প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমন ঘিরে চট্টগ্রামে দুর্গাপূজার আয়োজনে এবার বাড়তি উৎসবের আমেজ। স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো নগরের জে এম সেন হলের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শনে আসছেন কোনো সরকারপ্রধান।
তাকে বরণে চলছে নগরের সড়ক সংস্কার, সৌন্দর্যবর্ধন ও মণ্ডপের সাজসজ্জা। সফর নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিএনপির নেতাকর্মীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি নগরের রহমতগঞ্জের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। সেখানে আর্থিক সহায়তা দেওয়ারও কথা রয়েছে তার।
পরে হোটেল র্যাডিসন ব্লুতে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভায় যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। রাতে বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় চার স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ, র্যাব, এসআরবি, আনসার ও বিজিবির ২০ হাজারের বেশি সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন।
এসআরবি-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এসএসএফের নির্দেশনা ও সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। র্যাব, পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও বিভাগীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পূজামণ্ডপগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন, মোবাইল টহল ও সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি থাকবে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ স্ট্রাইকিং ফোর্সও প্রস্তুত রাখা হবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরে প্রায় ২ হাজার ৬০০টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। মণ্ডপের সংখ্যা বিবেচনায় আগেভাগেই নিরাপত্তার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে এসআরবির যোগাযোগ নম্বরও দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে প্রটোকল অনুযায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পূজামণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি সাদাপোশাকেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতাদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয় রয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবের রহমান শামীম বলেন, পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় বিএনপির নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সভা করবেন। এতে সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতারাও অংশ নেবেন।
সভায় মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক কমিটি না থাকায় সেখানকার জ্যেষ্ঠ নেতারা অংশ নেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে চলছে সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। সার্কিট হাউস থেকে কাজীর দেউড়ি, আসকারদীঘি, জামালখান ও চেরাগী মোড় হয়ে জে এম সেন হল পর্যন্ত সড়ক ঘুরে দেখা যায়, কোথাও নতুন কার্পেটিং করা হয়েছে, কোথাও খানাখন্দ মেরামত চলছে। সড়ক বিভাজকে রং করা, ফুল ও গাছের চারা লাগানো এবং সড়কবাতি স্থাপনের কাজও চলছে। মণ্ডপের আশপাশ থেকে পোস্টার-ব্যানার সরানোর পাশাপাশি ফুটপাতের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে।
জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে চলছে প্যান্ডেল নির্মাণ, ধোয়া-মোছা ও আলোকসজ্জা। বর্ণিল আলোয় সাজানো হচ্ছে মণ্ডপের বিভিন্ন অংশ। অতিথিদের অভ্যর্থনা ও দর্শনার্থীদের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতেও নেওয়া হচ্ছে প্রস্তুতি।
চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক অর্পণ কান্তি ব্যানার্জি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পূজামণ্ডপে আসছেন—এ খবরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাঁকে স্বাগত জানাতে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ বলেন,'ইতোপূর্বে জে এম সেন হলের দুর্গাপূজায় কোনো সরকারপ্রধান পরিদর্শনে আসেননি। এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী পূজা পরিদর্শনে আসছেন। এতে আমরা খুবই আনন্দিত। তাকে স্বাগত জানাতে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি। আশা করি, সুন্দরভাবে আয়োজন সম্পন্ন করতে পারব।'
চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তার চট্টগ্রাম আগমন আনন্দের বিষয়। সফর সফল করতে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।
চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, চট্টগ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তার আগমন ঘিরে নগরে উৎসাহ ও আন্তরিকতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবার সমান অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে কয়েক দিন ধরেই প্রস্তুতি চলছে। জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন মাহবুবের রহমান শামীম, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান। একই দিন মণ্ডপ পরিদর্শন করেন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, এসআরবি-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান, সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ও সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
এর আগে ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম জেলা পরিষদে বিএনপি, মহানগর পূজা উদ্যাপন পরিষদ, বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উদ্যাপন পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় হয়। ১৬ অক্টোবর সিটি করপোরেশনের রেস্ট হাউসেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
পরদিন রাতে পানি সম্পদমন্ত্রী ও চট্টগ্রাম জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানির নেতৃত্বে প্রশাসন ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে অনলাইনে সভা হয়। একই রাতে মহানগর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির নেতারাও বৈঠক করেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে নগরের প্রস্তুতি পরিদর্শন করেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, সড়ক উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন, ঐতিহাসিক স্থাপনার সংস্কার ও পরিচ্ছন্নতার কাজকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে এসব উদ্যোগ শুধু প্রধানমন্ত্রীর সফরকে কেন্দ্র করে নয়; নগরবাসীর দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণ ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ার লক্ষ্যেও নেওয়া হয়েছে।
মেয়র বলেন, ‘চার দিন আগেও এই জায়গার যে চিত্র ছিল, বর্তমানে তার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জায়গাটিকে সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। আমরা চেয়েছি, প্রধানমন্ত্রী এখানে এলে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের প্রতিফলন দেখতে পাবেন।’
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরে মেয়র বলেন, যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত, যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, সূর্য সেন ও মহিমচন্দ্র দাস সেনগুপ্তসহ স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদান রাখা ব্যক্তিদের স্মৃতি সংরক্ষণ জরুরি। সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে, যাতে নতুন প্রজন্ম গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নগরের ১৬টি থানার আওতাধীন ২৯৪টি পূজামণ্ডপে ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপে পাঁচ লাখ, জামাল খানের কুসুমকুমারী পূজামণ্ডপে ১৫ লাখ এবং হরিজন সম্প্রদায়ের চারটি সেবক কলোনিতে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সিটি করপোরেশনের সহায়তার পরিমাণ ৩৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় ১০ হাজার শাড়ি ও লুঙ্গি বিতরণ করা হয়েছে বলে জানান মাহবুবের রহমান শামীম। চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন মন্দির, সংগঠন ও পূজা উদ্যাপন কমিটির মাধ্যমে এসব উপহার দেওয়া হয়।
গত ৯ অক্টোবর জে এম সেন হলের মাঠে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব উপহার বিতরণ করেন। নগর ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপেও আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে।
১৯১৯ সালে নির্মিত টাউন হলটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের মৃত্যুর পর তার নামানুসারে জে এম সেন হল নামে পরিচিতি পায়।
ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন, আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে আন্দোলন, চা শ্রমিকদের মুল্লুক চলো আন্দোলন, চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থাপনায় দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
