পাহাড়ের পর পাহাড়, চারদিকে সবুজের সমারোহ। মেঘের আনাগোনা আর প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য- এ যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক টুকরো স্বপ্নের জগৎ। বান্দরবানের থানচি উপজেলায় পাহাড়ি পরিবেশে গড়ে ওঠা তমা তুঙ্গী রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট এখন পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
বাঁশ ও কাঠের নান্দনিক নির্মাণশৈলী, পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য এবং নিরিবিলি পরিবেশ রিসোর্টটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। দূর থেকে তাকালে পাহাড়ের ঢালে সাজানো কটেজগুলো অনেকটা সাজেকের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
একটি রিসোর্ট গড়ে তোলা কেবল ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন, পরিশ্রম, প্রতিকূলতা আর সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। তমা তুঙ্গী রিসোর্টের পেছনেও রয়েছে এমনই এক উদ্যোগের গল্প।
রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর শুরু হয় এর নির্মাণকাজ। নিজেদের পারিবারিক জমিতে পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত উদ্যোগে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি অল্প সময়ের মধ্যেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণ উদ্যোক্তা বলেন, ‘রিসোর্ট নির্মাণ করা দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতা ও সমস্যার কারণে আগে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে উদ্যোগটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের এলাকার তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।’
তার ভাষ্য, পাহাড়ি জনপদের মানুষের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখার প্রত্যাশা থেকেই তারা রিসোর্টটি গড়ে তুলেছেন।
পর্যটকদের থাকা ও অবসর কাটানোর সুবিধা বিবেচনায় রিসোর্টটিতে গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের আবাসনব্যবস্থা। লাভ কটেজ, পড হাউস, ফ্যামিলি জোন ও ব্যাচেলরস পয়েন্টসহ মোট সাতটি কক্ষ বা আবাসন ইউনিট রয়েছে এখানে। পাশাপাশি আছে নিজস্ব রেস্টুরেন্ট, গাড়ি পার্কিং, বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই এবং বিদ্যুৎ সুবিধা।
পরিবার নিয়ে বেড়াতে আসা পর্যটক থেকে শুরু করে বন্ধুদের দল কিংবা দলবদ্ধ ভ্রমণকারীদের চাহিদা বিবেচনায় রেখে এসব ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে স্থাপনাগুলোর সামঞ্জস্য রিসোর্টটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতিথিদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাও রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে থানচির মতো দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ, পানির ব্যবস্থা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করা সব সময় সহজ নয়।
রিসোর্টটির সহকারী ম্যানেজার মংপুশে মারমা বলেন, ‘আমরা পর্যটক ও অতিথিদের শতভাগ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু থানচির মতো দুর্গম এলাকায় পকেটে টাকা থাকলেও অনেক সময় প্রয়োজনীয় জিনিস সহজে পাওয়া যায় না। ছোটখাটো জিনিসের প্রয়োজন হলেও জেলা শহর থেকে সংগ্রহ করে আনতে হয়। পাহাড়ের উঁচু এলাকায় পানির সমস্যাও রয়েছে। এসব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অতিথিদের সন্তুষ্ট রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
তার বক্তব্যে উঠে আসে পাহাড়ি পর্যটন ব্যবসার বাস্তব চিত্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করলেও তাদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং নিরবচ্ছিন্ন সেবার উদ্যোগ।
অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিসোর্টের বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং রাতের জন্য নৈশপ্রহরীর ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পর্যটকেরা ঢাকা থেকে বান্দরবান হয়ে সরাসরি থানচিতে আসতে পারেন। এ ছাড়া ঢাকা-চকরিয়া-আলীকদম-থানচি সড়কপথেও যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে।
রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের আশা, যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটনসেবার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে থানচিতে পর্যটকদের আগ্রহ আরও বাড়বে। এতে স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
থানচি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ একটি পাহাড়ি জনপদ। এখানকার পাহাড়, ঝরনা, নদী ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি পর্যটনের জন্য বিশেষ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও দায়িত্বশীল সেবা নিশ্চিত করা।
তমা তুঙ্গী রিসোর্টের মতো স্থানীয় উদ্যোগগুলো সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। পারিবারিক স্বপ্ন থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে সেবার মান, পর্যটকদের সন্তুষ্টি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ওপর।
পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারলে তমা তুঙ্গী রিসোর্ট হয়ে উঠতে পারে থানচির পর্যটন বিকাশের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
