Published on
:
2 min read
কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
তিন বাঙালি এক জায়গায় হলেই হয় দুর্গাপুজো! প্রবাদটা মিলে গিয়েছিল সুদূর ফিনল্যান্ডেও। ১৯৯৯-এ হাতে ছিল না দুর্গাপ্রতিমা। ছিল এক ফিনিশ মহিলার আঁকা দেবীর ছবি। সেই ছবি সামনে রেখেই শুরু হয় হেলসিঙ্কির দুর্গাপুজো। ২৭ বছর পরে সেই পুজোই জায়গা করে নিল ফিনল্যান্ডের ‘ন্যাশনাল লিভিং হেরিটেজ লিস্ট’-এ। এশিয়ার মাত্র দু’টি উৎসবের ঠাঁই হয়েছে এই তালিকায়—জাপানের হানামি উৎসব ও দুর্গাপুজো।
২৬ জুন ফিনল্যান্ডের শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রক জাতীয় তালিকায় ভারতীয় দুর্গাপুজোকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত জানায়। ১০ সেপ্টেম্বর হেলসিঙ্কির বাঙালি সংগঠন, বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ ফিনল্যান্ড (বিএএফ)-এর প্রতিনিধির হাতে শংসাপত্র তুলে দেন সে দেশের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিমন্ত্রী মারি-লিনা তালভিতি। ফিনিশ হেরিটেজ এজেন্সি আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দুই জাদুঘরের প্রতিনিধিরাও। দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যে নানা জনগোষ্ঠীর অভ্যাস, স্মৃতি ও উদ্যাপনে সমৃদ্ধ হয়, এই স্বীকৃতি তারই স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতিটুকুই বিএএফ-এর কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। এতেই খুশি সংগঠনের প্রেসিডেন্ট ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ইন্দ্রনীল রায়, কোষাধ্যক্ষ সংকল্প দাস, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা মন্দিরা নাথ, শিল্প ও সাহিত্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত দেবর্ষি (ঋষি) মিত্র, ইভেন্টসের মিতালী চট্টোপাধ্যায়, সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডলার পলাশ মুখোপাধ্যায় এবং সংগঠনের অন্য সদস্যরা। ইন্দ্রজিৎ ‘এই সময়’-কে বলেন, ‘শুরুটা বাঙালিদের হাতে হলেও এখন এটা পুরোদস্তুর ভারতীয় উৎসব। হেলসিঙ্কি ও তার আশপাশের প্রত্যেক ভারতীয় এই উৎসবে অংশ নেন। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।’
শুরুটা ছিল সামান্য। ১৯৯৯-এ হেলসিঙ্কির মাউনুলায় ৩০ জন বাঙালিকে নিয়ে প্রথম পুজোর আয়োজন। প্রথম দু’বছর ছিল এক দিনের অনুষ্ঠান। ২০০০-এ সুইডেন থেকে আসা এক প্রবীণ বাঙালির প্রস্তাবে ২০০১ থেকে কিভিক্কোয় শুরু হয় মন্ত্রপাঠ ও অঞ্জলির মাধ্যমে নিয়মমাফিক পুজো।
২০০৩-এ কলকাতা থেকে আসে দুর্গাপ্রতিমা। সেই প্রতিমা সংরক্ষিত রয়েছে এসপো শহরের এক জাদুঘরে। ২০০৫ থেকে তিন দিনের পুজোর রীতি চালু হয়। ক্রমে বাড়ে প্রবাসী বাঙালির সংখ্যা, বাড়ে আয়োজনও। পুজো, গান, নাচের পাশাপাশি প্রকাশিত হয় পুজোবার্ষিকী ‘সৃজন’। কয়েক বছরের উদ্যোগের পরে ২০১৯-এ নিবন্ধিত হয় বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ ফিনল্যান্ড। এখন রাজধানী অঞ্চলে চারটি পুজো হলেও পথিকৃৎ হেলসিঙ্কির এই আয়োজন।
এই স্বীকৃতির নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ নথিবদ্ধকরণ। ২০২৪-এ হেলিনা রাউতাভারা মিউজিয়াম ও কামু এসপো সিটি মিউজিয়ামের সহযোগিতায় ফিনল্যান্ডের জীবন্ত ঐতিহ্যের উইকি তালিকায় জায়গা পায় দুর্গাপুজো। দুই সংগ্রহশালাতেই রয়েছে আগের প্রতিমা, ছবি ও অডিয়ো–ভিজুয়াল নথি। পরে জাতীয় তালিকার জন্য আবেদন ও তথ্য যাচাইয়ের পরে আসে চূড়ান্ত স্বীকৃতি।
পুজোর পাশাপাশি বাংলা নববর্ষও পালিত হয়। শিশু-কিশোরদের কাছে এই আয়োজন বাংলা ভাষা, গান, নাচ ও সামাজিক বন্ধন পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। তাই তালিকাভুক্তি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য বহনের দায়িত্বও সামনে আনে।
