বানানের দিকে সূক্ষ্ণ মনোযোগ না দিলে ‘দাড়ি’ আর ‘দাঁড়ি’—এই দুটি শব্দে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক। ‘দাড়ি’ অর্থ গাল ও চিবুকে গজানো লোম বা শ্মশ্রু। যেমন—“তার দাড়ি অনেক লম্বা।” আর ‘দাঁড়ি’ অর্থ বাক্যের শেষে ব্যবহৃত পূর্ণচ্ছেদ চিহ্ন (।), নৌকার মাঝি বা দাঁড় টানা ব্যক্তি, কিংবা তুলাদণ্ড। যেমন—“বাক্যের শেষে দাঁড়ি (।) দাও।”
কিন্তু এই ছোট্ট শব্দটির পেছনে রয়েছে মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস, সাংস্কৃতিক পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতীক এবং ইসলামি ফিকহের একটি বহুমাত্রিক আলোচনা। দাড়ি কেবল মুখের চুল নয়; যুগে যুগে এটি পৌরুষ, ক্ষমতা, জ্ঞান, তপস্যা, গোত্রীয় পরিচয় এবং ধর্মীয় আনুগত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সভ্যতার ইতিহাসে দাড়ি
প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর, গ্রিস, রোম ও ভারতীয় সভ্যতায় দাড়ির অর্থ ছিল ভিন্ন ভিন্ন। মিশরে ফারাওরা কৃত্রিম দাড়ি ব্যবহার করতেন, যা রাজকীয় মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। গ্রিসে দার্শনিকদের দাড়ি ছিল প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের চিহ্ন; সক্রেটিস, প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের ভাবমূর্তিতে দাড়ি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় বহন করে।
রোমে দাড়ি পৌরুষ ও নাগরিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। প্রাচীন ভারতে ঋষি-মুনিদের দাড়ি তপস্যা ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক ছিল, আবার রাজাদের দাড়ি রাজকীয় প্রভাবের চিহ্ন হিসেবে গণ্য হতো। ইসলামপূর্ব আরবে দাড়ি ছিল গোত্রীয় পরিচয়, বীরত্ব ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। অর্থাৎ দাড়ি কখনো শুধু শারীরিক বৈশিষ্ট্য ছিল না। এটি সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ধর্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রতীকী ভাষা। ইসলামে এসে দাড়ি ইবাদত-সংশ্লিষ্ট আচরণ এবং মুসলিম পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসলামে দাড়ির হুকুম
দাড়ি রাখা ইসলামে কী—ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত, নাকি কেবল সামাজিক পরিচয়ের প্রতীক—এই প্রশ্নে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই মতভেদ রয়েছে। এই মতভেদ আধুনিক যুগের সৃষ্টি নয়; ইসলামি ফিকহের ধ্রুপদি গ্রন্থগুলোতেও দাড়ির হুকুম নিয়ে মাযহাবভেদে ভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
মূল ভিত্তি হলো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ: গোঁফ ছোট করতে এবং দাড়ি বাড়াতে। ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন, মুশরিকদের বিরোধিতা করো; গোঁফ ছোট করো এবং দাড়ি বাড়াও।
এই হাদিস সব মাযহাবের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—‘দাড়ি বাড়াও’ নির্দেশটি কি আবশ্যকীয়, নাকি উৎসাহিত করা সুন্নত? এই ব্যাখ্যার পার্থক্য থেকেই ফিকহি মতভেদের জন্ম হয়েছে।
