ওয়ালটন হাইটেক পার্ক থেকে ফিরে: আড়াই কিলোমিটার ফুটপাতের শেড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সৌরপ্যানেল। পথচারীকে রোদ-বৃষ্টি থেকে নিরাপত্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে ১.১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের যোগান দিয়ে যাচ্ছে শেডটি।
সোলার প্যানেলের ফুটপাত ধরে এগিয়ে গেলে বিশাল জলাশয়, সেখানে ভাসছে ফ্লোটিং সোলার প্যানেল। মাছ চাষের পাশাপাশি ২.২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে তাতে। আরও অবাক করার বিষয় হচ্ছে, সবাই যখন প্রযুক্তি ও কাচামালের জন্য চীনের দিকে তাকিয়ে। তখন ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের ড্রাম ব্যবহার করে অনন্য নজীর গড়েছে ওয়ালটন।
ওয়ালটনের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইউসুফ আলী জানালেন আরও অবাক করার মতো তথ্য। তিনি বলেন, চীনা প্রযুক্তির ফ্লোটিং সোলারে দুইজন লোক উঠলেই পানিতে তলিয়ে যায়। আমাদের স্থানীয় প্রযুক্তির (প্লাস্টিকের অব্যবহৃত ড্রাম) ফ্লোটিং সোলারে একসঙ্গে ৫০ জন উঠলেও ঝূঁকিমুক্ত।
প্রথমে বিশ্বাস না হলেও পরে সরেজমিন গিয়ে চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা। তখনও প্রায় জনা চল্লিশেক লোক ঘুরে দেখছিলেন। তীরের সঙ্গে এমনভাবে সংযুক্ত করা, ঠিক যেভাবে ফেরীঘাটের ব্যবস্থাপনা থাকে।পানি বেড়ে গেলে উপরে উঠবে আবার নেমে গেলে নিচে নেমে যাবে।
ফুটপাতে ১.১ মেগাওয়াট আর পুকুরের ২.২৫ মেগাওয়াটই শুধু নয়, প্রায় প্রত্যেকটি ভবনের ছাদে শোভা পাচ্ছে সৌরপ্যানেল। এখানেও ওয়ালটন মুন্সিয়ানার স্বাক্ষর রেখেছে। সোলার প্যানেলকেই টিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেছে। অনেকে টিন কিংবা কংক্রিটের উপর প্যানেল স্থাপন করলেও এখানে প্যানেলের সঙ্গে বিশেষ প্রযুক্তি বৃষ্টি থেকেও রক্ষা করছে। কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন ছিল শিলাবৃষ্টিতে ঝুঁকি থাকছে কি-না! জবাবে বললেন, আমরা কয়েক দশকের রেকর্ড দেখেই প্রযুক্তি পছন্দ করেছি। শিলাবৃষ্টিতে এসব প্যানেলের কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নেই।

কারখানাটির গাড়ির জন্য তৈরি শেডেও সোলার প্যানেল শোভা পাচ্ছে। আবার কৃষিতে সোলার ব্যবহারের দিকে ঝুকছে ওয়ালটন। এমন কিছু শষ্য রয়েছে যেগুলো সঠিক ফলনের ক্ষেত্রে টানা রোদ ক্ষতিকারণ, কৃষিবিদদের পরামর্শে বিশেষ কায়দায় সোলার প্যানেল বসানো হচ্ছে।
মো. ইউসুফ আলী জানালেন, সৌর থেকে ৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এর পরিধি বাড়ানোর কাজ অব্যাহত রয়েছে, খুব শিগগিরই ৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। মাসে যে বিদ্যুৎ পাচ্ছি, ডিজেল ব্যবহার করলে ৬৯ লাখ, ৭৯ হাজার ব্যারেল তেলের প্রয়োজন পড়তো। কার্বন ইমিশন কমেছে ৯ লাখ ৪৩ হাজার ১৬০ টন, যা ১১ লাখ ৭৮টি বৃক্ষ রোপনের সমান। মাসে প্রায় ৩২ লাখ ৬৪ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছি। এতে আমাদের বিশাল সাশ্রয় হচ্ছে, বাড়তি পাওনা হচ্ছে কার্বন ক্রেডিট।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) অর্থায়নে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি, ইএসএস ব্যাটারি এবং সোলার ইনভার্টার উৎপাদনের পথে রয়েছে ওয়ালটন। আগামী মাসেই লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এসব পণ্য এখন পুরোপুরি আমদানির উপর নির্ভরশীল। ওয়ালটনের প্রয়াস বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও দেশীয় কোম্পানিটি অনেক পণ্যের বিদেশি নির্ভরতা কমিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। এমনকি দেশের বাজারের পাশাপাশি ৫৬টি দেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। এরমধ্যে যেমন বিলাসী পণ্যখ্যত এসি-ফ্রিজ-ওয়াশিং মেশিন- টিভি রয়েছে, তেমনি দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য বৈদ্যুতিক ক্যাবল, বাল্ব, ফ্যান, সুইচসহ বৈদ্যুতিক সল্যুউশন রয়েছে।

