অষ্টমীর সকাল মানেই নতুন পোশাকে অঞ্জলি দিতে মণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতি। বাড়িতে তখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। কেউ ফুল-বেলপাতা গুছিয়ে নিচ্ছেন, কেউ আবার সময়ের মধ্যে মণ্ডপে পৌঁছনোর তাড়ায় সকালের খাবারই বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। অঞ্জলি পর্ব মিটলেই বাড়ি ফিরে বা পুজোর ভোগের থালায় গরম লুচি, আলুরদম আর মিষ্টি। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকার পর একসঙ্গে পেট ভরে খাওয়াদাওয়া শরীরের পক্ষে কতটা ঠিক? বিশেষত ডায়াবেটিস, অ্যাসিডিটি বা হজমের সমস্যা থাকলে অষ্টমীর সকালে উপোস ও তার পরের খাওয়াদাওয়ায় কোন বিষয়গুলি মাথায় রাখা জরুরি?
দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে
সকালে অঞ্জলি দেওয়ার জন্য অনেকেই কিছু খান না। কারও ক্ষেত্রে এই সময়টা কয়েক ঘণ্টা বা তারও বেশি। দীর্ঘক্ষণ খাবার না খেলে কারও কারও দুর্বল লাগা, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা বা মনোযোগে সমস্যা দেখা দিতে পারে। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘাম বেশি হলে এবং পর্যাপ্ত জল পান না করলে শরীরে জলের ঘাটতিও দেখা দিতে হতে পারে।
তবে উপোস করলেই যে প্রত্যেকের শরীর খারাপ হবে, এমন নয়। এর প্রভাব নির্ভর করে কতক্ষণ না খেয়ে থাকছেন, শরীরের সামগ্রিক অবস্থা, উপোসের আগের খাবার এবং শারীরিক পরিশ্রমের উপর। যাঁদের ডায়াবেটিস রয়েছে বা যাঁরা রক্তে শর্করার মাত্রা কমানোর ওষুধ খান, তাঁদের ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা বিশেষ ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের সময় বদলানো বা খাবার বন্ধ রাখা উচিত নয়।
অঞ্জলির পরেই লুচি?
অঞ্জলি শেষ হলে পেটের খিদে মেটাতে গরম লুচি আর আলুরদমের আকর্ষণ এড়ানো কঠিন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার পর একসঙ্গে অনেকটা তেলেভাজা খাবার খেলে পেট ভার, অস্বস্তি, পেট ফাঁপা বা অম্বলের সমস্যা বাড়তে পারে। লুচিতে পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি তেলও থাকে। তার সঙ্গে আলুরদম ও মিষ্টি বেশি পরিমাণে খেলে এক বেলার খাবারে মোট ক্যালরি ও কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, খাবারের পরিমাণ এবং কীভাবে খাওয়া হচ্ছে, তা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। খালি পেটে লুচি খেলেই যে সকলের অম্বল হবে, এমন নয়। তবে যাঁদের আগে থেকেই অ্যাসিডিটি বা হজমের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবারে অস্বস্তি বাড়তে পারে। তাই উপোস ভাঙার সময় একবারে পেট ভরে খাওয়ার বদলে অল্প পরিমাণে খাবার খাওয়াই ভালো।

ডায়াবেটিসে বাড়তি সতর্কতা
ডায়াবেটিসের রোগীদের অষ্টমীর উপোসের ক্ষেত্রে বিশেষ সাবধানতা প্রয়োজন। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার পর লুচি, আলুরদম ও মিষ্টি একসঙ্গে বেশি পরিমাণে খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে। আবার কিছু ওষুধ বা ইনসুলিনের প্রভাবে খাবার না খেলে রক্তে শর্করা বিপজ্জনকভাবে কমতে পারে। তাই ডায়াবেটিস থাকলে উপোসের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। নিজের সিদ্ধান্তে ইনসুলিন বা ওষুধের মাত্রা কমানো, বাড়ানো বা বন্ধ করা বিপজ্জনক হতে পারে।
কীভাবে উপোস ভাঙবেন?
সকালে অঞ্জলি দিয়ে বাড়ি ফেরার পর খুব বেশি খিদে পেলেও একসঙ্গে অনেকটা খাবার না খাওয়াই ভালো। অল্প পরিমাণে খাবার খান। সম্ভব হলে খাবারের তালিকায় ডাল, সবজি, টক দইয়ের মতো পুষ্টিকর উপাদান রাখুন। লুচি খেতে চাইলে পরিমাণে সংযম রাখুন। সঙ্গে অতিরিক্ত তেলযুক্ত তরকারি ও মিষ্টি একসঙ্গে বেশি না খাওয়াই ভালো।
জল পানে নিয়ন্ত্রণে না থাকলে পর্যাপ্ত জল পান করুন। তবে যাঁদের কিডনি বা হৃদ্যন্ত্রের অসুখের কারণে জল পানে নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে, তাঁরা চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলুন। খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়বেন না। কিছুক্ষণ সোজা হয়ে বসে থাকুন বা হালকা হাঁটাহাঁটি করুন। এতে খাওয়ার পর অস্বস্তি কমাতে সুবিধা হতে পারে।
যাঁদের অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্সের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের একবারে অনেকটা না খেয়ে অল্প পরিমাণে খাওয়া ভালো। শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী মহিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি অসুখে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও দীর্ঘক্ষণ উপোস করার আগে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

উৎসবের আনন্দে শরীরের খেয়াল
অষ্টমীর উপোস অনেকের ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও পারিবারিক রীতির অংশ। কিন্তু সেই নিয়ম পালন করতে গিয়ে শরীরের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। বিশেষ করে মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অসুস্থ বোধ করলে বিশ্রাম নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার ও জল পান জরুরি। অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি, বুকে ব্যথা বা গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা দরকার।
পুজোর আনন্দ মানেই খাওয়াদাওয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা নয়, আবার দীর্ঘক্ষণ উপোসের পর পেট ভরে লুচি-মিষ্টি খাওয়াও নয়। শরীরের সংকেত বুঝে খাওয়া, খাবারের পরিমাণে সংযম রাখা এবং নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী সতর্ক থাকাই পারে অষ্টমীর আনন্দকে আরও স্বস্তির করে তুলতে।
