শ্যামলী ভট্টাচার্য
বাঙালির উৎসবের ইতিহাস কেবল ধর্মবিশ্বাসের ইতিহাস নয়, তা একই সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক বিন্যাস, অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, লোকসংস্কৃতি এবং স্মৃতির ইতিহাস। লক্ষ্মীপুজো সেই ইতিহাসের এক আশ্চর্য অধ্যায়। শারদোৎসবের বিসর্জনের বিষণ্ণতা যখন বাঙালির মনকে স্পর্শ করে, বিজয়ার প্রণাম ও কোলাকুলির রেশ যখন ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে, তখনই আসে কোজাগরী পূর্ণিমার রাত। আকাশে গোল চাঁদ, উঠোনে আলপনা, ঘরের কোণে লক্ষ্মীর আসন, ধানের শিষ, শঙ্খের ধ্বনি, নারকেল নাড়ু, মুড়কি, মোয়া আর পরিবারের মানুষজনের সম্মিলিত উপস্থিতি—সব মিলিয়ে লক্ষ্মীপুজো হয়ে ওঠে বাঙালির ঘরোয়া জীবনের এক অন্তরঙ্গ উৎসব।
‘কোজাগরী’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেগে থাকার ধারণা। লোকবিশ্বাসে, পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করে এবং কে জেগে আছে, কে তার আরাধনায় মগ্ন, তা দেখে। এই বিশ্বাসের ধর্মীয় ব্যাখ্যা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে তার সামাজিক তাৎপর্য। জেগে থাকা মানে শুধু নিদ্রাহীন থাকা নয়; সংসারের প্রতি দায়িত্বশীল থাকা, আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত থাকা এবং নিজের শ্রমের মূল্য উপলব্ধি করাও এর একটি প্রতীকী ব্যাখ্যা হতে পারে।
কৃষিনির্ভর বাংলায় লক্ষ্মীর সঙ্গে ধান, শস্য, গোলা এবং খাদ্যনিরাপত্তার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ফসল ঘরে ওঠার আনন্দ, আগামী দিনের অন্নসংস্থানের আশা এবং কৃষকের শ্রমের স্বীকৃতি—এসবের সঙ্গে লক্ষ্মী আরাধনার ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে। দেবী এখানে নিছক অলৌকিক সম্পদের অধিষ্ঠাত্রী নন; তিনি প্রকৃতি, উৎপাদন এবং মানুষের শ্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত এক সাংস্কৃতিক প্রতীক।
লক্ষ্মীপুজোর প্রতিটি উপাচারের মধ্যেই রয়েছে এক একটি সামাজিক ইতিহাস। ধানের শিষ, চাল, কলা, নারকেল, পান, সুপারি, প্রদীপ, ঘট, আলপনা—এসব উপকরণ নিছক পূজার সামগ্রী নয়। এগুলি বাংলার কৃষি, খাদ্যাভ্যাস, গৃহস্থালি অর্থনীতি এবং লোকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
ধানের শিষের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বাঙালির সম্পদবোধের সঙ্গে জমি ও ফসলের সম্পর্ক কত গভীর। আজ শহুরে মধ্যবিত্তের কাছে সম্পদ বলতে ব্যাঙ্কের সঞ্চয়, বাড়ি, জমি কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা বোঝাতে পারে। কিন্তু কৃষিজীবী সমাজে গোলাভরা ধানই ছিল সমৃদ্ধির প্রত্যক্ষ চিহ্ন। লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকার মধ্যে যেমন দেবীর আগমন কামনা করা হয়, তেমনই তার মধ্যে সংসারে শুভাগমন, অভাবের অবসান এবং অন্নপূর্ণতার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশিত হয়।
আলপনা আবার গ্রামীণ নারীর সৃজনশীলতার এক স্বতন্ত্র প্রকাশ। চালের গুঁড়ো দিয়ে মেঝেতে আঁকা নকশা প্রমাণ করে, শিল্প সব সময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অপেক্ষা করে না। বাড়ির উঠোন, মাটির মেঝে কিংবা বারান্দাই হয়ে ওঠে শিল্পীর ক্যানভাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারীরা এই শিল্পচর্চাকে বহন করেছেন। তাঁদের অনেকের নাম ইতিহাসে লেখা নেই, তাঁদের শিল্পের কোনও প্রদর্শনী হয়নি, কিন্তু তাঁদের হাতেই টিকে থেকেছে বাংলার লোকশিল্পের এক মূল্যবান ধারা।
লক্ষ্মীপুজোর প্রকৃত সামাজিক তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন সংসারের মঙ্গল কামনার পাশাপাশি সংসারকে যাঁরা শ্রম দিয়ে বাঁচিয়ে রাখেন, তাঁদের অধিকার ও মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
দেবীর সামনে প্রদীপ জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি পরিবারের প্রতিটি সদস্য গৃহস্থালির কাজে অংশ নেন, যদি উৎসবের দায়িত্ব কেবল নারীর কাঁধে না থাকে, তবে লক্ষ্মী আরাধনা নিছক আচার থেকে বেরিয়ে সমতার সামাজিক শিক্ষায় পরিণত হতে পারে।
লক্ষ্মীপুজোর কথা বলতে গেলে খাবারের প্রসঙ্গ এড়ানো যায় না। নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, মুড়কি, খই, মোয়া, ফলমূল—এসবের মধ্যে বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির পরিচয় যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ।
বাড়িতে তৈরি খাবারের একটি বিশেষ সামাজিক মূল্য আছে। তার দাম বাজারের পণ্যের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কারও হাতের স্পর্শ, পরিবারের কোনও বয়স্ক মানুষের রেসিপি, মায়ের রান্নাঘরের স্মৃতি, কিংবা শৈশবে পুজোর আগের দিনের ব্যস্ততা। অনেক সময় সেই খাবার তৈরির পদ্ধতিও এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।
এক থালা নাড়ু প্রতিবেশীর বাড়িতে পাঠানো, আত্মীয়ের হাতে প্রসাদ তুলে দেওয়া, বাড়িতে আসা শিশুকে মুড়কি খেতে দেওয়া—এসব ছোট ছোট কাজের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের এক অনানুষ্ঠানিক বিনিময়ব্যবস্থা কাজ করে। এখানে বিনিময়ের প্রধান মুদ্রা অর্থ নয়, আন্তরিকতা।
এই ভাগ করে নেওয়ার সংস্কৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমৃদ্ধি মানে শুধু নিজের ঘরে সঞ্চয় বাড়ানো নয়; অন্যের মুখেও হাসি ফোটানো। যে উৎসব প্রতিবেশীর অভাবের কথা ভুলিয়ে দেয়, তার চেয়ে বড় উৎসব আর কী হতে পারে? আবার এই প্রশ্নও জরুরি—যে পাড়ায় কোনও পরিবার অভাবে লক্ষ্মীপুজোর ন্যূনতম আয়োজনটুকুও করতে পারে না, সেই পাড়ার সমৃদ্ধ পরিবারগুলি তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে কি না।
লক্ষ্মীপুজো বাঙালি হিন্দু পরিবারের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব। তার সেই ধর্মীয় পরিচয়কে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটি উৎসবের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য তার ধর্মীয় সীমানার মধ্যেই সব সময় আবদ্ধ থাকে না।
বাংলার বহু অঞ্চলে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে পারস্পরিক সৌজন্য, আত্মীয়তা এবং দৈনন্দিন সহযোগিতা। কারও বাড়িতে পুজো হলে প্রতিবেশী খোঁজ নিতে আসেন, কেউ প্রসাদ পান, কেউ উৎসবের আনন্দে অংশ নেন। এই সম্পর্কের বাস্তবতা অবশ্য সর্বত্র এক নয়; সামাজিক দূরত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য কিংবা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কখনও কখনও তার মধ্যে বাধাও তৈরি করে।
তবু বাংলার লোকজীবনের একটি মূল্যবান শিক্ষা হল, মানুষের সম্পর্ককে কেবল ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পাশাপাশি বসবাস, বিপদে পাশে দাঁড়ানো, অসুখে খবর নেওয়া, পারিবারিক অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করা—এসবের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় সামাজিক বিশ্বাস।
