বাংলাদেশের ক্রিকেটে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব তাঁর। হয়ে উঠেছেন গতির সমার্থক। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গতিময় বোলারের উঠে আসার গল্প ও তাঁর ক্রিকেট–দর্শন নিয়ে কথা বলতে নাহিদ রানার সঙ্গে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল তাঁর ক্রিকেট–জীবন শুরুর দিকের কোচ আলমগীর কবিরকেও। ‘সঙ্গে উৎপল শুভ্র’ নামে সেই পডকাস্ট শনিবার রাতে পাবলিশ হয়েছে প্রথম আলোর ওয়েবসাইট, ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে। সেটির লিখিত রূপ কয়েকটি পর্বে প্রকাশিত হচ্ছে ওয়েবসাইটে। এখানে থাকল শেষ পর্ব।
পডকাস্টের প্রথম পর্ব: নাহিদ রানাকে খুঁজে পাওয়ার গল্প, নাহিদ রানা হয়ে ওঠার গল্প
পডকাস্টের দ্বিতীয় পর্ব: টেপ টেনিস থেকে ক্রিকেট বল: নাহিদ রানার উত্থানের সেই সব দিন
নাহিদ রানা, পাকিস্তানের সঙ্গে তো আপনার জীবনের একটা যোগ আছে। পাকিস্তানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেই সবাই আপনাকে প্রথম চিনেছে। এরপর পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে আরও বেশি। বাংলাদেশ দুবার পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছে, একবার পাকিস্তানের মাটিতে, আরেকবার দেশে। দুবারই আপনার বড় অবদান ছিল। তার আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজে টেস্টে প্রথম ৫ উইকেট পাওয়ার অভিজ্ঞতাটা শুনতে চাই। ৫ উইকেট তো বিশেষ ব্যাপারই। তার ওপর ওয়েস্ট ইন্ডিজে, পরিবেশ আলাদা, মানুষজনও একটু অন্য রকম। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা?
নাহিদ রানা: সত্যি বলতে, ৫ উইকেট পাওয়ার পর কিছুক্ষণ ভালো লাগে। তারপর আবার স্বাভাবিক হয়ে যাই। আমি যদি ম্যাচ জিতি, আর ২ উইকেটও পাই, তাতেও ভালো লাগে। কিন্তু ম্যাচ হেরে গেলে ৫ বা ৬ উইকেট পেয়েও সেই ভালো লাগাটা থাকে না।
আমার দল হেরে গেল, অথচ আমি ৫-৬ উইকেট পেলাম, তখন ভালো লাগাটা আর আগের মতো থাকে না। অন্যদিকে আমি ২ উইকেট পেলাম, কিন্তু দল জিতল, সেই অনুভূতির সঙ্গে অনেক পার্থক্য। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওই ম্যাচে আমরা জিতেছিলাম। আমি দলের জয়ে প্রভাব রাখতে পেরেছিলাম। সে কারণে তখন অনেক আবেগ কাজ করেছিল, খুব ভালো লেগেছিল।
তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাকে নিয়ে কে কী বলছে, সেসবও দেখতাম। ৫ উইকেট পেয়েছি, জোরে বল করছি, মানুষ কী বলছে, পরদিন পত্রিকায় কী লিখেছে, এসব নিয়ে আবেগ কাজ করত। অল্প বয়সে হয়তো এমনটাই হয়।
এখন আর করেন না?
নাহিদ রানা: না, এখন বুঝেছি, মানুষ কী বলল, সেটা নিয়ে আমার এত ভাবার দরকার নেই। আমার কাজই হচ্ছে উইকেট নেওয়া, বাংলাদেশকে ম্যাচ জেতাতে অবদান রাখা। আমি একা ম্যাচ জেতাচ্ছি, এমন নয়। তবে দলকে জেতানোর জন্য নিজের অবদান রাখছি। এই কাজ করার জন্যই আমাকে বাংলাদেশ জাতীয় দলে নেওয়া হয়েছে। এই কাজ করার জন্যই দলের সঙ্গে ফিজিও, ট্রেনারসহ এত মানুষ কাজ করেন। এত দিন পরিশ্রম করে এখানে এসেছি এই কাজটা করার জন্য। তাই এই কাজ নিয়ে অত আবেগপ্রবণ হওয়ার কারণ নেই। আমি নিজেকে বুঝিয়েছি, ‘ইটস মাই জব’, এটা আমার কাজ।
আপনি যখন ভালো করবেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখলে মনে হতে পারে, পৃথিবীর সবাই আপনাকে নিয়েই কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবতা তেমন নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখলে নিজের ভেতরে একধরনের তৃপ্তি চলে আসে। আমি যখন বুঝতে শিখলাম, এই তৃপ্তির কারণে আমার ভেতরের ক্ষুধা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, তখন থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার ও দেখা বন্ধ করে দিয়েছি।

এখন আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নেই?
