মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বেড়েছে। সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলা এবং ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের খবরকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাজারে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে জ্বালানি তেলের দর। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ০.৩৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১৩ দশমিক ৭০ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ০.৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৯৯ দশমিক ৮০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে চলতি সপ্তাহে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন তেলের দামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। অঞ্চলটিতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে উৎপাদন, পরিবহন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, তেলক্ষেত্র ও সমুদ্রপথে হামলার ঝুঁকি বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে অপরিশোধিত তেলের দামে।
সৌদি আরবে হামলায় সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরসংলগ্ন সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইয়ানবু বন্দরে হামলা চালানোর পাশাপাশি দেশটির একটি তেলক্ষেত্র ও বিমানবন্দরেও আঘাত হেনেছে।
ইয়ানবু বন্দর সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়লে বিকল্প পরিবহনপথ হিসেবে লোহিত সাগরসংলগ্ন অবকাঠামোর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ফলে এ ধরনের স্থাপনায় হামলার খবর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ তৈরি করে। হামলার কারণে সরবরাহব্যবস্থা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর আরও ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে হামলার খবরের পাশাপাশি প্রকৃত উৎপাদন ও রপ্তানিতে কতটা প্রভাব পড়েছে, সেটিও বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন না ঘটলেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিতে পারেন। এ ধরনের অনিশ্চয়তা তেলের বাজারে দামের ওঠানামা বাড়িয়ে দেয়।
ইরানে নতুন হামলার আশঙ্কা
তেলের দাম বৃদ্ধির আরেকটি বড় কারণ ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে নতুন করে বড় ধরনের যৌথ হামলার পরিকল্পনা করছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আরও জোরালো হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের চলতি সপ্তাহের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী মাসের শুরুতে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সমন্বিত সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। তবে পরিকল্পনার বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য এবং বাস্তবে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার বিষয়টি এক নয়। পরিস্থিতির পরবর্তী অগ্রগতি তেলের বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইরানকে ঘিরে সংঘাত বাড়লে শুধু দেশটির তেল উৎপাদন ও রপ্তানি নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত জ্বালানির উল্লেখযোগ্য অংশ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সেখানে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে আন্তর্জাতিক বাজার দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়।
বছরের শুরু থেকে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৮৫ শতাংশের বেশি
চলতি বছরে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কা এবং ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকলে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।
সামনে কোন দিকে যাবে তেলের বাজার
বিশ্ববাজারে তেলের দাম আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে যাবে, তা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা কতটা সচল থাকে তার ওপর নির্ভর করবে। সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিপথে বাধা সৃষ্টি হলে দাম বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। বিপরীতে, উত্তেজনা কমে আসা এবং সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার নিশ্চয়তা তৈরি হলে বাজারে মূল্যচাপ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
এ অবস্থায় জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য তেলের দামের অস্থিরতা নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশ্ববাজারে দাম দীর্ঘদিন উচ্চপর্যায়ে থাকলে আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
