Published on
:
2 min read
মহিষাসুর নেই, রণচণ্ডী রূপের বদলে মা এখানে দ্বিভুজা। শান্ত মূর্তিতে কোলে আগলে রেখেছেন শিশু গণেশকে। আর এই পুজোকে কেন্দ্র করেই জড়িয়ে রয়েছে ২০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন এক অলৌকিক ইতিহাস। পূর্ববঙ্গের ঢাকা বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী ধর পরিবারের ‘গণেশ জননী’র পুজো আজ দেশভাগের সীমানা পেরিয়ে ঠাঁই পেয়েছে এপার বাংলায়। স্বপ্নাদেশের বিশেষ নিয়ম, তালপাতার পুঁথির মন্ত্রপাঠ আর বলিবিহীন অহিংস আরাধনায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমান ভক্তি ও নিষ্ঠায় পালিত হয়ে আসছে এই পারিবারিক উৎসব।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ঢাকার বিক্রমপুর চিত্রকোটের মুন্সীবাড়ির ধর পরিবারে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল। সাবেকি রীতি মেনে দুর্গাপুজোর পাশাপাশি সপ্তমীর গভীর রাতে সেখানে মা কালীর পুজো ও ছাগবলি হতো। প্রায় দুই শতাব্দী আগে বলির ঠিক আগের মুহূর্তে আচমকাই বলিকাঠ থেকে পালিয়ে এক ছাগল প্রতিমার পিছনে গিয়ে আশ্রয় নেয়। গ্রামবাসীদের সামনে ঘটে যাওয়া এই অবিশ্বাস্য দৃশ্যে স্তম্ভিত হয়ে জ্ঞান হারান পরিবারের প্রধান কাশীনাথ ধর। সেই রাতেই বন্ধ হয়ে যায় বলিদান।
এর পরেই কাশীনাথ স্বপ্নাদেশ পান। তিনি দেখেন, মা দশভুজা নন—দ্বিভুজা ও শান্তরূপিণী। সিংহের পিঠে অধিষ্ঠাত্রী সন্তানদের কল্যাণে অভয়দান করছেন। আর কোলে রয়েছে শিশু গণেশ। চালচিত্রে লক্ষ্মী ও সরস্বতী থাকলেও কার্তিক বা অসুরের কোনও অস্তিত্ব নেই, আছেন শিব ও নন্দী। একই সঙ্গে কাশীর এক ব্রাহ্মণের কাছ থেকে তালপাতায় লেখা বিশেষ পুঁথি এনে এই পুজোর মন্ত্রপাঠের নির্দেশ মেলে। বহু দুর্গম পথ পেরিয়ে পরিবারের এক সদস্য বারাণসীর গঙ্গার ঘাটে পৌঁছলে এক কিশোরী অলৌকিক ভাবে তাঁকে সেই ব্রাহ্মণের কুটিরে পৌঁছে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই পুঁথি উদ্ধার করে শুরু হয় নতুন রূপের ‘গণেশ জননী’র পুজো।
দেশভাগের পরে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কলকাতায় এসে পৌঁছয় ধর পরিবারের এই মাতৃ-আরাধনা। ঢাকুরিয়া, পার্ক সার্কাস ও হাজরা হয়ে টানা ৪০ বছর ধরে অশোকনগরে হতো এই পুজো। তার পরে ২০১৬ সাল থেকে নদিয়ার কল্যাণীতে পূজিত হয়ে আসছেন দেবী। বর্তমানে বহু প্রাচীন বনেদি পুজো হারিয়ে গেলেও, ধর পরিবারের এই পুজোয় নবীন-প্রবীণদের বাঁধন আজও অটুট। সপ্তমীর রাতে কালীপুজো আজও নিয়ম মেনে হয়, তবে ছাগশিশুর সেই অলৌকিক ঘটনার পর থেকে বলিদান চিরতরে বন্ধ। দেবীর এই মাতৃরূপের দর্শন পেতে ভিড় জমান বহু দূরদূরান্তের মানুষও।