এ ছাড়া হোম অ্যাপ্লায়েন্সের মধ্যে রয়েছে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, ব্লেন্ডার ও রাইস কুকার, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, স্মার্টফোন, মনিটর ও সিসিটিভি ক্যামেরা উৎপাদন করছে। পাশাপাশি, উন্নত মানের মোটর, কম্প্রেসর, জেনারেটর এবং পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাইক (Takyon) উৎপাদন করে তারা প্রযুক্তির বাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে।
বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স ও প্রযুক্তি খাতের একটি অগ্রগামী ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে ওয়ালটন। ১৯৭৭ সালে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি দেশীয় প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় স্বনির্ভরতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়ালটনের পণ্য এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং আমেরিকার ৫৬টিরও বেশি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এমনকি ভারতের বাজারেও তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডের ফ্রিজ ও টিভি শোরুমের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারণ শুরু করেছে।
ওয়ালটন জানিয়েছে, তারা শুধু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে থেমে থাকছে না। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে অন্যদের থেকে কয়েকধাপ এগিয়ে গেছেন। রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার (এসি) এবং ওয়াশিং মেশিনে অত্যাধুনিক ইনভার্টার প্রযুক্তি সংযুক্ত করেছে। যা সাধারণ পণ্যের তুলনায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে সক্ষম। এছাড়া, বৈশ্বিক জলবায়ু সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে ওয়ালটন তাদের কম্প্রেসরে পরিবেশবান্ধব এবং ওজোনস্তর-বান্ধব রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস ব্যবহার করছে, যা কার্বন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করে। পরিবেশের ক্ষতি না করে এবং ব্যবহারকারীর পকেটের খরচ বাঁচিয়ে ওয়ালটন আজ দেশে ও বিদেশে টেকসই গ্রিন টেকনোলজির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ওয়ালটন হাইটেক পার্ক পরিদর্শন করেন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বর্তমানে এক ইউনিট বিদ্যুতে সরকারকে ৫ টাকার মতো ভর্তুকি দিতে হয়। আমরা চেষ্টা করছি সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে। এ জন্য এনার্জি সাশ্রয়ী ভবন ব্যবহারের উদ্বুদ্ধ ও অর্থায়ন করছি।
তিনি বলেন, আমরা ২০০২ সালে যখন সৌরবিদ্যুতের কথা বলতাম, তখন অনেকেই কাছেই বিষয়টি ছিল বিষ্ময়ের। হাটে-বাজারে গিয়ে জনগণকে হাতে কলমে প্রমাণ দেখাতে হয়েছে। আমার মনে হয় এখন সৌর বিদ্যুৎ সম্পর্কে জানেন না এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। ২০০২ সালে ছিল বেসিক লাইটিং প্রোগ্রাম, এখন সৌর বিদ্যুৎ দিয়ে সবকিছু হচ্ছে।
তিনি বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে ১ কোটি ৬৩ লাখ বসতি রয়েছে। নানান শ্রেণির মধ্যে অর্ধেক বাদ দিলেও প্রায় ৮০ লাখ আবাসন রয়েছে। প্রত্যেক বাড়িতে ৪ কিলোওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলেও বিশাল আকার ধারণ করবে। আমরা একটি একটি স্ফুলিঙ্গ একত্র করে দাবানল তৈরি করতে চাই। আগামী গরমের মৌসুমে স্বস্তি পেতে এটি হতে পারে মোক্ষম হাতিয়ার। আমরা তারই পদক্ষেপ হিসেবে ডিআরএস কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। ইতোমধ্যেই বেশকিছু প্রকল্প চূড়ান্তের পথে রয়েছে। দেশবাসীর সহায়তা পেলে বড় কিছু করা সম্ভব।
