাদ রান্নার ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী এই মহাপ্রসাদ বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।প্রতিদিনই হাজার হাজার পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থী মন্দিরে ভিড় করায় উপচে পড়া ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের পাশাপাশি কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