একটি প্রাণী পৃথিবীতে এসেছে, শৈশব পেরিয়ে বড় হয়েছে, নিজের বংশ রেখে গেছে তারপর কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যেই জীবন শেষ! মানুষের কাছে যা অবিশ্বাস্য, প্রকৃতির কাছে সেটিই আবার স্বাভাবিক। পৃথিবীর সব প্রাণীর জীবনচক্র এক নয়। কেউ শত বছর বাঁচে, কেউ কয়েক দশক, আবার এমন কিছু প্রাণীও রয়েছে যাদের পূর্ণবয়স্ক জীবন এতটাই ছোট যে তাদের আয়ু হিসাব করতে ঘণ্টা বা দিনের বদলে মিনিটের কথাও বলতে হয়।
মেফ্লাই: পূর্ণবয়স্ক জীবন কয়েক ঘণ্টা, কিছু ক্ষেত্রে আরও কম
স্বল্প আয়ুর প্রাণীর কথা উঠলে সবার আগে আসে মেফ্লাই বা এক ধরনের জলজ পতঙ্গের নাম। তবে ‘মেফ্লাই মাত্র পাঁচ মিনিট বাঁচে’ এই প্রচলিত কথাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। প্রজাতিভেদে তাদের পূর্ণবয়স্ক অবস্থার আয়ু কয়েক মিনিট থেকে কয়েক দিন পর্যন্তও হতে পারে।
মজার বিষয় হলো, মেফ্লাইয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ কাটে পানির নিচে লার্ভা অবস্থায়। এই সময় তারা বৃদ্ধি পায় এবং একাধিকবার খোলস বদলায়। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তাদের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে প্রজনন। অনেক প্রজাতির প্রাপ্তবয়স্ক মেফ্লাই খাবার গ্রহণও করে না। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা সঙ্গী খুঁজে নেয়, ডিম পাড়ে এবং মারা যায়। অর্থাৎ যে ‘পাঁচ মিনিটের জীবন’-এর কথা শোনা যায়, সেটি মূলত কিছু মেফ্লাইয়ের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত প্রাপ্তবয়স্ক পর্যায়কে বোঝায়।
পিগমি গোবি: মেরুদণ্ডীদের মধ্যে সবচেয়ে স্বল্পায়ুদের একটি
সমুদ্রের অগভীর উষ্ণ পানিতে বসবাসকারী পিগমি গোবি মাছ আকারে খুবই ছোট। কিন্তু তাদের জীবনচক্র আরো চমকপ্রদ। কিছু প্রজাতির আয়ু মাত্র কয়েক মাসেরও কম। গবেষণায় একটি পিগমি গোবি প্রজাতির সর্বোচ্চ আয়ু প্রায় ৫৯ দিন বলে জানা গেছে। এত অল্প সময়ের মধ্যে জন্ম, বৃদ্ধি, প্রজনন এবং মৃত্যু সবই ঘটে যায়। ছোট আকারের কারণে তাদের বিপাকক্রিয়া দ্রুত এবং জীবনচক্রও অত্যন্ত দ্রুতগতির। তাই মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে স্বল্পায়ুর উদাহরণ হিসেবে এই মাছ বিশেষভাবে আলোচিত।
টারকোয়েজ কিলিফিশ: শুকিয়ে যাওয়া জলাশয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জীবন
আফ্রিকার অস্থায়ী জলাশয়ে পাওয়া যায় টারকোয়েজ কিলিফিশ। যে পানিতে তারা জন্মায়, সেটিই বর্ষা শেষ হলে শুকিয়ে যেতে পারে। তাই প্রকৃতি যেন তাদের শরীরে সময়ের কাঁটা একটু দ্রুত ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই মাছ খুব দ্রুত পরিণত হয় এবং অল্প বয়সেই প্রজননে সক্ষম হয়। জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তারা ডিম পাড়ে। এরপর জলাশয় শুকিয়ে গেলেও ডিম মাটির মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় টিকে থাকতে পারে। পরবর্তী বর্ষায় পানি ফিরে এলে সেই ডিম থেকে নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়। প্রজাতিভেদে এদের জীবনকাল কয়েক মাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে পারে।
ল্যাবোর্ডের গিরগিটি: ডিমের ভিতরেই জীবনের বড় অংশ
মাদাগাস্কারে পাওয়া ল্যাবোর্ডের গিরগিটির জীবনচক্রও ব্যতিক্রমী। এরা ডিমের ভিতরে দীর্ঘ সময় বিকশিত হয় এবং জন্মের পর তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে প্রজনন শুরু করে। এই গিরগিটির জীবনচক্র পরিবেশ ও ঋতুর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। অনুকূল পরিস্থিতিতে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রজনন সম্পন্ন করাই তাদের টিকে থাকার কৌশল। অর্থাৎ এখানে দীর্ঘ সময় ধরে বেঁচে থাকার চেয়ে দ্রুত প্রজন্ম তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যাস্ট্রোট্রিকস: অতি ক্ষুদ্র, অথচ বাস্তুতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ
খালি চোখে প্রায় অদৃশ্য জলজ অণুজীব গ্যাস্ট্রোট্রিকসও খুব স্বল্পায়ু। বিভিন্ন প্রজাতির আয়ু কয়েক দিন পর্যন্ত হতে পারে। আকারে ক্ষুদ্র হলেও জলজ পরিবেশে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তারা জৈব পদার্থ ও অণুজীব খেয়ে খাদ্যশৃঙ্খলের একটি অংশ হিসেবে কাজ করে এবং পুষ্টি পুনর্ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এত কম আয়ু কেন?
প্রকৃতিতে কম আয়ু মানেই দুর্বল প্রাণী এমনটা নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল। যেসব প্রাণী এমন পরিবেশে থাকে যেখানে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে, সেখানে দ্রুত বেড়ে ওঠা, অল্প বয়সে প্রজনন করা এবং পরবর্তী প্রজন্ম রেখে যাওয়াই টিকে থাকার কার্যকর উপায়।
তাই মেফ্লাইয়ের কয়েক ঘণ্টার প্রাপ্তবয়স্ক জীবন কিংবা পিগমি গোবির মাত্র কয়েক সপ্তাহের জীবনকে শুধু ‘ছোট’ বলে দেখলে ভুল হবে। কয়েক মিনিট, কয়েক দিন বা কয়েক মাস প্রকৃতির কাছে প্রতিটি সময়সীমারই নিজস্ব প্রয়োজন রয়েছে। মানুষের দীর্ঘ জীবন যেখানে বিস্ময়, সেখানে এই প্রাণীদের ক্ষণস্থায়ী জীবনই প্রকৃতির আরেক বিস্ময়।
