ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলয়া গ্রামের পাগল নাথের মেলা। যুগের পর যুগ ধরে এ মেলাকে ঘিরে জেগে ওঠে মানুষের আবেগ, ভক্তি ও ভালোবাসা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এ আয়োজন শুধু ধর্মীয় মেলা নয়, বরং গ্রামীণ বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, সামাজিক বন্ধন ও ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলয়া গ্রামে অনুষ্ঠিত পাগল নাথের মেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন। ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে এ আয়োজনে মিলিত হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরাও মেলার আনন্দে অংশ নেন।
এ বছর গোলয়া গ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ১৬৪তম পাগল নাথের মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার দিনব্যাপী গোলয়া দুর্গামন্দির প্রাঙ্গণে এ মেলার আয়োজন করা হয়। শত শত মানুষের উপস্থিতিতে মেলাটি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। পাগল নাথের এ মেলা স্থানীয় লোকঐতিহ্যের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ মেলা মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় বাংলাদেশের যোগাযোগ ও চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত ছিল না। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর ছিলেন। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অনেকেই চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। কার্তিক মাস থেকে শীতের প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে নানা রোগব্যাধি দেখা দিত। তখন চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষ রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও নিয়মকানুন পালন করতেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেকে এ সময় মাছ-মাংস খাওয়া থেকেও বিরত থাকতেন।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, প্রায় ১৬৪ বছর আগে রোগব্যাধি থেকে মুক্তি কামনায় গোলয়া গ্রামের মানুষ পাগল নাথের মেলার প্রচলন করেন। সেই থেকে বংশপরম্পরায় এ মেলা পালন করে আসছেন গ্রামের বাসিন্দারা।
প্রতি বছর কার্তিক মাসের ১ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত গোলয়া গ্রামের মানুষ নিরামিষ আহার করেন। এ সময় প্রতিরাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নামকীর্তন করা হয়। সপ্তম দিনে দিনব্যাপী কীর্তন, পাগল নাথের গান এবং ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণের আয়োজন থাকে।
ড. চিত্তরঞ্জন রায় বলেন, একসময় পাগল নাথের মেলা ছিল গোলয়া গ্রামের প্রধান উৎসব। ছোটবেলা থেকেই তিনি এ মেলা দেখে আসছেন। তাঁর ভাষায়, এ মেলা গ্রামের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির এক অপূর্ব বন্ধন তৈরি করেছে। পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে তাঁরা আজও প্রতিবছর এ উৎসব পালন করেন। বর্তমানে গ্রামে দুর্গাপূজা, অষ্টপ্রহর, সরস্বতীপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবও পালিত হয়। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও পাগল নাথের মেলার ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন স্থানীয়রা।
কিশোর কুমার রায় বলেন, পাগল নাথের মেলা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের মিলনমেলাও।
শিক্ষক খুশীমোহন রায় বলেন, পাগল নাথের মেলায় অংশ নিয়ে তিনি মানসিক প্রশান্তি অনুভব করেন। বিশ্বাস ও ভক্তি নিয়ে প্রতিবছর মেলার জন্য অপেক্ষা করেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, পাগল নাথ তাঁদের সব ধরনের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেন।
কালের বিবর্তনে অনেক কিছু বদলে গেলেও মেলার কিছু ঐতিহ্য আজও ধরে রেখেছেন স্থানীয়রা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ওয়ানটাইম প্লেট ও গ্লাসের প্রচলন বাড়লেও পাগল নাথের মেলায় কলাপাতায় প্রসাদ বিতরণ করা হয়। ভক্তদের মধ্যে সুশৃঙ্খলভাবে প্রসাদ বিতরণের জন্য সবুজ রায়, আকাশ রায়, স্বপন রায়, তপন রায়, ভবেন রায়, রাজন রায় ও কনক রায়সহ ৫০ সদস্যের একটি প্রসাদ বিতরণ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মেলার দিন স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত হয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে মেলাটি হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। এ আয়োজনকে ঘিরে আশপাশের এলাকাতেও উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি মেলাটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার অনেক প্রাচীন ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। তবে গোলয়া পাগল নাথের মেলা স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও ভালোবাসায় আজও টিকে আছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ সংরক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ ঐতিহ্য আগামী প্রজন্মের কাছেও তুলে ধরা হবে।
দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় গোলয়া পাগল নাথের মেলা আজও স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও সম্প্রীতির প্রতীক। ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি সামাজিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধারণ করে এ মেলা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন গড়ে তুলছে।