নাহিদ রানা: আমার ফেসবুক পেজ আছে, কিন্তু আমি চালাই না। অন্য একজন চালান। ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টও নেই।
এখন এমন একটা ডিজিটাল যুগ চলছে, আপনি যা-ই করেন, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে সেটা সামনে চলে আসতে পারে। আপনি না দেখতে চাইলেও সামনে চলে আসে। নিজের ভালো কিছু দেখলে ভালো লাগে, কিন্তু কেউ খারাপ কিছু বললে রাগও হয়। মনে হয়, আমার নামে এমন কথা বলছে কেন, সামনে পেলে দেখে নেব। মানুষের মাথায় এ রকম চিন্তা আসে।
আমি ভেবেছি, ভালোটা দেখব না খারাপটা দেখব, সেটা বড় কথা নয়। আমি আমার কাজ করে যাব। আমি ভালো খেললে মানুষ ভালো বলবে। খারাপ খেললে সমালোচনা করবে। ক্রিকেট এমনই একটা জায়গা, যেখানে আলোচনা ও সমালোচনা থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ ক্রিকেট আবেগ দিয়ে দেখে। আমিও যখন ক্রিকেট দেখতাম, আবেগ দিয়েই দেখতাম। বাংলাদেশ হারলে বলতাম, ‘কী খেলে!’
সেই জায়গা থেকে আমি বুঝেছি, মানুষের সঙ্গে বা স্রোতের সঙ্গে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া উচিত নয়। আমার কাজ কী, সেই কাজটা করতে কী করতে হবে, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। আমাকে নিয়ে কে কী বলছে, সেটা দেখার প্রয়োজন নেই। ভালো করলে ভালো বলবে, খারাপ করলে সমালোচনা করবে। তাই ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে পুরোপুরি দূরে সরে গেছি।
আপনি যা করেছেন, সেটা আসলে খুব সহজ নয়।
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, অনেক কঠিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফেসবুক এমনভাবে মানুষের মনোযোগ টানে যে চাইলেও এড়িয়ে চলা কঠিন। আপনি যখন ঘরে একা থাকবেন, দেখবেন ফেসবুক না চালালে ইউটিউব চালাচ্ছেন, ইউটিউব না হলে ইনস্টাগ্রাম। কিছু না কিছু চালাতেই ইচ্ছা করে।
কিছু না দেখলে মনে হয়, কী যেন নেই, ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। মনে হয়, আর কিছু করার নেই। শুরুতে এমন লাগে। পরে ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে গেলে আর তেমন মনে হয় না।
তাহলে এখন কী করেন? ধরুন, সফরে আছেন, হোটেলের ঘরে একা, অথবা দেশে খেলা চলছে। ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম দেখেন না। অবসর কীভাবে কাটে?
নাহিদ রানা: মাঝে মাঝে বই পড়ার চেষ্টা করি, বাসায় কথা বলি। এভাবেই সময় কাটে।
বই পড়ার অভ্যাস আছে?
নাহিদ রানা: আগে ছিল না। এখন ধীরে ধীরে অভ্যাস করার চেষ্টা করছি।
কী ধরনের বই পড়েন?
নাহিদ রানা: ইসলামিক বই।
মূলত ধর্মীয় বই পড়েন?
নাহিদ রানা: হ্যাঁ। আর বাসায় কথা বলি। এমন নয় যে আমি মানুষ নই, আমারও তো মন চায়। কখনো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে একবার ইউটিউব দেখে নিই।
ইউটিউবে তো ভালো জিনিসও দেখা যায়।
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, তবে আমি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি।
এখন যেসব বড় বড় বোলার আপনার প্রশংসা করছেন, তাঁদের নাম শুনছেন আমার মুখে, অন্যদের কাছেও শুনছেন। তাঁরা একসময় অনেক বড় বোলার ছিলেন, খুব জোরে বল করতেন। ইউটিউবে কি তাঁদের বোলিংয়ের ভিডিও দেখেন?
নাহিদ রানা: এখন একটা বিষয় বুঝি। আমরা অনেক সময় একজনের সঙ্গে আরেকজনের তুলনা করি, প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিই। বলা হয়, ‘ও ভালো করছে, তোমাকেও ওর মতো হতে হবে।’ কিন্তু বিষয়টা এ রকম নয়। একজন এক রকম, আরেকজন আরেক রকম। আমি নাহিদ রানা, আমি আমার মতো। আমি যদি ফিজ ভাইয়ের মতো হতে চাই, তাহলে ফিজ ভাইয়ের মতো হতে পারব না। আমার নিজের মধ্যে কী সামর্থ্য আছে, সেটাই বুঝতে হবে।
আমি অবশ্য অন্য কারও মতো হওয়ার কথা বলছি না। আপনার কৌতূহলের কথা জানতে চাইছি। আপনি যখন বড় হচ্ছিলেন, তখন কি কোনো প্রিয় বোলার ছিলেন? টেলিভিশনে তো অনেকের খেলা দেখেছেন। আমাদের সময়ে সবাইকে দেখা সম্ভব হতো না। অনেকের সম্পর্কে পড়েছি, শুনেছি। কিন্তু এখন ইউটিউবে চাইলে ওয়াসিম আকরামের সেরা বোলিং দেখতে পারবেন, একটার পর একটা ভিডিও আসতেই থাকবে। আপনার কি এমন কোনো বোলার ছিলেন, যাঁর বোলিং দেখে ভালো লাগত? যাঁকে আদর্শ মনে করতেন?