হানাফি অবস্থান
হানাফি মাযহাবে দাড়ি রাখা ওয়াজিব বলে বিবেচিত হয়। হানাফি ফুকাহার প্রচলিত মত হলো, দাড়ি অন্তত এক মুঠি বা ‘কবজা’ পরিমাণ রাখা আবশ্যক। এক মুঠির বেশি হলে তা ছাঁটা জায়েজ; তবে এক মুঠির কম করা অপছন্দনীয় বা নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হয়।
এই মতের ভিত্তি হলো ইবনে উমর (রা.)-এর আমল। বুখারির বর্ণনায় এসেছে, তিনি হজ বা ওমরার সময় দাড়ি মুঠিতে ধরে অতিরিক্ত অংশ কেটে ফেলতেন। হানাফি ফুকাহা এই আমলকে ভিত্তি করে এক মুঠির সীমা নির্ধারণ করেছেন।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা দরকার: ‘এক মুঠি’ কথাটি সরাসরি রাসূল (সা.)-এর কোনো নির্দেশবাক্য নয়; এটি মূলত ইবনে উমর (রা.)-এর আমল থেকে নেওয়া একটি ফিকহি ব্যাখ্যা।
শাফেয়ি অবস্থান
শাফেয়ি মাযহাবে দাড়ি রাখাকে সাধারণভাবে সুন্নত বলা হয়। তবে অনেক শাফেয়ি আলেম দাড়ি সম্পূর্ণ মুণ্ডনকে অপছন্দনীয় বা নিষিদ্ধ বলেছেন। শাফেয়ি মাযহাবের মধ্যেও দাড়ি ছাঁটার পরিমাণ নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে; কেউ এক মুঠির সীমা মেনেছেন, কেউ তা কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন।
মিসরের দারুল ইফতার ফতোয়াতেও দেখা যায়, শাফেয়ি আলেমদের মধ্যে দাড়ির হুকুম নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে। কারও মতে এটি সুন্নত, কারও মতে ওয়াজিব।
মালিকি ও হাম্বলি অবস্থান
মালিকি ও হাম্বলি মাযহাবের সংখ্যাগরিষ্ঠ মত হলো, দাড়ি সম্পূর্ণ মুণ্ডন করা নিষিদ্ধ। হাম্বলি আলেমদের মধ্যে এই অবস্থান বিশেষভাবে স্পষ্ট।
ইমাম ইবনে হাযম দাবি করেছেন, দাড়ি রাখা ফরজ এবং মুণ্ডন করা বৈধ নয়। তবে এই ‘ইজমা’ বা সর্বজনীন ঐকমত্যের দাবি সব মাযহাবে সমানভাবে গৃহীত নয়; বিশেষত শাফেয়ি মাযহাবে মুণ্ডনকে কেউ কেউ মাকরুহ বলেছেন, হারাম নয়।
সালাফি বা আহলে হাদিস অবস্থান
সালাফি বা আহলে হাদিসপন্থী আলেমদের প্রচলিত মত হলো, দাড়ি রাখা ওয়াজিব। তাঁদের যুক্তি হলো, রাসূল (সা.)-এর স্পষ্ট আদেশ ‘দাড়ি বাড়াও’ মূলত আবশ্যকীয় নির্দেশ বহন করে, যদি না অন্য কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকে যে এটি কেবল মুস্তাহাব।
এই মতে দাড়ি যতটা বাড়ে ততটা রাখতে হবে; এক মুঠির সীমা ধরার পক্ষে তাঁরা সাধারণত জোর দেন না। তাঁদের যুক্তি হলো, ‘দাড়ি বাড়াও’ নির্দেশের সরাসরি অর্থ হলো দাড়ি বাড়তে দেওয়া, কাটা নয়।
রাসূল (সা.)-এর দাড়ির আকার
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাড়ি ছিল ঘন ও পূর্ণ বলে একাধিক বর্ণনায় উল্লেখ আছে। তিনি দাড়ি পরিষ্কার রাখতেন, চিরুনি দিতেন এবং দাড়িতে পানি ঢালতেন।
তবে রাসূল (সা.) নিজে দাড়ির কোণ, দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ কাটতেন—এমন কিছু বর্ণনা দুর্বল বলে বিবেচিত হয়েছে। ইবনে বাজ (রহ.)-এর মতো আলেম এই ধরনের বর্ণনাকে দুর্বল বলেছেন। তাই ‘রাসূল (সা.) নিজে দাড়ি ছাঁটতেন’—এই দাবিটি সতর্কতার সঙ্গে উপস্থাপন করা উচিত।
শিয়া ফিকহে দাড়ি
শিয়া ফিকহে দাড়ি নিয়ে একক মত নেই। আয়াতুল্লাহ সিস্তানির মতে, এহতিয়াত বা সতর্কতার ভিত্তিতে দাড়ি সম্পূর্ণ মুণ্ডন করা জায়েজ নয়।
তিনি বলেছেন, দাড়ি এমনভাবে রাখতে হবে যাতে চিবুক ও গালে কিছু চুল থাকে; সম্পূর্ণ মুণ্ডন করা যাবে না। তবে শিয়া ফিকহে দাড়ির দৈর্ঘ্য নিয়ে সুন্নি ফিকহের মতো এক মুঠির সুনির্দিষ্ট সীমা প্রধান মানদণ্ড নয়।
কেন এত মতভেদ
দাড়ির হুকুম নিয়ে মতভেদের মূল কারণ হলো উসুলে ফিকহ বা ফিকহি পদ্ধতির পার্থক্য। ‘দাড়ি বাড়াও’ নির্দেশটি কি ওয়াজিব বোঝায়, নাকি মুস্তাহাব—এই প্রশ্নেই মাযহাবগুলোর মধ্যে ভিন্নতা তৈরি হয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো ‘খিলাফ’ বা বিরোধিতার নীতি। রাসূল (সা.) মুশরিকদের বিরোধিতার নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু সেই বিরোধিতা কি কেবল গোঁফ ছোট করার মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি দাড়ি বাড়ানোর মধ্যেও? এই ব্যাখ্যাও মাযহাবভেদে ভিন্ন।
আরেকটি বিষয় হলো ‘তাশাব্বুহ’ বা অন্যদের সঙ্গে সাদৃশ্যের নিষেধ। ইসলামপূর্ব আরবে কিছু গোত্র বা ধর্মীয় গোষ্ঠী দাড়ি মুণ্ডন করত; তাই তাদের সঙ্গে সাদৃশ্য এড়ানোর নির্দেশকে কেউ কেউ দাড়ি রাখার ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে দাড়ি কেবল একটি ফিকহি প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নও। অনেকের কাছে দাড়ি ইসলামি পরিচয়, ধর্মপরায়ণতা বা সুন্নতের প্রতীক; আবার অনেকের কাছে এটি রক্ষণশীলতা বা রাজনৈতিক অবস্থানের চিহ্ন।
এই দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি দাড়ির ফিকহি আলোচনাকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে দাড়ি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেক সময় ফিকহের সূক্ষ্ম মতভেদ হারিয়ে যায়, আর জায়গা নেয় সামাজিক বিচার বা রাজনৈতিক টানাপোড়েন।
মূল কথা
দাড়ি রাখা ইসলামে একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল ও ফিকহি বিষয়, তবে এর হুকুম নিয়ে মাযহাবভেদে ভিন্নতা রয়েছে। হানাফি ও সালাফি মতে এটি ওয়াজিব; শাফেয়ি মতে সুন্নত; মালিকি ও হাম্বলি মতে মুণ্ডন নিষিদ্ধ। শিয়া ফিকহে সিস্তানির মতে এহতিয়াতের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ মুণ্ডন জায়েজ নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাড়ি ছিল পূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন; তিনি দাড়ির পরিচর্যা করতেন। তবে ‘এক মুঠির বেশি কাটা’ বিষয়টি মূলত সাহাবিদের আমল থেকে নেওয়া; সরাসরি হাদিসে এর সুস্পষ্ট নির্দেশ নেই।
ফলে দাড়ি নিয়ে বিতর্ক শুধু ফিকহি নয়; এটি মুসলিম পরিচয়, সংস্কৃতি এবং সমাজের সঙ্গেও গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট। এই আলোচনায় সবচেয়ে জরুরি হলো জ্ঞান, সহনশীলতা, ফিকহি মতভেদের প্রতি সম্মান ও আমলের মানসিকতা।
