বান্দরবানের সবুজ পাহাড় এখন সোনালি ধানের সমারোহে সেজেছে। পাহাড়ি জনপদ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে পাকা ধানের মৌ মৌ গন্ধ, যা জানান দিচ্ছে ফসল তোলার মৌসুম বা জুমচাষের উৎসবের। পাহাড়ের প্রকৃতি, মাটি ও ঋতুচক্রের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে সোমবার (২১ অক্টোবর) থেকে জুমিয়াদের ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে কর্মব্যস্ততা। জুমচাষ কেবল তাদের জীবিকার প্রধান উৎস নয়, বরং এটি পাহাড়িদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বান্দরবানে জুমচাষের লক্ষ্যমাত্রা ১২ হাজার হেক্টর নির্ধারণ করা হলেও ৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ সম্পন্ন হয়েছে। এসব জমিতে নিড়িখা, উফশি, পিডি, ককরো, বিন্নি ও গেলং-এর মতো ১৭ প্রজাতির ধানসহ নানা ধরনের ফসল ফলানো হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবমতে, এ বছর জুম থেকে প্রায় ১৪ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদিত হয়েছে। প্রথাগত এই পদ্ধতিতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে জঙ্গল পরিষ্কারের পর এপ্রিল মাসে পোড়ানো হয়। এরপর প্রথম বৃষ্টির অপেক্ষায় থেকে বীজ বপন করা হয় এবং সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ফসল ঘরে তোলা হয়।
দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে জুমচাষ করা রোয়াংছড়ি উপজেলার চাষি সাউচিং মার্মা জানান, জুমের ফসলেই তাদের পরিবারের সারা বছরের খাদ্যচাহিদা মেটে। উদ্বৃত্ত ফসল বাজারে বিক্রি করে সংসারের অন্যান্য প্রয়োজনও পূরণ করেন তারা। একই জমিতে ধানের পাশাপাশি হলুদ, মরিচ, ভুট্টা, মারফা, বরবটি, তিল, ঢেঁড়স, পুঁইশাক, বেগুন ও মিষ্টিকুমড়াসহ নানা ধরনের সবজি চাষ করা হয়, যা পুষ্টির চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ি পরিবেশে উৎপাদিত এসব ফসলের স্বাদ সমতলের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং কীটনাশকের ব্যবহার কম হওয়ায় দেশজুড়ে জুমের ফসলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
তবে সময়ের সঙ্গে জুমচাষের পদ্ধতিতে নেতিবাচক পরিবর্তনের আঁচ পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। অতীতে ৮ থেকে ১০ বছর বিরতি দিয়ে একই জমিতে জুমচাষ করা হতো, যাতে মাটি তার স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরে পেত। বর্তমানে জমির স্বল্পতায় অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ২-৩ বছরের ব্যবধানে একই জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে, যার ফলে মাটির গুণাগুণ হ্রাস পাচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে কৃষি বিভাগ এখন আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ও উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
বান্দরবান জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নঈম মো. সাইফুদ্দিন জানান, জুমচাষিদের এই ঐতিহ্যকে টেকসই করতে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। বান্দরবান সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসানও একই মত পোষণ করে বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নত জাতের ফসল চাষের মাধ্যমে জুমচাষকে আরও লাভজনক করে তোলার সুযোগ রয়েছে।
জুমিয়াদের কাছে জুমচাষ মানে কেবল ফসল ফলানো নয়, এটি তাদের অস্তিত্বের লড়াই। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শতবর্ষী এই ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সঙ্গে সমন্বয় করে টিকিয়ে রাখার প্রত্যাশা তাদের। তারেক রহমান সরকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর এই প্রাচীন কৃষি পদ্ধতিকে আধুনিকায়ন ও সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
