পরিচালকের কাছে খাবার পরিবেশন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন অভিনেত্রী প্রীতি সাপ্রু। পরদিনই ‘জাগির’ সিনেমায় তার চরিত্রের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন তিনি। সম্প্রতি ‘অবতার’ সিনেমার সেটে অসম্মানিত বোধ করে শুটিং ছেড়ে চলে যাওয়া থেকে শুরু করে বাবার মৃত্যুর পর ‘লাওয়ারিস’-এর শুটিংয়ে তাকে ‘পাগল’ বলার ঘটনায় পরিচালক প্রকাশ মেহরার মুখোমুখি হওয়া—ক্যারিয়ারের এমন নানা অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
বলিউড থিকানার সঙ্গে আলাপচারিতায় প্রীতি বলেন, “নির্মাতাদের সঙ্গে মতবিরোধের পর একাধিক সিনেমায় তার চরিত্র বদলে দেওয়া হয়েছিল। তিনটি সিনেমার শুটিং ঘিরে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।
‘অবতার’-এর সেট ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন প্রীতি
রাজেশ খান্না ও শাবানা আজমি অভিনীত ১৯৮৩ সালের সিনেমা ‘অবতার’-এর শুটিংয়ে একটি গানের দৃশ্যের সময় অপমানিত বোধ করেছিলেন প্রীতি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোরিওগ্রাফার সুরেশ মাস্টারজি প্রধান দুই অভিনয়শিল্পীকে তাদের নাম ধরে ডাকলেও তাকে ও শচীন পিলগাঁওকরকে ‘ছেলে ও মেয়ে’ বলে সম্বোধন করেন। এতে নিজেকে জুনিয়র শিল্পী মনে হয়েছিল তার। তাই সেট ছেড়ে চলে যান।
‘অবতার’-এর সেটে নিজেকে জুনিয়র শিল্পীর মতো মনে হওয়ায় শুটিং ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন প্রীতি
প্রীতি বলেন, “অবতার সিনেমার শুটিংয়ের সময় একটি গানের দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছিল। সুরেশ মাস্টারজি ছিলেন কোরিওগ্রাফার। শুটিং চলার সময় তিনি কাকাজি (রাজেশ খান্না) ও শাবানাজিকে তাদের নাম ধরে ডাকেন। কিন্তু, শচীন ও আমাকে নাম ধরে না ডেকে বলেন, ‘ছেলে আর মেয়েটিকে ডাকো।’ আমি ভাবলাম, আমরা কি জুনিয়র শিল্পী? আমি সেট ছেড়ে চলে গেলাম।”
সিনেমাতে রমেশের স্ত্রী শোভার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রীতি। মোহন কুমার পরিচালিত সিনেমার গল্পে দেখা যায়, পরিবারের জন্য বছরের পর বছর ত্যাগ স্বীকার করা এক বয়স্ক দম্পতি তাদের ছেলেদের অবহেলার মুখে পড়েন।
খাবার পরিবেশন না করায় ‘জাগির’-এ চরিত্র বদলে যায়
১৯৮৪ সালে মুক্তি পাওয়া প্রমোদ চক্রবর্তীর ‘জাগির’ সিনেমার শুটিংয়েও তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রীতি। অভিনেত্রী বলেন, “আমি ড্যানি জির জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। তখন শুটিংয়ের মাত্র দ্বিতীয় দিন, পুরো ইউনিটকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আমার মনে আছে, প্রমোদ চক্রবর্তীজি শুটিং শেষ হওয়ার পর এসেছিলেন। তিনি ক্লান্ত ছিলেন এবং দেরিও হয়েছিল। বড় মাপের কিছু পরিচালকের মতো তারও অভিনেতাদের দিয়ে তোষামোদ করানোর অভ্যাস ছিল।
“এসেই তিনি বললেন, প্রীতি, আমাকে একটু খাবার পরিবেশন করো। আমি ভাবলাম, তিনি আমাকে এটা করতে বলছেন কেন? আমি তো সিনেমার একজন অভিনেত্রী। তাকে খাবার পরিবেশন করতে যাব কেন? ড্যানি জির সেক্রেটারি মদনজি আমাকে বললেন, প্রীতি, পরিবেশন করে দাও। তাতে এমন কী হবে? কিন্তু আমি রাজি হইনি।”
প্রীতির দাবি, পরদিন তার চরিত্রের গুরুত্ব অনেকটাই কমিয়ে দেওয়া হয়।
প্রীতি বলেন, “পরদিন তিনি আমাকে অমরীশ পুরীজির পেছনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আমি তাকে বললাম, স্যার, আপনি আমাকে যে চরিত্রের কথা শুনিয়েছিলেন, এখন আমাকে যা করতে বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে সেটা একেবারেই মেলে না। আমি তাকে বলেছিলাম, আমার নাম অতিথি শিল্পী হিসেবে দিতে, কারণ আমি এরই মধ্যে এক দিনের শুটিং করে ফেলেছি।”
