সবকিছু পারফেক্ট বা নিখুঁতভাবে করার কারণে আমির খানকে বলিউডের ‘মিস্টার পারফেকশনিস্ট’ বলা হয়ে থাকে। এখন তার নামের পাশে এই তকমাটি অনায়াসে বসে যায়। কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে যে সংগ্রাম করেছেন, তা এখনো অনেকের অজানা। এমনও সময়ে গিয়েছে—শুটিং থেকে বাড়ি ফিরে অঝোরে কাঁদতেন আমির খান।
মাত্র ৮ বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় আমির খানের। তবে প্রধান চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তাক’ সিনেমায়। সিনেমাটিতে নায়িকা হিসেবে পান জুহি চাওলাকে। ১৯৮৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত অভিষেক সিনেমা দিয়েই বাজিমাত করেন আমির। তার প্রাপ্তির ঝুলিতে জমা পড়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এ পর্যন্ত গল্পটি আনন্দঘন এবং সরল! তবে বেদনা ও হতাশার চ্যাপ্টার এরপরই শুরু হয়।
‘কেয়ামত সে কেয়ামত তাক’ মুক্তির ৬ মাসের মধ্যে নয়টি নতুন সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হন আমির খান। এতগুলো সিনেমা হাতে নেওয়ার পক্ষে আমির খানের যুক্তি ছিল, প্রতিষ্ঠিত তারকারা যদি ডজন ডজন প্রজেক্ট সামলাতে পারেন, তবে তিনিও ১০টি সামলাতে পারবেন। শুটিং শুরু হওয়ার পর আমির উপলদ্ধি করেন—সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল।
‘কেয়ামত সে কেয়ামত তাক’ সিনেমায় জুটি বাঁধেন আমির খান ও জুহি চাওলা। তখন তারা দুজনেই একদম নতুন মুখ। তাই দর্শকদের আকৃষ্ট করতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়। সিনেমাটির ডিস্ট্রিবিউটররা মুম্বাইয়ের বড় বড় হোর্ডিং ও পোস্টারে কোনো ছবি ব্যবহার না করে শুধু লিখেছিলেন—‘Who is Aamir Khan? ...Ask the girl next door”। অভিনব এই প্রচার কৌশল দর্শকদের মাঝে তুমুল কৌতূহল তৈরি করেছিল
এ পরিস্থিতির ঠিক দুই বছর আগে ভালোবেসে রিনা দত্তকে বিয়ে করেন আমির খান। শুটিং থেকে বাড়ি ফিরে স্ত্রীর কাছে গিয়ে অঝোরে কাঁদতেন তিনি। তারপর তার অভিনীত সিনেমাগুলো মুক্তি পেতে থাকে আর সিনেমাগুলোর পাশে যুক্ত হয় ‘ফ্লপ’ তকমা। এখানেই শেষ নয়, আমির খানকে দেওয়া হয়—‘ওয়ান-ফিল্ম ওয়ান্ডার’ বা ‘এক-সিনেমার বিস্ময়’ তকমা। নিজের জীবনের দুর্বল মুহূর্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভ্যারাইটিকে এসব তথ্য জানান আমির খান।
চলচ্চিত্রবিষয়ক মার্কিন গণমাধ্যম ভ্যারাইটিকে আমির খান বলেন, “সেই সময়ে মানসিক-আবেগগতভাবে মনে হতো—আমি যেন চোরাবালিতে আটকে গেছি। ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। আর যত বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম, ততই গভীরে ডুবে যাচ্ছিলাম।”
আমির যখন দুঃসময় পার করছিলেন তখন ‘সারাংশ’, ‘আর্থ’, ‘নাম’-এর মতো সফল সিনেমা উপহার দেন মহেশ ভাট। সাফল্যের চূড়ায় থাকা এই পরিচালক তার সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন আমির খানকে। কিন্তু ততক্ষণে এ অভিনেতা প্রতিজ্ঞা করেছেন—চিত্রনাট্য, পরিচালক এবং প্রযোজক পছন্দ হলেই কেবল সিনেমায় কাজ করবেন। মহেশ ভাটের চিত্রনাট্য তার পছন্দ হয় না। বিনিদ্র একটি রজনী পার করে মহেশ ভাটের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন আমির।
আমির অভিনীত ‘গজনি’ সিনেমা ২০০৮ সালে মুক্তি পায়। ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে ১০০ কোটি রুপির ব্যবসা করার অনন্য রেকর্ড প্রথম গড়ে বলিউডের এই সিনেমা
মহেশ ভাটের প্রস্তাব ফেরানোর বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আমির খান বলেন, “আমি যদি আপস করতাম এবং বাস্তববাদী হয়ে বলতাম, ‘হ্যাঁ স্যার, আমি সিনেমাটি করছি’, তাহলে আমার পুরো ক্যারিয়ারটাই আপসের ধারাবাহিকতায় ভরে যেত।”
প্রথমে মহেশ ভাটের প্রস্তাব ফেরালেও পরবর্তীতে তার সঙ্গে কাজ করেন আমির খান। তবে চিত্রনাট্য পছন্দ হওয়ার পরই সম্মতি দেন এই অভিনেতা। তারা ‘দিল হ্যায় কে মানতা নেহি’, ‘হাম হ্যায় রাহি প্যায়ার কে’ সিনেমায় একসঙ্গে কাজ করেন। মহেশ ভাটের সঙ্গে কাজ করার আগেই বেশ কটি হিট সিনেমা উপহার দিয়ে নিজেকে স্থির জায়গায় দাঁড় করান আমির খান। এর পরের গল্প সবারই জানা।
১৯৮৪-২০১৯ সাল পর্যন্ত ৩৫ বছরের হিসাব-নিকাশ। এই সময়ে ৪০টি সিনেমায় অভিনয় করেন আমির খান। ৫টি ডিজাস্টারসহ ১৪টি ফ্লপ হয়। তারপরও আমিরই শুধু ভারত থেকে প্রথম শতকোটি রুপি আয়ের ক্লাবে প্রবেশ করা চলচ্চিত্রের নায়ক। বলিউডের সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমার অভিনেতাও আমির।
ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সিনেমার তালিকা তৈরি করা হলে ‘লগান’ ব্যতীত তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে! ২০০১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাটিতে ‘ভুবন’ চরিত্র রূপায়ন করেন আমির খান। সেই সময়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল হিন্দি সিনেমাগুলোর একটি ‘লগান’। ২৫ কোটি রুপির বাজেটে নির্মিত সিনেমাটি ৬৩ কোটি রুপির বেশি আয় করেছিল
আমির খান অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার তালিকায় রয়েছে—‘দিল’, ‘রঙ্গিলা’, ‘লগান’, ‘দিল চাহতা হ্যায়’, ‘রং দে বাসন্তী’, ‘রাজা হিন্দুস্তানি’, ‘তারে জমিন পার’, ‘গজনি’, ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘পিকে’, ‘দঙ্গল’ প্রভৃতি।
