কালবেলা · সাধারণ
ক্রিলের ল্যাপটপ ট্রেনেই ফেলে যায় চোর
১১/১০/২০২৬

জার্মান পর্যটক ক্রিল ল্যান্ডারের চুরি হওয়া সেই ল্যাপটপ ট্রেনের আসনের নিচে কুঁড়িয়ে পেয়েছেন নাটোরের এক কাপড় ব্যবসায়ী। তবে পুলিশের ধারণা, গণমাধ্যমে খবর দেখে বিপদ বুঝতে পেরে চোর নিজেই ল্যাপটপটি ফেলে যায়।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে ল্যাপটপটি অন হলে ট্র্যাকিং করে নাটোর শহরের কাপড়িয়া পট্টি এলাকার একটি কাপড়ের দোকান থেকে উদ্ধার করা হয়।
এর আগে ল্যাপটপটির অবস্থান শনাক্ত করতে রেলওয়ে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একাধিক এলাকায় অভিযান চালায়।
নাটোর সদর মডেল থানা পুলিশ ল্যাপটপ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কাপড়িয়া পট্টি এলাকার ব্যবসায়ী অমল কুমার সাহা তিতুমীর এক্সপ্রেস ট্রেনে নওগাঁ যাওয়ার সময় আসনের নিচে ল্যাপটপটি পান। পরে ছেলে অন্তর কুমার সাহার সঙ্গে আলোচনা করে পুলিশকে বিষয়টি জানান তিনি। অন্তর কুমার সাহা জার্মান পর্যটক ক্রিলের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে নাটোরের পুলিশ সুপার শরিফুল হক বলেন, ‘চোর মনে করেছে যেহেতু এটা ঝামেলার, তাকে ট্র্যাক করা হতে পারে। এজন্য হয়তো ট্রেনের সিটের নিচে...। আমরা যার কাছ থেকে পেয়েছি, তার কথাগুলোও যাচাই করব। আমরা তার কথাগুলোও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।’
দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তিকে সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, কেউ যদি চিনে থাকে দয়া করে জানাবেন। দেশের ভাবমূর্তি নষ্টের জন্য তাকে আমারে আইনের আওতায় আনতে চাই।’
কীভাবে ল্যাপটপটির সন্ধান মেলে—এ বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, ‘কাপড়িয়া পট্টির অন্তর কুমার সাহার কাছ থেকে ল্যাপটপ উদ্ধার করি।’
অন্তরের বক্তব্যের বরাতে এসপি বলেন, ‘তার বাবা অমল কুমার সাহা বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) নাটোর থেকে নওগাঁ যাবেন। তিতুমীর এক্সপ্রেসে নওগাঁ যাচ্ছিলেন। মাধনগর স্টেশনে পৌঁছালে একটি সিটের নিচে তিনি ল্যাপটপটি পান। পরে এটি নিয়ে তিনি নওগাঁয় শ্বশুরবাড়ি চলে যান।’
সদর থানার তিনি আরও বলেন, ‘ওখানে (নওগাঁ) গিয়ে ছেলে অন্তরের সঙ্গে কথা বলেন। আজ তিনি নাটোর আসেন। আজকে যখন অন হয়, তখন আমাদের টিম ঘটনাস্থলে যায়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে কাপড়িয়া পট্টি এলাকায় অন্তরের কাছ থেকে উদ্ধার করি।’
কাউকে আটক করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে পুুলিশ সুপার বলেন, ‘কাউকে আটক করা হয়নি। তবে অন্তর ও তার বাবাকে নিয়ে আসা হয়েছে। কথাবার্তা বলছি, যদি কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রোববার দুপুরেও ক্রিল ম্যাকবুক লাপটপে লগইন থাকা ইমেইলের মাধ্যমে লোকেশন শনাক্ত করেন। তখন লোকেশন রাজশাহী দেখাচ্ছিল।
ল্যাপটপ ফিরে পাওয়ার খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ক্রিল কালবেলা অনলাইনকে বলেন, ‘অবশেষে আমার ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে। আমি খুব খুশি। রোববার রাতেই আমার ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এখন ভাবছি কালকে ল্যাপটপ নিয়ে তারপর যাব।’
এর আগে গত ৭ অক্টোবর বগুড়ার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা পরিদর্শন শেষে ট্রেনে সান্তাহার হয়ে নাটোর রেলওয়ে স্টেশনে আসেন জার্মান নাগরিক ক্রিল ল্যান্ডার। এ সময় হলুদ ভেস্ট পরা এক যুবক নিজেকে রেলকর্মী পরিচয় দিয়ে তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন।
একপর্যায়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে যাওয়ার আগে নিজের ব্যাগটি ওই যুবকের কাছে রেখে যান ক্রিল। ফিরে এসে ব্যাগসহ ওই যুবককে আর খুঁজে পাননি তিনি। ব্যাগটিতে ল্যাপটপ, ক্যামেরাসহ বেশ কিছু মূল্যবান জিনিসপত্র ছিল।
পুলিশ জানায়, ঘটনার খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ শুরু করেন। ফুটেজে দেখা যায়, হলুদ রঙের কটি পরা এক যুবক কৌশলে ক্রিলের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। পরে সুযোগ বুঝে নিজের কটি খুলে চুরি করা ব্যাগটি এর ভেতরে লুকিয়ে ফেলেন এবং দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, এক যুবকের সঙ্গে নাটোর স্টেশনে নামার পর ক্রিল ওই যুবককে নিয়ে স্টেশনের ভিআইপি বিশ্রামাগারে যান। সেখানে ব্যাগটি যুবকের কাছে রেখে পাশের একটি বুথে যান তিনি। এ সময় ব্যাগ নিয়ে ওই যুবককে সান্তাহারগামী একতা এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠতে দেখা যায়। ফিরে এসে ব্যাগ ও যুবককে না পেয়ে ক্রিল নাটোর সদর থানায় যান।
এরপর চুরি হওয়া মালপত্র উদ্ধারে রেলওয়ে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপরতা শুরু করে। প্রথমে ল্যাপটপটির অবস্থান রাজশাহীর রেলগেট এলাকায় শনাক্ত হয়। পরে রাত ১১টার দিকে ক্রিল রাজশাহীতে পৌঁছালে ল্যাপটপটির অবস্থান মহিলা কলেজের আশপাশে দেখা যায়।
এ সময় রেলওয়ে পুলিশ, রাজশাহী মহানগর পুলিশের বোয়ালিয়া থানা, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও এসআরবির সদস্যরা ওই এলাকায় অভিযান চালান। স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, মেসের মালিক ও কেয়ারটেকারদেরও বিষয়টি জানানো হয়।
ল্যাপটপটিতে কোনো সিম না থাকায় এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। রাতে অবস্থানের কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় এটি বিক্রি করে দেওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীদেরও সতর্ক করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পরদিন সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে আব্দুলপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাছে ল্যাপটপটির অবস্থান শনাক্ত হয়। ওই সময় তিতুমীর ও বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেন সেখানে থাকার কথা ছিল। পরে রেলওয়ে পুলিশ ট্রেন দুটিতে তল্লাশি চালালেও ল্যাপটপ বা ক্যামেরার সন্ধান পায়নি। শেষ পর্যন্ত নাটোর শহরের কাপড়িয়া পট্টি এলাকার একটি কাপড়ের দোকান থেকে ল্যাপটপটি উদ্ধার করা হয়।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