রান্নার গ্যাস মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য উপকরণ। অথচ সেই গ্যাসই এখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে উঠেছে। সরকারের নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে। এই সুযোগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অবৈধ ‘ক্রস-ফিলিং’ ব্যবসা। বড় সিলিন্ডার থেকে পাইপের মাধ্যমে ছোট পাত্রে গ্যাস ভরে বিক্রি করা হচ্ছে অলিগলির দোকানে। মানুষের আর্থিক অসচ্ছলতাকে পুঁজি করে পরিচালিত এই ব্যবসা একদিকে ভোক্তার পকেট কাটছে, অন্যদিকে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকা- ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করছে।
শনিবার রূপালী বাংলাদেশে প্রকাশিত বিষেশ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রাজধানীর অনেক মানুষ একবারে ১২ কেজির সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য না থাকায় এক বা দুই কেজি করে গ্যাস কিনছেন। প্রতি কেজি ২০০ থেকে ২২০ টাকা দরে কিনলে ১২ কেজি গ্যাসের জন্য ব্যয় হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬৪০ টাকা। অথচ অক্টোবর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ, আর্থিক সংকটে থাকা মানুষ একদিকে বেশি দাম দিচ্ছেন, অন্যদিকে নিজেদের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছেন ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে।
অবৈধ ক্রস-ফিলিংয়ের বিপজ্জনক দিক হলো, এসব কাজে ব্যবহৃত পাত্রের মান, চাপ সহ্য করার ক্ষমতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য নিশ্চয়তা থাকে না। অনুমোদিত স্থাপনায় নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সিলিন্ডার রিফিল ও লিকেজ পরীক্ষা করা হলেও অলিগলির অননুমোদিত স্থানে এসব ব্যবস্থা উপেক্ষিত হয়। গ্যাসের সামান্য লিকেজ থেকে বদ্ধ ঘরে গ্যাস জমে গেলে আগুনের স্ফুলিঙ্গেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন দুর্ঘটনা ঘটলে বহু মানুষের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই মৃত্যুবাণিজ্য বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
এখানে একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যায়, আইনত নিষিদ্ধ এই ব্যবসা কীভাবে আবাসিক এলাকার অলিগলিতে বিস্তার লাভ করছে? বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জ্বালানি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি কোথায়? শুধু অভিযান চালিয়ে কয়েকটি দোকান বন্ধ করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। নিয়মিত তদারকি, অবৈধ রিফিলিং স্পট শনাক্তকরণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ওজনে কম দেওয়া ও সিলিন্ডারে লোনা পানি ঢোকানোর অভিযোগও তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
এলপিজির বাজারেও কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠা জরুরি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম নির্ধারণ করলেও নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পাওয়া নিশ্চিত করা না গেলে সেই সিদ্ধান্তের সুফল ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে না। সরবরাহব্যবস্থায় কৃত্রিম সংকট, অতিরিক্ত মূল্য আদায় কিংবা কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আমরা মনে করি, সরকারকে একই সঙ্গে অবৈধ ব্যবসা বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে নিরাপদ জ্বালানি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিকল্পের অভাবে মানুষ যেন ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে বাধ্য না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ঘটনার পর ক্ষয়ক্ষতি গোনা নয়, আগেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি নির্মূল করাই হতে হবে সরকারের অগ্রাধিকার।
মানুষের জীবন নিয়ে মুনাফার এই খেলা বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ, বাজারে নিয়মিত নজরদারি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।