নাহিদ রানা: আমি যখন থেকে একটু একটু করে খেলা বুঝতে শিখেছি, তখন বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দলের খেলা খুব একটা দেখতাম না। সব সময় খেলাধুলা করতাম। নিজে খেলেই সময় পেতাম না, খেলা দেখার চেয়ে খেলতেই বেশি ভালো লাগত।
ছোটবেলায় খেলা খুব একটা বুঝতাম না। পরে যখন বুঝতে শিখলাম, তখন বাংলাদেশের সবার খেলাই ভালো লাগত। ছোটবেলায় বাংলাদেশের ক্রিকেট বলতে শাকিব ভাই, তামিম ভাই, মুশফিক ভাই, মাশরাফি ভাই, রিয়াদ ভাই, এই নামগুলোই বেশি শুনতাম। পরে ধীরে ধীরে আরও অনেকে এলেন। শান্ত ভাই, লিটন ভাই, এঁদের খেলাও দেখেছি।
আপনি যেহেতু ফাস্ট বোলার, বোলারদের মধ্যে এমন কেউ ছিলেন, যাঁর বোলিং দেখে ভালো লাগত?
নাহিদ রানা: বলতে গেলে ফিজ ভাই ও তাসকিন ভাইয়ের বোলিং ভালো লাগে। তবে আমি কাউকে অনুসরণ করে তাঁর মতো হওয়ার চেষ্টা করি না।
আপনি তো স্বদেশি পণ্য কিনে ধন্য হওয়ার পক্ষে! দেশের বাইরের কাউকে দেখবেন না?
নাহিদ রানা: না, আসলে আমি কাউকে অনুসরণ করে তাঁর মতো হওয়ার চেষ্টা করি না। তবে ছোটবেলা থেকে যাঁদের খেলা দেখে ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা বেড়েছে, তাঁদের কথা বলতে পারি। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের খেলা দেখেই আমার ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা আরও বেড়েছে।

ফিজ কোথায় আলাদা? সারা পৃথিবী জানে, সে খুব ভালো কাটার করতে পারে। কাটার মাস্টার বলা হয় তাকে। আপনি কি কখনো মোস্তাফিজের মতো কাটার করার চেষ্টা করেছেন? কেন করেননি?
নাহিদ রানা: ফিজ ভাইয়ের চিন্তাভাবনা আলাদা। শুধু চিন্তা করলেই তো স্কিল চলে আসে না। তাঁর কবজি বা হাতের কাজে হয়তো বিশেষ কিছু আছে, যেটা জন্মগতভাবেও এসেছে। তাঁর কাটার করার ক্ষমতাটা ছোটবেলা থেকেই স্বাভাবিকভাবে ছিল। কিন্তু তিনি ছোটবেলা থেকে বারবার সেটা করতে করতে নিজের মধ্যে তৈরি করেছেন। না চাইলে বা নিয়মিত চেষ্টা না করলে তো আর এটা হতো না।
এখন তিনি কাটারের মাস্টার। কোন সময়ে কী করতে হবে, সেটা তিনি জানেন। নিজের শরীর ও সামর্থ্যও বোঝেন। কোন সময়ে কোন জিনিসটা দরকার, সেটা বুঝতে পারাই তাঁকে আলাদা করেছে। তাঁর চিন্তাভাবনাও ভালো, ইতিবাচক। এসব বিষয় তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
বাংলাদেশের পেস বোলারদের মধ্যে কে আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন? আপনার জীবনযাপন, চিন্তাভাবনা নিয়ে যে কথা বললেন, সেগুলো তো আদর্শ মানসিকতা। আপনি তাঁদের সঙ্গে দিনরাত মিশছেন। আলমগীর যখন খেলতেন, তখন আমাদের পেস আক্রমণ এখনকার মতো ছিল না। আলমগীর, আপনার সঙ্গে কে কে খেলতেন? মঞ্জু?
আলমগীর কবির: মঞ্জু ভাই ছিলেন, আমি ছিলাম, তাপস ছিলেন, আনোয়ার হোসেন মনি ছিলেন। আনোয়ার হোসেন মনি জিম্বাবুয়েতে অনুশীলন ম্যাচে খুব ভালো বোলিং করেছিলেন। এরপর তারেক আজিজ ছিলেন। তারেক আজিজ আমাদের জিম্বাবুয়েতে ওয়ানডে জিতিয়েছিলেন।
আমরা এই কজনই ছিলাম। মাশরাফি চোটের কারণে মাঝেমধ্যে দলে আসত, আবার বাইরে চলে যেত। তারপরও মনে হতো, ও বাংলাদেশের অন্যতম সেরা বোলার। ওর সঙ্গে আমরা যদি একটু সঙ্গ দিতে পারি, তাহলে হয়তো আমাদের বোলিং আক্রমণ আরও ভালো হবে। সেই চিন্তাটা আমাদের মধ্যেও কাজ করত।
এই প্রসঙ্গটা তুললাম এ কারণে, এখন ধরুন, আপনি, শরিফুল, তাসকিন, খালেদ, হাসান মাহমুদ, সাকিব, আরও দু-একজন। আমি ক্রম অনুযায়ী বলছি না। খালেদ এখন টেস্ট দলে নেই, কিন্তু কাউন্টিতে খুব ভালো করেছে। সাকিবও চোটের কারণে কিছুটা বাইরে। আমাদের হাতে এখন পাঁচ-ছয়জন, কখনো সাত-আটজন মানসম্পন্ন পেসার আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন পুল আগে কখনো ছিল না। প্রত্যেকের শক্তির জায়গা আলাদা। আপনি হয়তো খুব জোরে বল করেন, তাসকিন অন্য কিছু ভালো পারেন, হাসান মাহমুদ আরেক ধরনের বোলার।
সব মিলিয়ে আপনাদের মধ্যে একটা পেস বোলিংয়ের দল আছে। পেস বোলারদের তো জুটি বেঁধে বোলিং করতে হয়। ব্যাটিংয়ে যেমন পার্টনারশিপ হয়, বোলিংয়েও হয়। আপনি ভালো বল করছেন, আরেকজন সমানে রান দিয়ে যাচ্ছেন, সেটা হলে তো হবে না।
আপনাদের মধ্যে বোঝাপড়া কেমন? নিজেদের মধ্যে কি স্কিল বা জ্ঞান ভাগাভাগি করেন? আপনি একটা জিনিস ভালো পারেন, সেটা তাসকিনকে বলেন। ফিজ একটা জিনিস পারেন, সেটা আপনাকে বলেন। এই ব্যাপারটা কেমন?
নাহিদ রানা: সত্যি কথা বলব তো? একটা ঘটনা বলি। আমি যখন জাতীয় দলে নতুন এসেছিলাম, তখন ফিজ ভাই, তাসকিন ভাই, তাঁরা বাংলাদেশের বড় তারকা। আমি নতুন একটা ছেলে। কিন্তু তাঁরা আমাকে এমনভাবে দলে আপন করে নিয়েছিলেন, এমনভাবে মিশেছিলেন, আমার কখনো মনে হয়নি, আমি নতুন। এমনও মনে হয়নি, যাঁদের খেলা টেলিভিশনে দেখে এসেছি, তাঁদের সঙ্গে এখন একসঙ্গে খেলছি, বোলিং করছি।
পেস বোলিংয়ের এই সংস্কৃতিটা আমি তাঁদের কাছ থেকে শিখেছি। এখন আমার কাছে যারা জুনিয়র, তাদেরও আমি নতুন বলে অনুভব করতে দিই না। কারণ, আমি ফিজ ভাই ও তাসকিন ভাইদের কাছ থেকেই শিখেছি।
তাঁরা আমাকে এমনভাবে আপন করে নিয়েছিলেন, এমনভাবে ভুল ধরিয়ে দিতেন, যেন তাঁরা জীবনে অনেক কিছু অর্জন করেছেন, সেটা বোঝানোর কোনো প্রয়োজনই নেই। কথাটা হয়তো আগে কখনো মিডিয়ায় বলতাম না, কিন্তু বলছি, পেস বোলারদের মধ্যে এই বিষয়টা আমি শুরু থেকেই দেখেছি। সিনিয়র-জুনিয়র বলে সম্মানের জায়গা অবশ্যই আছে, কিন্তু একসঙ্গে খেতে বসলে বা মাঠে গেলে আমরা বন্ধুর মতো থাকি।
আমার কোনো সমস্যা হলে তাসকিন ভাই বা ফিজ ভাই নিজেরাই বলে দেন। অনুশীলনে আমার কোথাও ভুল হলে তাঁরা এগিয়ে এসে বুঝিয়ে দেন। এমন নয় যে তাঁরা ভাবেন, ‘আমি সিনিয়র, ও জুনিয়র। ও নিজে এসে জিজ্ঞেস করলে বলব।’ এই মানসিকতা আমাদের পেস বোলারদের মধ্যে নেই। এটাই আমাদের আলাদা করেছে।
আমাদের কারও খারাপ হলে অন্যরা সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করে। আমার খারাপ হলে সবাই আমাকে সমর্থন করে। অনুশীলন থেকে ম্যাচ পর্যন্ত, সব জায়গায়। শুধু অনুশীলন বা ড্রেসিংরুমে নয়, মাঠের বাইরেও আমাদের বোঝাপড়া ভালো। মাঠের ভেতরে এক রকম, বাইরে আরেক রকম, এমন নয়। আমরা সব জায়গায় একই রকম। পেস বোলিং গ্রুপটাকে একটা পরিবারের মতো বলতে পারেন। ছোট-বড় ভাইদের মধ্যে যেমন একটা বন্ধুমহল থাকে, আমাদেরও তেমন।
ক্রিকেটারদের আমি সব সময় একটা কথা বলি। পরিবারের সঙ্গে যতটা সময় কাটে, তার চেয়ে বেশি সময় কাটে সতীর্থদের সঙ্গে। ট্যুরে মাসের পর মাস, অনুশীলনে, ক্যাম্পে, একসঙ্গে থাকতে হয়। নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ভালো না হলে টিকে থাকা কঠিন।
আপনাদের পেস বোলিংয়ের যে দলটার কথা বললাম, সেখানে নাহিদ, তাসকিন, মোস্তাফিজ, হাসান মাহমুদ, খালেদ, সাকিব, আরও কয়েকজন আছেন। কারও মধ্যে এমন কোনো বিশেষ গুণ আছে, যেটা আপনি খুব পছন্দ করেন? এমন নয় যে সেটা আপনার নিজেরও থাকতে হবে। অন্য কারও কোনো দিক কি আপনাকে প্রভাবিত করেছে?
