দিনক্ষণ চূড়ান্ত না হলেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থীদের নিয়ে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ফের আলোচনা জমে উঠেছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসনের পদত্যাগ এবং ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে তার নির্বাচন করার প্রস্তুতির ঘোষণা দেওয়ায় নতুন করে এই আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই সিটিতে বিএনপির দুই নেতাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর নির্বাচনে মেয়র পদেও তাদের প্রার্থী করা হতে পারে— দলের বাইরে এমন আলোচনা থাকলেও
দলে ভেতরে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এর মধ্যে দলের অনেকেই মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। এখন পর্যন্ত মেয়র পদের দলীয় সমর্থন আদায়ের দৌড়ে ঢাকা দক্ষিণে চারজন এবং ঢাকা উত্তরে দুজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, ঢাকার মেয়র পদ রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কারা মেয়র পদে বিএনপির দলীয় সমর্থন পাবেন, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ভোটের মাঠের পরিস্থিতির ওপর।
বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, সিটি নির্বাচনে বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটিতে দলের প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সবস্তরের নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে যাদের হৃদ্যতা রয়েছে, যাদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, জনপরিচিতি আছে; তাদেরই বিবেচনা করা হবে। তাই আলোচনায় যিনিই থাকুন, মনোনয়নের ক্ষেত্রে ভাবতে হচ্ছে যারা সিটির অলি-গলি গিয়ে ভোট চাইবেন, সেই মাঠপর্যায়ের নেতাদের। বিশেষ করে যে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সঙ্গে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের যোগাযোগ রয়েছে, ভোটার ও জনপরিসরে যার পরিচিতি বেশি, তাকে মনোনয়নের জন্য অগ্রাধিকার থাকবে। নির্বাচনের আগে হঠাৎ কাউকে প্রার্থী করে মাঠে নামিয়ে দেওয়া হবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন নাকি তাবিথ আউয়াল চূড়ান্ত প্রার্থী হবেন— তা নিয়ে চলছে নানা সমীকরণ। ঢাকা দক্ষিণে আলোচনায় আছেন প্রশাসক আবদুস সালাম, ইশরাক হোসেন, হাবিব উন নবী খান সোহেল ও আফরোজা আব্বাস। শেষ পর্যন্ত দলীয় হাইকমান্ডের সবুজ সংকেত ও যোগ্যতার মাপকাঠিতেই নির্ধারিত হবে ঢাকার দুই সিটির নতুন কাণ্ডারি কে হতে যাচ্ছে। তবে একই দল থেকে একাধিক যোগ্য বা ইচ্ছুক প্রার্থী থাকায় মনোনয়ন ঘোষণার পর অভ্যন্তরীণ বিভেদ সামাল দেওয়াটাকেও বড় চ্যালেঞ্জ মনে করা হচ্ছে। ভোটারদের একটি বড় অংশই তরুণ। ফলে যিনি আধুনিক স্মার্ট ঢাকা গড়ার রূপরেখা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পারবেন, পাল্লা তার দিকেই ঝুঁকতে পারে। কারণ এ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও নতুন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মাঠে নামলে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তাই কিছুটা সময় নিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জনপ্রিয়তা, পরিচ্ছন্ন ইমেজ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়ে উত্তর-দক্ষিণের জন্য চূড়ান্ত প্রার্থী নির্বাচন করবেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, ‘প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক, সাংগঠনিক দক্ষতা, ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং মনো প্রার্থীদের মোকাবিলার সক্ষমতা, সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া হবে। বিশেষ করে জয়ী হয়ে আসতে পারেন, এমন প্রার্থীই শেষ পর্যন্ত মেয়র পদে অগ্রাধিকার পাবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপি একদিকে মাঠের জনপ্রিয় রাজনৈতিক মুখ (যেমন ইশরাক বা তাবিথ) এবং অন্যদিকে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা নেতাদের (সালাম বা মিল্টন) নিয়ে কৌশলগত হিসাব করছে। কারণ এবার নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো নতুন ধারার রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রার্থী ঘোষণা করায় নির্বাচন কেবল দুই দলের লড়াই থাকছে না। তাই দলীয় হাইকমান্ড ও শীর্ষ নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত কাদের ওপর আস্থা রাখবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে ঢাকার দুই নগরপিতার ভবিষ্যৎ। তবে মাঠের এই তৎপরতার চেয়েও বড় সমীকরণ এখন বিএনপির হাইকমান্ডে। জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ঢাকার দুই মেয়র প্রার্থী নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বিএনপি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে ভেতরে ভেতরে চলছে বিস্তর হিসাব-নিকাশ। রাজনৈতিকভাবে ঢাকার দুই সিটির মেয়র পদ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় প্রার্থী বাছাইয়ে কোনো ভুল করতে চাইছে না বিএনপি। যেহেতু এই নির্বাচন শুধু দলীয় ভোটের ওপর নির্ভর করবে না এবং তরুণ, নতুন ও রাজনৈতিক সচেতন ভোটাররা এখানে বড় নিয়ামক ভূমিকা পালন করেন; তাই দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা ভোটারদের আকৃষ্ট করার সক্ষমতা বিবেচনা করে প্রার্থী নির্বাচন করতে চায় ক্ষমতাসীন দলটি।
