নগরের যানজট কমানো, বন্দর ও বিমানবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ দ্রুত করা এবং নগরের ব্যস্ত সড়কগুলোতে চাপ কমানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে নির্মিত ‘শহীদ ওয়াসিম আকরাম’ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামোর পূর্ণ সুফল এখনও অধরা।
উড়ালসড়কের নয়টি সংযোগপথের (র ্যাম্প) একটিও যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত না থাকায় নগরের গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়নি। ফলে মূল
উড়ালসড়ক চালু হলেও বহু যাত্রীকে আগের মতোই নগরের যানজটপূর্ণ সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে।
প্রায় ১৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উড়ালসড়কের মোট ব্যয় ৪ হাজার ২৯৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। নগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত যাতায়াতের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি প্রধান সড়কগুলোর ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্য ছিল প্রকল্পটির। কিন্তু প্রবেশ ও বের হওয়ার সংযোগপথগুলো চালু না থাকায় সেই লক্ষ্য কতটা পূরণ হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
নগরের বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদ থেকে আশপাশের আবাসিক এলাকায় যাতায়াতকারীদের কাছে সরাসরি র ্যাম্প চালুর প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু বরাবরই নানা ত্রুটির কারণে সেই প্রত্যাশা বার বার পিছিয়ে যাচ্ছে। একই ভাবে জিইসির র্যাম্পও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন নিয়মিত চলাচলা করা যাত্রীরা।
বিশেষকরে জিইসি র ্যাম্প চালু হলে যেমন পাঁচলাইশ, নাসিরাবাদ, খুলশী, মুরাদপুর ও আশপাশের এলাকার মানুষের উড়ালসড়কে ওঠার সুযোগ বাড়বে; অন্যদিকে আগ্রাবাদ র ্যাম্প চালু হলে নগরের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে।
আগ্রাবাদ এলাকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আসিফ মাহাবুব বলেন, ‘আগ্রাবাদ থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আমার জিইসি বাসায় ফিরতে সময় লাগে এক ঘণ্টার বেশি। কারণ পথে যানজটের ঝক্কি পোহাতে হয়। অথচ র্যাম্প চালু হলে আগ্রাবাদ থেকে সরাসরি উড়ালসড়কে ১০ থেকে ১২ মিনিটে বাসায় চলে আসতে পারতাম দুই নম্বর গেট এলাকার বাসিন্দা মো. জামিলুর রহমান বলেন, ‘জিইসি থেকে আগ্রাবাদে সরাসরি যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হলে নগরের ভেতরে চলাচল সহজ হতে পারে। বর্তমানে অনেক এলাকা থেকে উড়ালসড়কে উঠতে হলে নির্ধারিত প্রবেশপথে পৌঁছাতে হয়। একইভাবে গন্তব্যের কাছাকাছি নামার সুযোগ না থাকলে মূল সড়কে ফিরতে অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে উড়ালসড়কের সম্ভাব্য সময় সাশ্রয়ের একটি অংশ হারিয়ে যাচ্ছে।’
চারটি র্যাম্পের কাজ প্রায় শেষ, তবু চালু হয়নি
ঘুরে দেখা যায়, নয়টি র্যাম্পের একটিও যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়নি। এর মধ্যে জিইসি র্যাম্পের নির্মাণকাজ ৯০ শতাংশ, আগ্রাবাদের ৫২ শতাংশ, চট্টগ্রাম ইপিজেড এলাকার দ্বিমুখী র্যাম্পের ৯০ শতাংশ এবং কর্ণফুলী ইপিজেড এলাকার র্যাম্পের ৮৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। অর্থাৎ, কয়েকটি র্যাম্পের কাজ উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছালেও সেগুলো চালু না হওয়ায় উড়ালসড়কের সঙ্গে নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকার সরাসরি সংযোগ এখনও তৈরি হয়নি। নির্মাণকাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছালেও র্যাম্পগুলো কেন চালু করা যাচ্ছে না, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন রয়েছে নগর পরিকল্পনাবিদদের।
জিইসিতে পাইপলাইন, আগ্রাবাদে জমির জট
চউকের প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, জিইসি এলাকায় র ্যাম্প নির্মাণে বাওয়া স্কুলের শিক্ষার্থীদের আপত্তি এবং চট্টগ্রাম ওয়াসার বড় পানির পাইপলাইন স্থানান্তরের জটি-লতা কাজের অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছে। আগ্রাবাদে জমি হস্তান্তর ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আপত্তির কারণেও নির্মাণকাজ বিলম্বিত হয়েছে এছাড়া আগ্রাবাদ ডেবারপাড় এলাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি ব্যবহার নিয়ে চউক ও রেলওয়ের মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, র ্যাম্প নির্মাণের জন্য রেলওয়ের প্রায় ২২ শতক জমির মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু জমির মূল্য পরিশোধের পরও জমিতে থাকা স্থাপনার ক্ষতিপুরণসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি না হওয়ায় জমি বুঝে পাওয়া বিলম্বিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, জমির মূল্য পরিশোধ করা হলেও স্থাপনাগুলোর ক্ষতিপুরণসংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি বাকি ছিল। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলে স্থাপনা অপসারণের নোটিশ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে নকশা পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণ এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার অবকাঠামো স্থানান্তরের জটিলতা দেখা দেয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আপত্তির পর নকশা পরিবর্তন এবং ইউটিলিটি স্থানান্তরের ব্যয় বৃদ্ধি প্রকল্পের ব্যয় ও সময়সীমায় প্রভাব ফেলে। ফলে শুরুতেই যথাযথ সমীক্ষা ও সমন্বিত পরিকল্পনা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
ফোরাম ফর প্ল্যানড চট্টগ্রামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ চন্দ্র বস্তু য়া বলেন, ‘এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে যথাযথ সমীক্ষা, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। নকশা পরিবর্তন, জমি নিয়ে জটিলতা এবং ইউটিলিটি স্থানান্তরের সমস্যা যদি প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সামনে আসে, তাহলে ব্যয় ও সময়, দুটিই বাড়ে। উড়ালসড়কের পূর্ণ সুফল নিশ্চিত করতে র্যাম্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করে চালুর পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতাগুলোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।’
চউকের সরকারি প্রকল্পতথ্য অনুযায়ী, লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে। প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ১৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং প্রথম সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৪ হাজার ২৯৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। সে সময় কাজ শেষ করার লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের জুন। পরবর্তী সময়ে নকশা পরিবর্তন, জমি ও অবকাঠামোগত জটিলতা এবং অন্যান্য সংশোধনের মধ্য দিয়ে ব্যয় বেড়েছে।
২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর উড়ালসড়কটির উদ্বোধন করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ দিকে পরীক্ষামূলক যান চলাচল শুরু হয় এবং ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি টোল আদায়ের মাধ্যমে নিয়মিত যান চলাচল শুরু হয়। কিন্তু মূল উড়ালসড়ক চালু হওয়ার পরও নয়টি র ্যাম্প যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত না থাকায় এর পূর্ণাঙ্গ সুফল নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘উড়ালসড়কের র্যাম্পগুলো চালুর বিষয়ে চউক কাজ করছে। জমি হস্তান্তর, পাইপলাইন স্থানান্তরসহ কিছু কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে কয়েকটি র্যাম্পের কাজ বিলম্বিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। বাকি কাজ শেষ করে র্যাম্পগুলো চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
The post নয় সংযোগপথই বন্ধ, মিলছে না পুরো সুফল appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
