নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় স্বল্প আয়ের মানুষের মাছের চাহিদা মেটানোর অন্যতম ভরসা ছিল পাঙাশ ও তেলাপিয়া। কিন্তু সেই মাছের দামও এখন বাড়তি চাপ তৈরি করেছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে এসব মাছ। ফলে পরিবারের খাবারের তালিকায় মাছের পরিমাণ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকে।
রাজধানীর বাজারগুলোতে আকারভেদে প্রতি কেজি পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকায়। অন্যদিকে, মাঝারি আকারের তেলাপিয়ার দাম প্রায় ২২০ টাকা এবং বড় আকারের তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়। এতে তুলনামূলক কম দামে মাছ কেনার সুযোগও সংকুচিত হয়ে এসেছে।
রাজধানীর রামপুরার কাঠমিস্ত্রি এরশাদ আলী চার সদস্যের সংসারের খরচ সামলাতে গিয়ে মাছ কেনার পরিমাণ কমিয়েছেন। তিনি জানান, রুই, কাতলা, বোয়াল ও শিং মাছ অনেক আগেই তাঁর সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে। আগে পাঙাশ ও তেলাপিয়া কিনলেও এখন সেগুলোর দাম বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত মাছ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এরশাদ আলী বলেন, বাজারে কাটা পাঙাশ পাওয়া গেলে মাঝেমধ্যে আধা কেজি কেনেন। ছোট তেলাপিয়ার দাম কম থাকলে সেটিও কেনার চেষ্টা করেন। তবে দাম বেশি থাকায় আগের মতো মাছ কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
মালিবাগ বাজারে পোশাকশ্রমিক দুলু মিয়ার অভিজ্ঞতাও একই। পরিবারের সদস্যদের জন্য মাছ কেনা জরুরি হলেও বাড়তি দামের কারণে তাঁকে পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। সপ্তাহে এক-দুই দিন পাঙাশ বা তেলাপিয়া কিনলেও আগের তুলনায় কম মাছ নিয়ে ফিরছেন তিনি।
### উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ে বাড়ছে দাম
মাছের দাম বৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন বিক্রেতারা। তাঁদের ভাষ্য, মাছের খাবারের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন ভাড়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন অতিরিক্ত খরচের প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।
কারওয়ান বাজারের মাছ বিক্রেতা আবুল কালাম জানান, আগে মাছ পরিবহনের একটি গাড়ির ভাড়া ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা ছিল। এখন তা বেড়ে ২০ হাজার টাকা বা তারও বেশি হয়েছে। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচ যুক্ত হওয়ায় বাজারে মাছের দাম বেড়েছে।
বাড্ডা বাজারের বিক্রেতা আমিনুল ইসলাম বলেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় মাছের বিক্রি কমেছে। আগে যেসব ক্রেতা এক থেকে দুই কেজি মাছ কিনতেন, তাঁদের অনেকে এখন অর্ধেক পরিমাণ কিনছেন। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও আর্থিক চাপে পড়ছেন।
দেশে চাষের মাছের জোগানে পাঙাশ ও তেলাপিয়ার বড় ভূমিকা রয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে পাঙাশ উৎপাদিত হয়েছে ৪ লাখ ৫ হাজার টন এবং তেলাপিয়া ৩ লাখ ৫৪ হাজার টন। দুই প্রজাতি মিলিয়ে উৎপাদনের পরিমাণ ৭ লাখ ৫৯ হাজার টন।
ময়মনসিংহ, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চাষের মাধ্যমে এসব মাছের বড় অংশ উৎপাদিত হয়। উৎপাদন বেশি হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণে মাছ দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে।
তবে উৎপাদন বেশি হলেও দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে না থাকলে এর সুফল সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো মাছ কেনার পরিমাণ কমিয়ে দিলে তাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় প্রাণিজ আমিষের জোগান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সংশ্লিষ্টদের মতে, মাছের খাবারের দাম কমানো এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে গবেষণা ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাছের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার খরচ কমানো গেলে বাজারে দাম সহনীয় রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তা না হলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য একসময় সহজলভ্য বলে পরিচিত পাঙাশ ও তেলাপিয়াও নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