আলোচনায় কারা এগিয়ে : ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) বিএনপির প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক ও যুবদল নেতা শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে। তিনি যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিব ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তিনি। যদিও তিনি পরাজিত হয়েছেন সেই নির্বাচনে। সম্প্রতি ফুটপাত পরির্দশনের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বলতে শোনা যায়; ‘আমাদের মেয়র মিল্টন কাজ করছে তো?’ অন্যদিকে প্রার্থী হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন তাবিথ আউয়াল। তিনি বিগত সিটি নির্বাচনে অংশ নেন।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় আছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ডিএসসিসির বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ছিলেন। এ ছাড়া ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে আব্দুস সালাম আমাদের সময়কে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করতে প্রস্তুত আছি।’
এ ছাড়া ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলকে নিয়েও নেতাকর্মীদের একটি অংশের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ-উৎসাহ রয়েছে। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এমনকি বাংলাদেশে রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক মামলাও দায়ের করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। সিটিতে মেয়র নির্বাচনের বিষয়ে হাবিব উন নবী খান সোহেল বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।’
তবে সবকিছু ছাড়িয়ে সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করার পর নতুন করে বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় এসেছে ইশরাক হোসেনের নাম। তিনি ইতোমধ্যে মেয়র প্রার্থী হতে প্রস্তুত আছেন বলেও ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি আলোচনায় আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের স্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস। তিনি বিগত সিটি নির্বাচনে মির্জা আব্বাসের পক্ষে নির্র্বাচনী প্রচারণায় নেমে সাংগঠনিকভাবে নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংসদ নির্বাচনের ভোটের হিসাব আর সিটি নির্বাচনের ভোটের হিসাব এক নয়। ওয়ার্ডভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থীর নাগরিক ভাবমূর্তি এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সঙ্গে ভোটের বিভাজন; সবকিছুই ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। আর সে কারণেই ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির প্রার্থী বাছাই এখন কেবল মনোনয়নপ্রত্যাশীদের দৌড় নয়; এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক কৌশলেরও পরীক্ষা। হয়তো হাইকমান্ড এমন প্রার্থীই খুঁজছে, যিনি শুধু দলের প্রতীক নিয়ে মাঠে নামবেন না, ভোটারের দরজায় গিয়ে নগরীর সমস্যা, নাগরিক ভোগান্তির কারণ ও ভবিষ্যৎ ঢাকার একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখাও তুলে ধরতে পারবেন। সেক্ষেত্রে একদিকে যেমন বর্তমান দুই প্রশাসক আবদুস সালাম ও শফিকুল ইসলাম মিল্টন মেয়র প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে, তেমনি বিগত দিনের প্রার্থী হিসেবে দৌড়ে খুববেশি পিছিয়ে থাকবে না তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন। তাই শেষ মুহূর্তে কার নাম বাদ পড়ে, কার নাম উঠে আসে, আর কোন সমীকরণে উত্তর ও দক্ষিণের প্রার্থী ঠিক হয়, রাজধানীর রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহল সেখানেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য এবং একজন ভাইস চেয়ারম্যান আমাদের সময়কে জানান, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এমন ব্যক্তিত্বের নেতাকে বিবেচনা করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে হয়তো আবদুস সালাম ও শফিকুল ইসলাম মিল্টনের চেয়ে উত্তরে তাবিথ আউয়াল এবং দক্ষিণে ইশরাক হোসেন এগিয়ে থাকবে বিগত সময়ের প্রার্থী হিসেবে।
এই দুই নেতা আরও বলেন, ‘উত্তরে শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের সঙ্গেও তাবিথ আউয়ালকে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। মনোনয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা পাশ কাটিয়ে যদি পরিবারতন্ত্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হবে, যা দলের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।
তবে ভিন্ন আলোচনাও আছে। ঢাকা দক্ষিণে সালাম-ইশরাকের বাইরে হাবিব উন নবী খান সোহেল ও আফরোজা আব্বাসের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার মত নয়। কারো কারো মতে, আবদুস সালাম বর্তমানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন; মেজর কোনো দুর্বলতা না থাকলে সালামকেই মেয়র হিসেবে প্রার্থী করা হতে পারে। পাশাপাশি ইশরাক হোসেন গত সিটিতে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে ভোটে লড়েছে; তার বাবা সাদেক হোসেন খোকা অবিভক্ত ঢাকা সিটির মেয়র ছিলেন, একজন দক্ষ সংগঠক ও বিজ্ঞ নেতা ছিলেন। সেই বিবেচনায় ইশরাক হোসেন ফের মেয়র মনোনয়ন পেতে পারে। বিকল্প প্রার্থী হিসেবে হাবিব উন নবী খান সোহেল কিংবা আফরোজা আব্বাসকেও বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান আমাদের সময়কে বলেন, ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর আগে একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী থাকাটা স্বাভাবিক। সম্ভাব্য প্রার্থীদের সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পরই দলীয় মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হবে।
