অভিযোগ রয়েছে, অনেক কেন্দ্রে সীমানা প্রাচীর না থাকায় মাদকসেবী ও বহিরাগতদের উপদ্রবে চিকিৎসার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে।
রংপুর জেলার উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো জনবল সংকট ও অবকাঠামোগত নানা সমস্যায় জর্জরিত। পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় কোথাও ফার্মাসিস্ট একা চিকিৎসকের ভূমিকা পালন করছেন। আবার কোথাও অফিসের সাধারণ সহায়ক বা এমএলএসএস সামলাচ্ছেন ফার্মাসিস্টের মূল কাজ। অভিযোগ রয়েছে, অনেক কেন্দ্রে সীমানা প্রাচীর না থাকায় মাদকসেবী ও বহিরাগতদের উপদ্রবে চিকিৎসার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। তালা ভাঙা, চুরি ও নোংরা পরিবেশের সৃষ্টি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সময়মতো কেন্দ্র বন্ধ হওয়া ও প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ।
রংপুর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর সিটি করপোরেশনসহ জেলার আট উপজেলায় মোট উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সংখ্যা ৮৫। তবে অবকাঠামোসহ চালু উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সংখ্যা ৪০।
বদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। দেড় বছর ধরে এ কেন্দ্রে কোনো চিকিৎসক নেই। ফলে ফার্মাসিস্ট মিনহাজুল ইসলাম একাই রোগী দেখা, ওষুধ বিতরণ ও পরিচ্ছন্নতার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা হাসানুর রহমান বলেন, ‘মিনহাজুল ইসলাম ছোটখাটো চিকিৎসা দিচ্ছেন। বিষয়টি এখন মন্দের ভালো।’
মকবুল হোসেন নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর আগে এখানে সপ্তাহে দুইদিন একজন এমবিবিএস চিকিৎসক আসতেন। ওই সেবাটুকুই ছিল কুতুবপুর এলাকার গরিব মানুষের বড় পাওয়া। এখন চিকিৎসক না থাকায় ফার্মাসিস্টের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।’ এলাকাবাসীর দাবি, সরকার যেন দ্রুত এখানে একজন এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ দেয়।
ফার্মাসিস্ট মিনহাজুল ইসলাম জানান, জনবল না থাকায় কেন্দ্রটি প্রায় দেড় বছরের মতো বন্ধ ছিল। তারপর শুধু তিনি ফার্মাসিস্ট হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু দীর্ঘদিনেও চিকিৎসকসহ আর কোনো জনবল দেয়া হয়নি এ কেন্দ্রে। তাই তাকে বাধ্য হয়ে রোগী দেখা, ওষুধ দেয়াসহ সব কাজ করতে হচ্ছে। বিষয়টি তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অবগত করেছেন। তাকে প্রতিদিন ৮০ জনের বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমিত্রা রানী অভিযোগ করেন, বেলা আড়াইটা পর্যন্ত কেন্দ্র খোলা থাকার কথা থাকলেও বেলা ১টার মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়।
একই রকমের অবস্থা গঙ্গাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। এখানে চিকিৎসক থাকলেও দুই বছর ধরে ফার্মাসিস্টের দায়িত্ব পালন করছেন এমএলএসএস মো. আজহারুল ইসলাম। চিকিৎসক রোগী দেখার পর ওষুধ বিতরণ থেকে শুরু করে রোগীদের সামলানোর দায়িত্ব একাই পালন করছেন তিনি। প্রতিদিন ১০০-১৫০ জন রোগী এখানে সেবা নিতে আসেন।
স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে রেজিনা ইয়াসমিন নামের এক রোগী কোমর ব্যথা নিয়ে এসেছেন। ভিমরুলের কামড়ে গুরুতর আহত ২২ মাসের সন্তান ইউসুফকে নিয়ে এসেছেন মা ঊর্মি খাতুন। এছাড়া কয়েকজনকে ডায়রিয়া, জ্বরসহ বিভিন্ন রোগ নিয়ে কেন্দ্রে বসে থাকতে দেখা যায়। কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. সাইয়েদা খাতুন শরিফা সবাইকে দেখে ওষুধ লিখে দেন। কিন্তু ওষুধ পেতে রোগীদের অপেক্ষা করতে হয়। কারণ এমএলএসএস আজহারুল অন্য কাজে বাইরে ছিলেন। পরে আজহারুল এসে প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ দেন।
ফার্মাসিস্টের কাজ করতে সমস্যা হয় কিনা জানতে চাইলে আজহারুল হাসিমুখে জানান, গ্রামের সবাই ডাক্তার। তিনি না দিলে ওষুধ কে দেবে? তবে সচেতন মহলের প্রশ্ন, একজন এমএলএসএসের পক্ষে ফার্মাসিস্টের কাজ করা কতটা ঝুঁকিমুক্ত? চিকিৎসক ডা. সাইয়েদা খাতুন শরিফা জানান, এ কেন্দ্রে তিনি এবং এমএলএসএস ছাড়া কেউ নেই। ফার্মাসিস্ট ও সেকমোর (উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার) পদে লোক থাকলেও তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে রংপুর সদর উপজেলার হরিদদেবপুর উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে লোকবল ঠিক থাকলেও মাদকসেবীদের উৎপাতে অতিষ্ঠ কর্মীরা। সীমানা প্রাচীর না থাকায় বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ ঘটছে। বিদ্যুতের তার ও লাইট চুরির ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। প্রতিবাদ করলে ভোগান্তি আরো বাড়ে। প্রধান দরজার চারটা তালা এরই মধ্যে নষ্ট করা হয়েছে। তালা ও দরজার সামনে নোংরা পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ফার্মাসিস্ট মো. নুর হোসেন। তিনি জানান, প্রতিদিন সেখানেও প্রায় শতাধিক রোগী সেবা নিতে আসেন।
জেলা স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক অরবিন্দু কুমার মোদক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জনবল নিয়োগ হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। যতদূর জানা গেছে, বর্তমান সরকার শিগগিরই চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেবে। পাশাপাশি মাঠকর্মী নিয়োগেও দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
