গত বছর জাফলং-গোয়াইনঘাট থানার খাসিয়াপুঞ্জিতে চালু হয়েছে হোমস্টে। নদীঘেঁষা পাহাড়ের ওপর সবুজ পানের বরজঘেরা পুঞ্জি! শুরু থেকেই সুযোগ খুঁজছিলাম গ্রামীণ এই এলাকায় এক রাত কাটানোর। এবার অনেকটা জোরজবরদস্তি করেই সময় আর সুযোগ মিলিয়ে ফেললাম। হোমস্টের পরিচালক তথা হেডম্যানের নম্বর সংগ্রহ করে জানালাম, ঢাকা থেকে দুজন নারী ঘুরতে আসব। গুরুত্ব দিয়ে চাইলাম নিরাপদ থাকার জায়গা ও একজন নারী ট্যুর গাইড। সম্মতি দিলেন হেডম্যান।
সেদিন জাফলংয়ের বল্লা নদীর ঘাটে নামতেই হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানালেন আমাদের ট্যুর গাইড সরিনা খংস্তিয়া। তরুণ, হাসিমাখা মুখ; পরনে ঘরে পরার ঐতিহ্যবাহী পোশাক চোষতো। আগে থেকে ঠিক করে রাখা টমটমে চেপে আমরা রওনা হলাম পুঞ্জির উদ্দেশে।
পথের শুরুতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনার লন্ডনি বাজার, খাসিয়া সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, আরাধনার স্নিগ্ধ-নিবিড় উপাসনালয় গির্জা- সবকিছুই বর্ণনা করে যাচ্ছিলেন সরিনা। চারপাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা প্রবেশ করলাম পুঞ্জির ভেতর। আমাদের থাকার জায়গা ঠিক করা হয়েছিল নকশিয়াপুঞ্জির লাম্বা হোমস্টেতে। নতুন উদ্যোগ হলেও হোমস্টের প্রতিটি ঘর পরিচ্ছন্ন, ছিমছাম এবং প্রয়োজনীয় আসবাব দিয়ে সাজানো। বিশেষ করে মাথায় রাখা হয়েছে পরিবার ও নারী পর্যটকদের কথা। কমিউনিটির রেস্তোরাঁয় সকালের নাশতা করে সরিনার সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম ঘোরার উদ্দেশ্যে। এ পাড়ায় চারটি খাসিয়াপুঞ্জি। ফুলে ফুলে সাজানো একেকটি পুঞ্জির ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই পৌঁছে যাওয়া যায় জাফলংয়ের নয়নাভিরাম সমতলভূমির চা-বাগানে। চোখে পড়ে ওপারে মেঘালয়ের পাহাড় আর বয়ে চলা পিয়াইন নদী। দুপাশে বিশাল পানের বরজ আর মাঝখানে আধাপাকা সড়ক ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমরা তখন চা-বাগানে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আলাপ জমে গেল বন্ধুসুলভ সরিনার সঙ্গে। ঢাকার লালমাটিয়া মহিলা কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সরিনা। এরপর স্নাতকে ভর্তি হন সিলেটে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে। তবে মায়ের অসুস্থতা ও অর্থাভাবে শেষ বর্ষে এসে স্নাতক সম্পন্ন করতে পারেননি। পুঞ্জিতে হোমস্টে চালুর শুরু থেকেই যুক্ত হন ট্যুর গাইড হিসেবে। আমরা নারী গাইড চেয়েছিলাম- এ কথা জানাতেই বলেন, এ উদ্যোগে কর্মরত ১২ জন গাইডের আটজনই নারী।
আসলে খাসিয়াদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। এ সম্প্রদায়ের প্রতিটি উদ্যোগে কর্তৃত্ব, পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্ত থাকেন নারী-পুরুষ উভয়েই। চালু হওয়া হোমস্টেগুলোর দায়িত্বে আছেন পুঞ্জির নির্বাচিত ও বিচক্ষণ পুরুষরা। অন্যদিকে, পর্যটকদের গাইড হিসেবে আছেন সম্প্রদায়ের নারীরা। পর্যটকদের ঘোরাতে গিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে এলে নারীরা একত্রিত হয়ে সমাধান বের করেন। এভাবে পালাক্রমে পর্যটকদের গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন একেকজন নারী। প্রতি মাসে ৫-৬টি পর্যটকদলের দায়িত্ব পান সরিনা। নিজের এই আয় থেকে স্নাতক শেষ করার চিন্তাভাবনা করছেন তিনি।
এরপর বিশাল পানের বরজে ঘুরতে ঘুরতে সরিনা আরও জানান, এখানে কৃষিজমি, ঘরবাড়িসহ জায়গা ও সম্পদের মালিকানা থাকে নারীদের নামে। বেশির ভাগ সময় বিয়ের পর পুরুষেরা স্থায়ী হন স্ত্রীর বাড়িতে। একই সঙ্গে সন্তানরাও পরিচিত হয় মায়ের পদবিতে। লিঙ্গবৈষম্যের কারণে হয়রানির মতো বিষয় এখানে নেই। বরং নারী ও পুরুষের মধ্যে দেখা যায় সহযোগিতাপূর্ণ, হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। তাই হয়তো নীরব সবুজ বরজটিতে হাঁটতে আমাদের বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হচ্ছিল।
খাসিয়া পুরুষরা মনে করেন, সম্প্রদায়ের নারীদের দুর্যোগ ও বিপদ থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব তাদের। মা হিসেবে সন্তানদের প্রয়োজন ও সুযোগ-সুবিধা দেখেন নারীরা। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আবার এগিয়ে আসেন নারীরা, তখন পুরুষরা সহযোগীর ঢাল হয়ে দাঁড়ান। সরিনার সঙ্গে এসব গল্প যখন চলছিল, তখন আমরা পিয়াইন নদীর বুকে। পড়ন্ত বিকাল, এবার ঘরে ফেরার পালা।
