ছোটবেলায় আমরা তখন হাজরা রোডে থাকতাম। বিজয়া করতে চারটে বাড়িতে যাওয়া হত— আমার ঠাকুরদার কাছে, দিদার বাড়িতে, গল্ফ ক্লাব রোডে আমার বাবার জেঠুর বাড়িতে আর ভবানীপুরে বাবার পিসির বাড়িতে। আমরাও পরে ১৯৭০ সাল থেকে গল্ফ ক্লাব রোডেই থাকি।
আমার ছোটবেলার গল্ফ ক্লাব রোড ছিল শুনশান, অন্ধকার, খুব কম মানুষজনের আনাগোনা। বাবার হাত ধরে হাজরা থেকে ট্রামে চড়ে আসতাম বাবার জেঠুর বাড়ি, বিজয়ার প্রণাম করতে। সেই বাড়িটা ছিল অনেকটা বড়, বারান্দাটাও ভারী সুন্দর। আমরা ছোটরা জমিয়ে খেলাধুলো করতাম। আমি অবশ্য বিজয়ার খাওয়াদাওয়ার টানেও যেতাম।
আর একটা জায়গা এখন খুব মিস করি— ভবানীপুরে বাবার পিসির বাড়ি। পুরনো দিনের বাড়ি। সরু সিঁড়ি দিয়ে উঠে ছিল পিসিঠাম্মার ঘর। বিজয়ার খাওয়াদাওয়ায় ওই বাড়ির দুটো পদ কখনও ভুলব না— পাঁঠার মাংস দিয়ে ঘুগনি আর পাউরুটির মালপোয়া। পাউরুটির মালপোয়া আমি নিজেও পরে বাড়িতে খুব বানাতাম। বাবার পিসেমশাইকে আমি ‘ঘড়ি দাদুʼ বলতাম। কারণ উনি ঘড়ি নিয়ে আমায় খুব খেলা দেখাতেন। ঘড়ি দাদু আর ঠাম্মার বাড়ি প্রণাম করতে যাওয়া মানেই ওই দুটো অসাধারণ খাবার প্রাপ্তি। অতুলনীয় সে স্বাদ। আমাদের বাড়িতে বিজয়ায় ‘এলো-ঝেলোʼ বানানো হত খুব। আর নিমকি, নাড়ু এ সব তো থাকতই। এই রীতি আমি নিজেও অনেক দিন অবধি চালিয়ে এসেছি। এখন আর পেরে উঠি না।
বিজয়ায় আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বাড়ি যেতে হবে— সেই রীতিটাই তো হারাতে বসেছে। আমার ছেলেদের মধ্যেও সেটা নেই। যদিও আমার বাড়িতে এখনও পুরোপুরি উধাও হয়ে যায়নি এই রেওয়াজ। আমি আর আমার স্বামী আমার এক পিসশাশুড়ির বাড়ি প্রণাম করতে গিয়েছিলাম দশমীতে। তাঁর বয়স সাতানব্বই। এই তো, আমার বড় নাতনি মেঘলাও এসে আমাকে প্রণাম করে গেল।
তবে হ্যাঁ, প্রণাম আর কোলাকুলির রেওয়াজ সত্যি সত্যি উঠে যাচ্ছে কিন্তু! আমাদের ছোটবেলায় যেমন পুজোর পর থেকেই মায়ের সঙ্গে বসে চিঠি লিখতে হত। আমার পিসিকে আমি বড় মামনি বলে ডাকতাম। উনি তখন থাকতেন এলাহাবাদে। কলকাতা থেকে তাঁকে ইনল্যান্ড লেটারে চিঠি পাঠানো হত। মা লিখতেন। তাঁর নীচে আমার প্রণাম-বার্তা থাকত। এখন তো সবাই সব প্রণাম-ভালবাসা-শুভেচ্ছা জানায় হোয়্যাটসঅ্যাপ, ফেসবুকে। বড়জোর ফোনে।
আমাদের পরের প্রজন্মের মধ্যে আমরাই হয়তো রেওয়াজটাকে চারিয়ে দিতে পারিনি। হোয়াটসঅ্যাপ জিনিসটা ভাল লাগে। দরকারিও বটে। কিন্তু বাঙালির ‘কোলাকুলিʼ কি আর তাতে হয়? বিদেশিরা হাগ করা ধরে রাখল। আমরা ক'জন কোলাকুলি করি?
(এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।)