প্রীতির ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচালক তাকে বলেছিলেন, “আমার কাছে জিনাত আমান আছেন। আমি তোমার নাম দেব না।” পাশাপাশি তিনি প্রীতিকে বলেছিলেন, চলচ্চিত্রশিল্পে তিনি বেশিদিন টিকতে পারবেন না।
‘জাগির’ সিনেমায় ধর্মেন্দ্র, জিনাত আমান, ড্যানি ডেনজংপা ও অমরীশ পুরীসহ আরো অনেকে অভিনয় করেছিলেন।
বাবার মৃত্যুর পর ‘পাগল’ বলেছিলেন প্রকাশ মেহরা
১৯৮১ সালের ‘লাওয়ারিস’ সিনেমার শুটিংয়ের অভিজ্ঞতাও জানিয়েছেন প্রীতি। প্রকাশ মেহরা পরিচালিত সিনেমাটিতে অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ বচ্চন ও জিনাত আমান।
প্রীতি বলেন, “আমি বাবাকে হারিয়েছিলাম। তার মৃত্যুর ৪০ দিনও তখন পার হয়নি। কাশ্মীরে ‘লাওয়ারিস’ সিনেমার শুটিং করছিলাম। আমার অবস্থা এমন ছিল যে প্রতিটি শট দেওয়ার পর আমি এক পাশে গিয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকতাম।”
প্রীতির দাবি, সে সময়ের প্রভাবশালী পরিচালক প্রকাশ মেহরা তাকে এভাবে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অভিনেতা সুরেশ ওবেরয়কে বলেছিলেন, প্রীতিকে তার কিছুটা ‘পাগল’ মনে হচ্ছে। কারণ, সাপ্রু সাহেবের মেয়ে প্রতিটি শটের পর একা গিয়ে দাঁড়ান।
পরে সুরেশ ওবেরয়ই প্রীতিকে পরিচালকের মন্তব্যের কথা জানান। এরপর প্রকাশ মেহরার সঙ্গে দেখা হলে সরাসরি তার কাছে জানতে চান প্রীতি।
পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রে কাজের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত, পাশাপাশি হিন্দি সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন প্রীতি সাপ্রু
তিনি বলেন, “আমি খুব দ্রুত রেগে যেতাম। প্রকাশ মেহরাজিকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি বলেছেন যে আমি পাগল? তিনি উত্তর দিলেন, এটা তার ব্যক্তিগত মতামত। আমি বললাম, অন্য মানুষের মতামত নিয়ে আমার কিছু যায় আসে না।”
প্রীতি স্বীকার করেন, সে সময়ের একজন নবাগত অভিনেত্রীর পক্ষে প্রকাশ মেহরার মতো প্রভাবশালী পরিচালকের সঙ্গে এভাবে কথা বলা ছিল অস্বাভাবিক।
প্রীতি ভাষ্য, “আজকের দিনে চলচ্চিত্রশিল্পে নতুন কেউ সাধারণত প্রকাশ মেহরাজির মতো একজন পরিচালকের সঙ্গে এভাবে কথা বলবেন না। আমি বলেছিলাম, হয়তো বাবার মৃত্যুর পর মানসিকভাবে ঠিক অবস্থায় ছিলাম না বলেই এমন করেছি। তার সহকারী আমার কাছে এসে তাকে ক্ষমা চাইতে বলেন। কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমি বলেছিলাম, সেটে আমি কোনো অন্যায় করিনি, তাই আমাকে পাগল বলার অধিকার তার নেই। আমি ক্ষমা চাইনি।”
প্রীতি আরো জানান, ‘লাওয়ারিস’ সিনেমায় প্রথমে তাকে যে চরিত্রের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেটি করতে পারেননি তিনি। সিনেমার কাজ চলাকালে তার চরিত্র বদলে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন এই অভিনেত্রী।
কে এই প্রীতি সাপ্রু?
প্রীতি সাপ্রু একজন অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রে কাজের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত, পাশাপাশি হিন্দি সিনেমায়ও অভিনয় করেছেন। তিনি বর্ষীয়ান অভিনেতা ডি কে সাপ্রুর মেয়ে এবং অভিনেতা তেজ সাপ্রু ও চিত্রনাট্যকার রিমা রাকেশ নাথের বোন।
‘লাওয়ারিস’ (১৯৮১) ও ‘অবতার’ (১৯৮৩)-এর মতো হিন্দি সিনেমায় অভিনয়ের পর পাঞ্জাবি চলচ্চিত্রে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন প্রীতি। ‘নিম্মো’ ও ‘কুরবানি জাট্ট দি’ তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্য লেখা ও পরিচালনার কাজও করেছেন তিনি।
* দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে
