ছোট অঙ্কের বিনিয়োগে মুনাফা দিয়ে আস্থা অর্জন, এরপর বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ। একপর্যায়ে মূলধন ও মুনাফা ফেরত না দিয়ে শুরু হয় টালবাহানা। পাওনা পরিশোধের প্রতিশ্রুতিতে দেওয়া ব্যাংক চেকও নগদায়ন হয়নি। অর্থ ফেরত চাইতে গিয়ে হুমকি ও ভয়ভীতির শিকার হওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ব্যবসায় বিনিয়োগের নামে এমন প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে ঢাকার অ্যাডেফি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিনয় বর্মণ শুভ এবং চেয়ারম্যান আলভীনা শরীফ জুঁইয়ের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ, চেক প্রতারণা, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারী পলাশ রায় চৌধুরী ও তার স্ত্রী দেবযানি পাটোয়ারীর দাবি, তাদের পাওনা ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। তাদের অভিযোগ, পাওনা পরিশোধের জন্য দেওয়া চারটি ব্যাংক চেক নগদায়ন হয়নি। অর্থ ফেরত চাইলে প্রাণনাশ ও মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে তুলনামূলক কম অঙ্কের বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা দেওয়া হতো। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা তৈরি হয়। পরে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে মূলধন ও প্রতিশ্রুত মুনাফা ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয়। কখনো সময় চাওয়া, কখনো নতুন প্রতিশ্রুতি, আবার কখনো চেক দিয়ে পাওনা পরিশোধের আশ্বাসÑ এভাবেই অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়েছে।
অভিযোগে আরও চার বিনিয়োগকারীর পাওনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শাওন রহমানের দাবি করা পাওনা ৭০ লাখ ৮০ হাজার টাকা, খান মোহাম্মদ রেজাউল আলমের ৯৮ লাখ ৪০ হাজার, মো. শামসের ১৭ লাখ ২৫ হাজার এবং কাজী বজলে রাফির ১২ লাখ টাকা।
এই চারজনের দাবির সঙ্গে পলাশ রায় চৌধুরীর ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকা যোগ করলে পাঁচজনের মোট দাবিকৃত পাওনা দাঁড়ায় ২ কোটি ৪৩ লাখ ৯ হাজার টাকা। অভিযোগকারীদের দাবি, এর বাইরেও অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং মোট পাওনার পরিমাণ শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অভিযোগে বিনয় বর্মণ শুভ ও তার পরিবারের নামে গুলশান-২ এবং বনানীসহ বিভিন্ন স্থানে সম্পদ থাকার কথা উল্লেখ করে সেগুলোর অর্থের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে তারেক আল সামির নামে এক ব্যক্তিকেও সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সামির সম্প্রতি প্রতারণার অভিযোগে বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হন এবং জামিনে এসে বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন।
আলোচ্য অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক সূত্র রূপালী বাংলাদেশকে জানান, অ্যাডেফি লিমিটেডের নিবন্ধন, পরিচালনা পর্ষদ, নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, কর নথি, ব্যাংক হিসাব এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি যাচাই করা হচ্ছে। কত টাকা বিনিয়োগ হিসেবে নেওয়া হয়েছে, কত টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে প্রকৃত দায় কতÑ তা নির্ধারণের পাশাপাশি অর্থের গন্তব্যও অনুসন্ধান করা করা হচ্ছে।
অর্থ পাচারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ, সম্পদ জব্দ বা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থাও প্রযোজ্য আইন ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়া অনুসারেই নেওয়া হবে। এরই মধ্যে অনেক অভিযোগের প্রমাণ ও সত্যতা মিলছে বলে সূত্র জানায়।
আলোচিত অভিযোগ নিয়ে কথা বলার জন্য অভিযুক্ত ও মামলার এজাহারভুক্ত আসামি পলাতক বিনয় বর্মণ শুভ ও আলভীনা শরীফ জুঁইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পারা যায়নি। টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।