একটি দেশের অর্থনীতি শুধু বড় শিল্পকারখানার উঁচু চিমনি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল বিনিয়োগ কিংবা রাজধানীকেন্দ্রিক ব্যবসাবাণিজ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। অর্থনীতির প্রকৃত ভিত গড়ে ওঠে মানুষের কর্মশক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগের ওপর। কোনো প্রত্যন্ত গ্রামের তরুণের ছোট্ট কারখানা, কোনো নারীর ঘরে বসে গড়ে তোলা ক্ষুদ্র উদ্যোগ কিংবা বেকার যুবকের সামান্য পুঁজি নিয়ে শুরু করা ব্যবসা—একদিন এসবই বৃহত্তর অর্থনীতির শক্তিশালী অনুষঙ্গ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু স্বপ্নের সঙ্গে যখন পুঁজি থাকে না, দক্ষতার সঙ্গে বাজারের সংযোগ থাকে না, আর উদ্যোগের পাশে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার দৃশ্যমান হাত থাকে না, তখন সম্ভাবনার অনেক প্রদীপ জ্বলার আগেই নিভে যায়।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। এই তরুণদের মেধা আছে, শ্রম আছে, প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত অভিযোজনের ক্ষমতা আছে; আছে নিজের ভাগ্য নিজেই নির্মাণ করার আকাঙ্ক্ষা। অথচ কর্মসংস্থানের প্রচলিত কাঠামো সেই বিপুল জনশক্তিকে ধারণ করতে পারছে না। প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন অসংখ্য তরুণ। বিপরীতে, কাঙ্ক্ষিত চাকরির সুযোগ সীমিত। ফলে চাকরিপ্রত্যাশীদের দীর্ঘ সারি আরো দীর্ঘ হচ্ছে। এই বাস্তবতায় উদ্যোক্তা সৃষ্টি শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, এটি কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলার একটি কার্যকর পথ।
একজন উদ্যোক্তা নিজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন—এটি তার প্রথম সাফল্য। কিন্তু তার উদ্যোগ যখন একটু বিস্তৃত হয়, তখন সেখানে যুক্ত হয় আরো কয়েকজন মানুষের শ্রম, মেধা ও জীবিকার সম্ভাবনা। একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা তাই নিছক ব্যক্তিগত উপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি একটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করে, স্থানীয় বাজারকে সক্রিয় করে এবং ধীরে ধীরে একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়ায়। এ কারণেই উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি ব্যক্তিগত উদ্যোগের গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে উদ্যোক্তা হওয়া শুধু সাহসের ব্যাপার নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুঁজি, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, বাজার, যোগাযোগ, হিসাবরক্ষণ, বিপণন, আইনগত জ্ঞান এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। একজন তরুণ হয়তো উৎকৃষ্ট পণ্য তৈরি করতে পারেন, কিন্তু বাজারজাতকরণের কৌশল না জানায় ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারেন না। কেউ হয়তো চমৎকার ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করেছেন, কিন্তু প্রাথমিক মূলধনের অভাবে সেটি বাস্তবায়নের সুযোগ পান না। আবার কেউ ঋণ পেলেও ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাবে অল্প সময়েই বিপাকে পড়েন। ফলে উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন সমন্বিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো।
প্রথমত, সহজ শর্তে অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। নতুন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অনেক সময় পুঁজির অভাব নয়, বরং জামানত দেওয়ার সামর্থ্যের অভাব। ফলে প্রচলিত ঋণব্যবস্থার কঠিন শর্ত বহু সম্ভাবনাময় উদ্যোগকে শুরু হওয়ার আগেই থামিয়ে দেয়। বাস্তবসম্মত মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্বল্পসুদের ঋণ, প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরামর্শনির্ভর ঋণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। শুধু অর্থ দেওয়া নয়, অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত দিকনির্দেশনাও প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করতে হবে। উদ্যোক্তা উন্নয়নের নামে কয়েক দিনের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। হিসাবরক্ষণ থেকে ডিজিটাল বিপণন, পণ্যের মান থেকে ভোক্তার চাহিদা, করব্যবস্থা থেকে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা—ব্যবসার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাতে-কলমে দক্ষতা প্রয়োজন। অভিজ্ঞ উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নবীনদের সংযোগ ঘটানো গেলে ভুল থেকে শেখার সুযোগও তৈরি হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পরামর্শ ও পরবর্তী তদারকির ব্যবস্থা করতে পারে।
তৃতীয়ত, বাজারে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন করলেই উদ্যোক্তা সফল হন না; পণ্য বিক্রির জন্য দরকার বিস্তৃত বাজার। সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র ও নবীন উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো, দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী এবং মেলার আয়োজন, অনলাইন বাজারে প্রবেশের সহায়তা এবং পণ্যের মানোন্নয়নে কারিগরি সহযোগিতা তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
পাহাড়, চর, হাওর কিংবা সীমান্তবর্তী অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের বাস্তবতা আরো কঠিন। যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের সংকট, পরিবহন ব্যয় এবং বাজারের দূরত্ব তাদের ব্যবসাকে অতিরিক্ত প্রতিকূলতার মুখে ঠেলে দেয়। তাই রাজধানীকেন্দ্রিক একক নীতি দিয়ে উদ্যোক্তা উন্নয়ন সম্ভব নয়। অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনায় স্থানীয় কৃষি, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র উৎপাদন, পর্যটন ও প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে টেকসই উদ্যোগের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার খুলবে।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও প্রয়োজন কার্যকর সহায়তা। পুঁজি ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বাজারসংযোগ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও প্রত্যন্ত এলাকার তরুণদের উদ্যোক্তা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ আরো বিস্তৃত হবে।
উদ্যোক্তা তৈরির অর্থ শুধু ব্যবসায়ী সৃষ্টি নয়; এর গভীরে রয়েছে আত্মনির্ভর মানুষের একটি প্রজন্ম নির্মাণের স্বপ্ন। রাষ্ট্রের কাজ মানুষের হয়ে ব্যবসা করা নয়, বরং মানুষের উদ্যোগকে এগিয়ে যাওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। এমন পরিবেশ, যেখানে একজন তরুণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নিরুৎসাহিত হবেন না, পুঁজির অভাবে থেমে যাবেন না এবং বাজারের অনিশ্চয়তায় একা পড়ে থাকবেন না।
বাংলাদেশের তরুণদের হাতে সম্ভাবনার যে উর্বর জমি, সেখানে রাষ্ট্রীয় সহায়তা হতে পারে বীজ, প্রশিক্ষণ হতে পারে পরিচর্যা আর বাজারসংযোগ হতে পারে ফসল ঘরে তোলার পথ। একটি উদ্যোগ সফল হলে শুধু একজন মানুষের ভাগ্য বদলায় না; তার সঙ্গে বদলায় কয়েকটি পরিবারের জীবন, তৈরি হয় কর্মসংস্থান, সচল হয় স্থানীয় অর্থনীতি। তাই উদ্যোক্তা তৈরিতে রাষ্ট্রীয় সহায়তা কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি কর্মসংস্থান, আত্মনির্ভরতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য দূরদর্শী বিনিয়োগ।
লেখক: কবি ও ছড়াকার