নাহিদ রানা: তানজিম সাকিবের ফিটনেস দেখে আমি নিজের মধ্যে একটা জিনিস আনার চেষ্টা করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, অনেকটাই পেরেছি। ওর ফিটনেস দেখে আমার মনে হতো, আমিও তানজিম সাকিবের মতো শরীর তৈরি করব, নিজের ফিটনেস ওর মতো করব।
আমি যখন জাতীয় দলে আসি, তখন তানজিম সাকিব ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি খেলত। পেসারদের মধ্যে ওর ফিটনেস খুব ভালো ছিল। শুরুতে ওর ফিটনেস দেখে একটু ঈর্ষাও হতো। মনে মনে ভাবতাম, ওর চেয়েও ভালো ফিটনেস তৈরি করব।
তানজিম সাকিব আমার সিনিয়র, কিন্তু আমার সঙ্গে সব সময় এমনভাবে আচরণ করে, যেন সিনিয়র বন্ধু। ওর কাছ থেকে আমি মূলত ফিটনেসের বিষয়টাই নিয়েছি। আমার ফিটনেস আগে থেকেই ভালো ছিল হয়তো, কিন্তু ওর শরীরের গঠনটা অনেক অ্যাথলেটিক। একজন অ্যাথলেটের শরীরে যে ধরনের গঠন থাকা দরকার, ওর মধ্যে সেগুলো আছে। ওকে দেখে মনে হয়েছিল, এই বিষয়টা আমাকেও নিজের মধ্যে আনতে হবে। আলহামদুলিল্লাহ, মোটামুটি পেরেছি।
তানজিম সাকিবের চোটটা দুর্ভাগ্যজনক। পেসারদের তো চোট হয়ই। তবে ওর ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে, সময় লাগবে।
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, কারণ ফ্র্যাকচার হয়েছে। ফ্র্যাকচার হলে অস্ত্রোপচার করতে হয়, না হলে স্বাভাবিকভাবে সেরে উঠতে অনেক সময় লাগে।
পিঠে, মেরুদণ্ডে?
নাহিদ রানা: না, পিঠে।
মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচার করে ফিরে আসার উদাহরণ হিসেবে ডেনিস লিলির কথা বলা যায়। আপনার স্যারও তাঁকে চেনেন। চোটের পরও তাঁর ফিরে আসা ছিল অসাধারণ, যদিও ব্যাপারটা খুব কঠিন।
একটু আগে বললেন, ৫ উইকেট পেলেও দল না জিতলে সেই আনন্দ থাকে না। আবার ২ উইকেট নিয়ে দল জিতলে আনন্দটা বেশি। ঠিক আছে। কিন্তু ধরুন, আপনি পঞ্চম উইকেটটা পেলেন ঘণ্টায় ১৪৭ কিলোমিটার গতির বলে। বলটা অফ স্টাম্পের বাইরে পড়ল। ব্যাটসম্যান ভাবলেন, ছেড়ে দিলে বাইরে চলে যাবে। কিন্তু বলটা শাঁ করে ভেতরে ঢুকে স্টাম্প ভেঙে দিল। আর সেটাই আপনার ৫ উইকেট পূর্ণ করল। এই আনন্দের তো তুলনা হয় না। এমন আনন্দ পেয়েছেন কখনো?
নাহিদ রানা: এই আনন্দটা মুহূর্তের। মাঠে যতক্ষণ থাকি, ততক্ষণ থাকে।
কিন্তু এমন আনন্দ পেয়েছেন?
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, শেষ বলে এ রকম করে ৫ উইকেট পেয়েছি। আনন্দ হয়েছে।

আমি কী বলছি, বুঝতে পেরেছেন? মোহাম্মদ রিজওয়ান। অফ স্টাম্পের বাইরে থেকে বল ভেতরে ঢুকে তাঁকে বোল্ড করেছিল।
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, তবে তখন দলেরও ওই উইকেটটা খুব দরকার ছিল। রিজওয়ান দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন, একটা পার্টনারশিপও হচ্ছিল। ওভার কম ছিল, সময়ও কম ছিল। ওই সময়ের মধ্যে আমাদের অলআউট করতে হতো। এটা মিরপুরে হয়েছিল।
আমি আগে থেকে ভেবে রাখিনি যে ওই বলেই উইকেট নেব। পরিস্থিতি যা দাবি করছিল, সেই অনুযায়ী চেষ্টা করেছি। পরিকল্পনাটা কাজে লেগেছে।
দর্শকদের বলি, পাকিস্তানের সঙ্গে মিরপুর টেস্টের কথা বলছি। বাংলাদেশ পাকিস্তানে গিয়ে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে এসেছিল। রাওয়ালপিন্ডিতে দুই টেস্টেই জিতেছিল বাংলাদেশ। এরপর মিরপুরে বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট। সেখানেই নাহিদ রানা মোহাম্মদ রিজওয়ানকে বোল্ড করেন। অফ স্টাম্পের বাইরে থেকে বলটা ভেতরে ঢুকে যায়। এটাকে রিভার্স সুইং বলি, নাকি লেট সুইং, সেটা আলাদা কথা। এই ধরনের বল কি আলমগীর কবিরই নাহিদকে শিখিয়েছিলেন?
আলমগীর কবির: রিভার্স সুইং নিয়ে এখন বাংলাদেশের পেস বোলারদের কোচরা সবাই কাজ করেন। একটা সময় রিভার্স সুইং করলে বলা হতো বলের সঙ্গে কারসাজি করা হচ্ছে। ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিসের সময়ও এ ধরনের কথা উঠত। সবাই বলত, তাঁরা কীভাবে বলটা এভাবে ঘোরাচ্ছেন!
এখন রিভার্স সুইংয়ের ব্যাপারটা সবাই জানে। এটা ফাস্ট বোলিংয়ের অপরিহার্য অংশ হয়ে গেছে। একটা টেকনিক বা কৌশল, যেটাই বলুন, এখন বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচরাও এটা নিয়ে কাজ করেন। তাঁরা পেসারদের ভালোভাবেই রিভার্স সুইং শেখাচ্ছেন।
বাংলাদেশ দলে সবচেয়ে ভালো রিভার্স সুইং কে করান?
নাহিদ রানা: সবাই ভালো করান। এটা একজনের পক্ষে একা করা সম্ভব নয়। বলকে ঠিকভাবে তৈরি করতে হয়। আমাদের দলে একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড় থাকেন, যিনি মিড অন বা মিড অফে থেকে বলের যত্ন নেন। সবাইকেই সাহায্য করতে হয়। একজন যদি বলটা ঠিকভাবে তৈরি করে দেন, তাহলে তো কাজটা সহজ হয়ে যায়।
একজনের নাম বলা কঠিন। দলে অনেকেই আছেন। মুশফিক ভাই থাকেন, এখন অবশ্য তিনি ফিল্ডার। অধিনায়কেরও এখানে ভূমিকা আছে। বলের যত্ন নেওয়া, মাঠে কাকে কোথায় রাখা হবে, কোন বোলারকে কখন বল দেওয়া হবে, এসবই অধিনায়কের পরিকল্পনার অংশ। শান্ত ভাই, মুশফিক ভাই, সৌরভ ভাই, মুমিনুলসহ আরও তরুণ খেলোয়াড়েরা বলের যত্ন নেন। সবাই মিলে কাজটা করেন। তাই একজনের নাম বলা কঠিন।
হ্যাঁ, বল তো একেক সময় একেকজনের কাছে যায়। সবাইকেই কাজটা করতে হয়।
আচ্ছা, পাকিস্তানের প্রসঙ্গে আরেকটু আসি। বাংলাদেশ প্রথমবার পাকিস্তানে যাওয়ার আগে যদি কেউ বলত, বাংলাদেশ সেখানে গিয়ে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে আসবে, তাহলে আমরা হয়তো বলতাম, লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তা–ই না, আলমগীর?
আলমগীর কবির: অবশ্যই। আগে বললে সবাই এমনই ভাবত।
এরপর বাংলাদেশ পাকিস্তানে গিয়ে ২-০ ব্যবধানে জিতল। তখন মনে হলো, ঠিক আছে, পাকিস্তানে জিতেছে, এবার দেশে এসেও জিততে পারে। কিন্তু এরপর আবার বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতল। এটা অবিশ্বাস্য।
আপনার ক্যারিয়ার খুব দীর্ঘ নয়। ১২টি টেস্টের মধ্যে পাকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষে এমন সাফল্য পেয়েছেন। একটা সময় পাকিস্তান ক্রিকেটে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল। এখন টানা চারটি টেস্ট জেতার পর হয়তো বলা যায়, বাংলাদেশও এগিয়ে আছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা চার টেস্ট জেতা আপনার ক্যারিয়ারের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন কি না, জানতে চাই।
নাহিদ রানা: এখন পর্যন্ত হতে পারে। সামনে তো আরও অনেক কিছু আছে।
পাকিস্তানে যাওয়ার সময় কি সত্যিই ভেবেছিলেন, জিততে পারবেন? শান্ত তো আমাকে বলেছিলেন, তাঁরা জেতার জন্যই যাচ্ছেন।
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, অবশ্যই। শান্ত ভাই অধিনায়ক ছিলেন। তিনি তো বলবেনই। তাঁর চিন্তাভাবনা খুব ইতিবাচক। মানসিকভাবেও তিনি শক্তিশালী। মাঠে একজন খেলোয়াড়ের আচরণ দেখেই বোঝা যায়, কে মানসিকভাবে শক্ত, আর কে শুধু কথা বলে। কেউ কথা বলে, আবার মাঠে সেটার প্রমাণও দেয়। শান্ত ভাইয়ের মধ্যে এই বিষয়টা আছে।
এখন পর্যন্ত কয়জন অধিনায়কের অধীনে খেলেছেন? শান্ত, লিটন...
নাহিদ রানা: শান্ত ভাই, লিটন ভাইয়ের অধিনায়কত্বে একটাই টি-টুয়েন্টি খেলেছি। আর মিরাজ ভাইয়ের অধীনেও খেলেছি।
অধিনায়কদের তুলনা করতে গেলে একটু ঝুঁকি আছে। সবাই ভালো, প্রত্যেকের নিজস্ব ধরন আছে। তাঁদের চিন্তাভাবনাও আলাদা।
কিন্তু আপনি যখন বোলিং করেন, ফিল্ড সেটিংয়ের ক্ষেত্রে অধিনায়কেরা কি আপনার মতামত নেন? আপনার কথা কি মূলত শোনা হয়? কখনো কি এমন হয়েছে, আপনি আরেকটা স্লিপ বা গালি চাইছেন, কিন্তু অধিনায়ক ভাবছেন, এখন একটু রক্ষণাত্মক হওয়া দরকার, তাই আপনাকে অন্য জায়গায় বল করতে পাঠিয়ে দিলেন?
নাহিদ রানা: এটা নির্ভর করে অধিনায়ক আপনার ওপর কতটা বিশ্বাস করেন। বিশ্বাস তো এক দিনে তৈরি হয় না। আমি যদি প্রথম ম্যাচেই গিয়ে বলি, ‘ভাই, এটা চাই, ওটা চাই’, তাহলে অধিনায়কের পক্ষে সবকিছু দেওয়া কঠিন। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক বছর খেলার পর যদি অধিনায়কের আপনার ওপর বিশ্বাস তৈরি হয়, তখন বিষয়টা সহজ হয়ে যায়।
আমি যদি অতিরিক্ত একটা স্লিপ চাই, আর অধিনায়ক বিশ্বাস করেন যে সেটা দিলে উইকেট পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাহলে তিনি দেবেন না কেন? দুজনের লক্ষ্যই তো ভালো করা। অধিনায়কের মনে হলে আমার চাওয়া ফিল্ডিং সাজালে উইকেট আসতে পারে, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই সেই সুযোগ দেবেন।
পাকিস্তান সিরিজটা আপনার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন কি না, সেটা কিন্তু এখনো সরাসরি বললেন না।
নাহিদ রানা: আসলে দেশের জন্য আমি এখনো খুব বেশি কিছু করতে পারিনি। আমার ইচ্ছা, দেশের জন্য যখন সত্যিই কিছু করতে পারব, তখন নিজেই মিডিয়ার সামনে এসে বলব। আমার মনে হয় না, এখন পর্যন্ত আমি খুব বেশি কিছু করেছি।
আমি কিন্তু বলছি না, আপনি অনেক কিছু করে ফেলেছেন। আমি বোঝাতে চাইছি, আলমগীর যে সময় খেলেছেন, তখন সব দেশেই একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের টেস্ট খেলা বা ওয়ানডে জেতার হিসাব মুখস্থ বলা যেত। ২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ে সফরে আপনি ছিলেন না? ওয়ানডে দলে ছিলেন না, টেস্ট দলে ছিলেন?
আলমগীর কবির: টেস্টে ছিলাম।
এরপর ওয়ানডে হয়েছিল, তাই না? বাংলাদেশ তখন টানা ৪৭টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেও জিততে পারেনি। ৪৫টি হেরেছিল, দুটি ম্যাচ বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়েছিল। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পর ২০০৪ সালে গিয়ে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জয় এসেছিল। টেস্টেও পরিস্থিতি অনেকটা এমনই ছিল।
এই জন্যই বলছি, ১২টি টেস্টের মধ্যে পাকিস্তানের বিপক্ষে চারটি জয়, তার মধ্যে পাকিস্তানের মাটিতে সিরিজ জয়, এরপর দেশের মাটিতে আবার সিরিজ জয়, আপনার ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত এটা সবচেয়ে বড় অর্জন কি না।
নাহিদ রানা: হতে পারে। কিন্তু আমার নিজের কাছে তেমন মনে হয় না। আমার কাছে সব ম্যাচই প্রায় একই রকম। সত্যি বলতে, যে ম্যাচ খেলে এসেছি, সেটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করি না। আমার চিন্তা থাকে সামনে কী খেলা আছে।
যা করে ফেলেছি, সেটা তো চলে গেছে। সেখান থেকে ভালো কী শিখতে পারি, কোন জায়গায় আমার ঘাটতি ছিল, সেটা বের করার চেষ্টা করি। আমি এটা ভাবি না যে ওই সিরিজটাই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়ে গেছে। একটা সিরিজকে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন বলা কঠিন। আপনি পারফর্ম করলে, আপনার...