এই বিশ্বাসকে শক্তিশালী করাই উৎসবের একটি মানবিক সম্ভাবনা। লক্ষ্মীপুজোকে তাই কোনও সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার উপলক্ষ না করে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার উপলক্ষ হিসেবে দেখা যায়।
দেবী লক্ষ্মীর সামনে যে সমৃদ্ধির প্রার্থনা করা হয়, সেই সমৃদ্ধি যদি কেবল একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তার সামাজিক অর্থ অসম্পূর্ণ। সমৃদ্ধ সমাজ সেই সমাজ, যেখানে অন্যের দারিদ্র্যকে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেখা হয় না।
সময়ের সঙ্গে লক্ষ্মীপুজোর আয়োজনেও পরিবর্তন এসেছে। কোথাও মাটির প্রতিমার বদলে অন্য ধরনের প্রতিমা, কোথাও বিদ্যুতের আলো, কোথাও সাজসজ্জার প্রতিযোগিতা, কোথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশের প্রবণতা। এই পরিবর্তনকে এক কথায় ভাল বা মন্দ বলা যায় না। সংস্কৃতি স্থির নয়; মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে তার রূপ বদলায়।
লক্ষ্মীকে সম্পদের প্রতীক হিসেবে মানলেও সম্পদ প্রদর্শন আর সমৃদ্ধি এক জিনিস নয়। যে পরিবার অল্প আয়েও পরস্পরের পাশে থাকে, অসুস্থ সদস্যের যত্ন নেয়, সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে এবং প্রতিবেশীর বিপদে সাহায্যের হাত বাড়ায়, তার সামাজিক সম্পদ অনেক সময় বিপুল অর্থসম্পদের অধিকারী পরিবারের চেয়েও গভীর।
কোজাগরীর রাত আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দিতে পারে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া উঠোনে, প্রদীপের ক্ষুদ্র শিখায়, চালের গুঁড়োয় আঁকা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপে, কিংবা মায়ের হাতে তৈরি একটি নাড়ুতে যে আনন্দ থাকে, তার কোনও বাজারদর নেই।
আসলে উপাচার উৎসবের দৃশ্যমান রূপ; ভালবাসা তার অদৃশ্য প্রাণ। উপাচার ছাড়া কোনও কোনও মানুষের ধর্মীয় অনুশীলন অসম্পূর্ণ মনে হতে পারে, কিন্তু উপাচার থাকলেই যে হৃদয়ে মমতা থাকবে, তার নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে, সীমিত আয়োজনেও যে আন্তরিকতা থাকে, তা বহু জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের চেয়ে গভীর হতে পারে।
বাঙালির লক্ষ্মীপুজোর সবচেয়ে সুন্দর সমাজতাত্ত্বিক পাঠ তাই এই যে, সম্পদ কেবল সঞ্চয়ের বিষয় নয়, সম্পর্কেরও বিষয়। অন্ন কেবল ভোগের বস্তু নয়, ভাগ করে নেওয়ার উপকরণ। গৃহ কেবল চার দেওয়ালের আশ্রয় নয়, ভালবাসা ও নিরাপত্তার পরিসর। আর উৎসব কেবল দেবতার সামনে প্রার্থনা নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে নতুন করে চিনে নেওয়ার সুযোগ।
কোজাগরীর পূর্ণিমার রাতে আকাশে চাঁদ উঠবে, বাড়িতে প্রদীপ জ্বলবে, আলপনায় ফুটে উঠবে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। সেই আলো যদি মানুষের মনে প্রবেশ করে, যদি সংসারের নারীর শ্রমকে মর্যাদা দেয়, যদি দরিদ্র প্রতিবেশীর অভাবের কথা মনে করিয়ে দেয়, যদি ধর্মীয় বিভেদের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মানকে শক্তিশালী করে, তাহলেই লক্ষ্মীপুজো তার উপাচার অতিক্রম করে জীবনের উৎসবে পরিণত হবে।
কারণ, বাঙালির ঘরে লক্ষ্মী কেবল ধনসম্পদের দেবী নন—তিনি অন্নের আশা, সংসারের মমতা, স্মৃতির আশ্রয় এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের ভালবাসার এক চিরন্তন প্রতীক।
