কক্সবাজারের রামুতে সম্প্রীতির আবহে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমীতে উপজেলার বাঁকখালী নদীর তীরে প্রতিমা নিরঞ্জন অনুষ্ঠানে পূজারি ও দর্শনার্থীদের মিলনমেলায় পরিণত হয় নদীর দুই পাড়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসবটি হয়ে ওঠে সম্প্রীতির এক অনন্য আয়োজন। এ বছর রামু উপজেলায় ২৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা এবং ১৩টি মণ্ডপে ঘটপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে রামুর বাঁকখালী নদীতে পাঁচটি প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। বাকি ১৯টি প্রতিমা রাজারকুলের রামকুট পুকুর, ঈশান পালের পৈতৃক পুকুর, উত্তর ফতেখাঁরকুলের বণিকপাড়া পুকুর, উমখালী-সংলগ্ন বাঁকখালী নদী ও কক্সবাজারের বঙ্গোপসাগরে বিসর্জন দেওয়া হয়।
বুধবার বিকেলে রামুর ফকিরা বাজারের পূর্ব পাশে বাঁকখালী নদীর বালুচরে প্রতিমা নিরঞ্জন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দুপুর থেকে উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রতিমা ট্রাকে করে ঢাকঢোল ও বাদ্যবাজনার তালে নদীর তীরে নিয়ে আসা হয়। পরে সিঁদুর খেলা, দেবী বরণ ও অশ্রুসজল বিদায়ের মধ্য দিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন দেখতে নদীর দুই তীরে সমবেত হন হাজার হাজার পূজারি ও দর্শনার্থী।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। রামু উপজেলা প্রতিমা নিরঞ্জন উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিভাষ সেনগুপ্ত জিগমীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন রামু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে ফজলুল হক, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কামাল উদ্দীন, রামু উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবুল বশর বাবু, রামু সর্বজনীন কেন্দ্রীয় কালীমন্দির পরিচালনা পরিষদের উপদেষ্টা ননী গোপাল দে ও সুনীল শর্মা। অনুষ্ঠানে চণ্ডীপাঠ করেন রামু সর্বজনীন কেন্দ্রীয় কালীমন্দিরের পুরোহিত সজল ব্রাহ্মল চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিমা নিরঞ্জন উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চন্দন দাশগুপ্ত।
প্রতিমা নিরঞ্জন পরিষদের সহসভাপতি সুশান্ত পাল বাচ্চুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজসেবক আতিকুল হক আতিক এবং রামু সর্বজনীন কেন্দ্রীয় কালীমন্দির দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রূপন ধর। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, এসআরবি-১৫ ব্যাটালিয়নের ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর (ডিএডি) সাইফুল ইসলাম, রামু ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার আবদুল কাদের চৌধুরী, রামু উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সহসভাপতি সুবীর বড়ুয়া বুলু, রামু উপজেলা দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদের সহসভাপতি প্রকাশ সিকদার, রামু তেমুহনী দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কিশোর কুমার বৈদ্য ময়না ও সাধারণ সম্পাদক তড়িৎ চক্রবর্তী, রামু সর্বজনীন কেন্দ্রীয় কালীমন্দির দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক টিটু বিশ্বাস, রামু নাথপাড়া কৃষ্ণ মন্দির দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি তাপস দাশ ও সাধারণ সম্পাদক জয়দেব নাথ, রামু বাজার দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি যীশু রুদ্র ও সাধারণ সম্পাদক অন্তু দে এবং শ্রীকুল দুর্গাপূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ছোটন দে ও সাধারণ সম্পাদক কাজল দে প্রমুখ।
রামু উপজেলা প্রতিমা নিরঞ্জন উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিভাষ সেনগুপ্ত জিগমী বলেন, সম্প্রীতির আবহে উৎসবমুখর পরিবেশে বাঁকখালী নদীতে প্রতিমা নিরঞ্জন সম্পন্ন হয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব হলেও এতে সব ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এ আয়োজন রামুর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকে আরও সুদৃঢ় করে। প্রতিবছর শারদীয় দুর্গোৎসবের বিজয়া দশমীতে রামুর বাঁকখালী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলন ঘটে। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি এ আয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
তিনি আরও জানান, রামু উপজেলা প্রশাসন, রামু থানা পুলিশ, এসআরবি-১৫ ও পূজা উদযাপন পরিষদের সমন্বিত উদ্যোগে অনুষ্ঠান শেষ হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। নদীতে দুর্ঘটনা এড়াতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাও সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করেন।

