দিনাজপুরের ভুসির বন্দরের ভার্মি কম্পোস্ট কারখানায় নাঈম হুদা কাজে ব্যস্ত। ছবি: খবরের কাগজ
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষ করে নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে চাকরি শুরু করেছিলেন নাঈম হুদা। চাকরি করেই চলছিল সংসার। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর চাকরি ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। এরপর করোনাকালে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ কমে যাওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েন। একদিকে সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে পরিবারের চাকরিতে ফিরে যাওয়ার চাপ–সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করতে হয় তাকে।
তবু হাল ছাড়েননি। স্ত্রীর দেওয়া স্বর্ণের আঙটি বিক্রি করে শুরু করেন কেঁচো সার উৎপাদনের উদ্যোগ। পরপর দুই দফা ব্যর্থ হয়েও থেমে যাননি।
নিজের ব্যবহৃত ল্যাপটপ বিক্রি করে আবারও শুরু করেন। সেই উদ্যোগই এখন তার আয়ের অন্যতম উৎস। দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে গড়ে তোলা খামারে প্রতি মাসে উৎপাদন করছেন ৮ থেকে ১০ টন ভার্মি কম্পোস্ট সার। কর্মসংস্থান হয়েছে ৮ থেকে ১০ জনের। তাদের মধ্যে রয়েছেন হযরত আলী, সাদিকুল ইসলাম ও মরিয়ম বেগম।
নাঈমের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। নিজের ফল ও সবজিবাগানের জন্য জৈব সারের প্রয়োজন থেকেই কেঁচো সার উৎপাদনের চিন্তা আসে তার মাথায়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রংপুর থেকে ১০ কেজি কেঁচো কিনে আনেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার অভাবে প্রথমবারই বিপাকে পড়েন। বৃষ্টির পানি জমে কেঁচো মারা যাওয়ায় ব্যর্থ হন তিনি। পরে বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে ১৪ হাজার টাকা ধার করে আবারও ১০ কেজি কেঁচো কিনে আনেন। কিন্তু সঠিক পদ্ধতি জানা না থাকায় দ্বিতীয়বারও সফল হতে পারেননি।
পরপর দুই দফা ব্যর্থ হয়ে হতাশ হয়ে পড়লেও কৃষিতে কিছু করার স্বপ্ন ছাড়েননি নাঈম। পরিবারের পক্ষ থেকে চাকরিতে ফিরে যাওয়ার চাপ থাকলেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
শেষ পর্যন্ত ব্যবহৃত ল্যাপটপটি এক বন্ধুর কাছে বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে আবারও কেঁচো কেনেন। এবার খামারে ছাউনি তৈরি করে গোবরের নির্দিষ্ট স্তরে কেঁচো ছাড়েন। প্রায় ১৫ দিন পর উৎপাদন শুরু হয় ভার্মি কম্পোস্টের। নিজের বাগানে ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের কাছে সার বিক্রি শুরু করেন। কৃষকরা জমিতে এ সার ব্যবহার করে ইতিবাচক ফল পাওয়ার কথা জানালে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে চাহিদা।
দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর উপজেলার বৈকণ্ঠপুর গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে নাঈম হুদা। উপজেলার ভুসির বন্দর বাজারসংলগ্ন পুকুর ধারে এই ভার্মি কম্পোস্ট বা কিছু সারের কারখানা তৈরি করেছেন নাঈম হুদা।
বর্তমানে ৫ থেকে ৬ শতক জমিতে গড়ে তোলা খামার থেকে মাসে ৮ থেকে ১০ টন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন নাঈম। পাইকারিতে প্রতি টন ১৩ হাজার টাকা দরে সার বিক্রি করেন তিনি। খুচরা বাজারে প্রতি কেজির দাম ১৬ থেকে ১৮ টাকা। ফল ও সবজিচাষে ব্যবহারের পাশাপাশি পুকুরের মাছের খাদ্য হিসেবেও এ সার ব্যবহার করা হচ্ছে। খামারের উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রমে নিয়মিত কাজ করছেন ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক।
খামারে প্রতিদিন কাজ করেন হযরত আলী। কেঁচো সার উৎপাদন, গোবর প্রস্তুত ও খামারের বিভিন্ন কাজে যুক্ত থেকে তিনি নিয়মিত আয় করছেন। হযরত আলী বলেন, এ খামারে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় তার কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রতিদিন কাজ করে আয় করতে পারছেন, যা তার সংসার চালাতে সহায়তা করছে। নিয়মিত কাজের সুযোগ থাকায় তিনি স্বস্তি বোধ করছেন।
একই খামারে কাজ করেন সাদিকুল ইসলাম। কেঁচো সার তৈরির বিভিন্ন ধাপে শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। সাদিকুল ইসলাম বলেন, খামারে কাজ করে নিয়মিত উপার্জনের সুযোগ হয়েছে তার। আগে কাজের নিশ্চয়তা নিয়ে চিন্তা থাকলেও এখন প্রতিদিন কাজ করার মাধ্যমে সংসারের খরচ মেটাতে পারছেন। এ ধরনের উদ্যোগ আরও বড় হলে এলাকার অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
খামারের আরেক কর্মী মরিয়ম বেগম। তিনিও প্রতিদিনের কাজে অংশ নিয়ে আয় করছেন। মরিয়ম বেগম বলেন, এ খামারে কাজ করার সুযোগ পাওয়ায় তার কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। নিয়মিত কাজ করে নিজের আয় করতে পারছেন এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করছেন। স্থানীয়ভাবে এ ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তাদের মতো মানুষের উপকার হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক রতন কুমার মহন্ত বলেন, ‘আমি এখন ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহার করে জমির উৎপাদন অনেক বেড়ে গিয়েছে। তাই আমি এখন রাসায়নিক সার কম ব্যবহার করে ভার্মি কম্পোস্ট সার, বিশেষ করে নাঈম হুদার খামার থেকেই ভার্মি কম্পোস্ট সার প্রয়োগ করে জমিতে দিচ্ছি। ফসল ভালো হচ্ছে। পানির সেচ কম লাগে। ফসল অনেক ভালো হয়। তাই আমি এখন জমিতে ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহার করছি।’
স্থানীয় কৃষক গোলাম রব্বানী বলেন, জমিতে ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করে ফসলের ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি রাসায়নিক সারের তুলনায় খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ কারণে কৃষকদের মধ্যে কেঁচো সারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
উদ্যোক্তা নাঈম হুদা বলেন, নিজের বাগানের জন্য সার তৈরি করতে গিয়ে তার এই উদ্যোগের শুরু। প্রথম দিকে বারবার ব্যর্থ হলেও চেষ্টা বন্ধ করেননি। এখন নিজের খামারে উৎপাদনের পাশাপাশি অন্যদেরও এ কাজে উৎসাহিত করছেন। তার লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এলাকায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা, যাতে বেকার যুবকরা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পান।
চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জহুরা সুলতানা বলেন, ভার্মি কম্পোস্ট মাটির উর্বরতা বাড়াতে এবং মাটির গুণাগুণ উন্নত করতে সহায়তা করে। সুষম সার ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে এ ধরনের জৈব সার ব্যবহার করা যেতে পারে। নাঈম হুদার মতো উদ্যোক্তাদের সাফল্য দেখে এলাকার বেকার যুবকদের মধ্যেও কেঁচো সার উৎপাদনের আগ্রহ বাড়ছে।