আমি একটু থামাই। আপনার কি ভয় হয়, কেউ যদি বলে, পাকিস্তানের বিপক্ষে খুব ভালো খেলেছেন, পাকিস্তানকে উড়িয়ে দিয়েছেন, তখন মানুষ আপনাকে অহংকারী ভাববে? এই ভয় কি আপনার মধ্যে কাজ করে?
নাহিদ রানা: না, আমি এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। মানুষ কী বলবে, সেটা তো আমি থামাতে পারব না। পাকিস্তান সিরিজে ভালো খেলেছি, এটা বলতে আমার খারাপ লাগবে কেন? ভালো তো অবশ্যই লেগেছে। কিন্তু আপনি যে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জনের কথা বলছেন, আমার কাছে মনে হয়, প্রতিটি ম্যাচেই একটু একটু করে ভালো কিছু হয়েছে। শুধু একটা সিরিজকে আলাদা করে সবচেয়ে বড় অর্জন বলা আমার জন্য কঠিন।
মোহাম্মদ রিজওয়ানকে বোল্ড করা বলটা কি আপনার সেরা বল? সবচেয়ে স্মরণীয়?
নাহিদ রানা: হ্যাঁ, বলতে পারেন, ওটা একটা স্মরণীয় বল।
আমার চাপে বলছেন না তো? নইলে হয়তো বলতেন, অন্য কিছু!
নাহিদ রানা: চাপে বলছি না। আপনি যে সময়ের কথা বললেন, ওই উইকেট পাওয়ার অনুভূতিটা আসলেই অন্য রকম ছিল। যে খেলোয়াড় মাঠে কাজটা করেন, তাঁর কাছে অনুভূতিটা এক রকম। আর যাঁরা খেলা দেখেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে ওই উইকেটের অনুভূতি হয়তো আরও আলাদা ছিল।
ম্যাচের অবস্থাটাও তখন এমন ছিল, অন্যভাবে আউট করলেও মনে থাকত। কিন্তু ব্যাটসম্যান বল ছেড়ে দিচ্ছেন, বল ভেতরে ঢুকে স্টাম্প ভেঙে দিচ্ছে, যতবার দেখি অবিশ্বাস্য লাগে। আপনার সেরা মুহূর্তগুলোর একটি তো এটা বলাই যায়।
আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে আপনার স্পেলটা, ছয় উইকেট ছিল?
আলমগীর কবির: ছয় উইকেট শরিফুল পেয়েছিল।
আপনার চার উইকেট ছিল, তাই তো? দেখুন, দুই ছাত্রের মধ্যে আমারই গুলিয়ে যাচ্ছে! শরিফুল ছয় উইকেট পেয়েছিল, তারপরও বাংলাদেশ তৃতীয় ম্যাচটা হেরেছিল। কী অবিশ্বাস্য ম্যাচ ছিল! ওরা জিততে জিততে হেরেছে, আর বাংলাদেশ হারতে হারতে জিতেছে। দুর্দান্ত সিরিজ ছিল।
এরপর আপনি অস্ট্রেলিয়া সফরে যেতে পারলেন না। জানি, এটা আপনার হাতে ছিল না, চোটের কারণে যেতে পারেননি। তারপরও বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় গেল ২৩ বছর পর। আবার কবে যাবে, সেটাও নিশ্চিত নয়। এখন তো অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড ও ভারত নিজেদের মধ্যে খেলতেই বেশি আগ্রহী। ক্রিকেটের বাণিজ্যিক দিকটা অনেক বড় হয়ে গেছে। একসময় ক্রিকেটে অন্যদের সাহায্য করা বা খেলাটাকে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যাপারও ছিল। এখন ব্যবসাটা অনেক বড়।
আপনার খারাপ লাগেনি, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কেউ যদি বলেন, একটুও খারাপ লাগেনি, আমি বিশ্বাস করব না। যে কারোরই খারাপ লাগবে।
নাহিদ রানা: মানুষ হিসেবে কিংবা খেলোয়াড় হিসেবে আফসোস তো থাকেই। কিন্তু পেশাদার জায়গা থেকে চিন্তা করলে এখন আফসোস করে আমি কী করতে পারি? কিছুই তো করতে পারব না। যা হওয়ার, হয়ে গেছে।
এখন আমি ভাবি, সামনে কী করতে পারি। আমি এখন চোটে আছি। কীভাবে ফিট হব, সামনে যে সিরিজগুলো আছে, সেগুলোর জন্য কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করব, সেসব নিয়েই চিন্তা করছি।
মানুষ হিসেবে অবশ্যই খারাপ লাগে। এটা সত্যি। কিন্তু পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে ওই জায়গায় পড়ে থাকলে হবে না। আমাকে সামনে এগোতে হবে। পেছনে যা হয়ে গেছে, সেটা চাইলেও ফিরিয়ে আনতে পারব না। অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে সামনের কাজগুলোও খারাপ হবে। তাই আমি চেষ্টা করি, অতীতের কথা বেশি না ভেবে সামনে কী করতে হবে, সেটা নিয়ে ভাবতে।
