শরতের নীল আকাশ, শুভ্র কাশফুল আর শিউলির সুবাস যখন বাংলায় দেবীর আগমনী বার্তা নিয়ে আসে, তখন প্রবাসের ব্যস্ত জীবনেও জেগে ওঠে শিকড়ের টান। সুদূর জার্মানিতে সেই আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের মেলবন্ধন ঘটিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব ২০২৬। স্টুটগার্ট দুর্গাবাড়ী পূজা উদ্যাপন পরিষদের উদ্যোগে গত ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মার্টিন লুথার স্ট্রিটের (Martin-Luther-Str. 54) একটি গির্জায় পাঁচ দিনব্যাপী এই বর্ণাঢ্য উৎসবের আয়োজন করা হয়। গির্জার শান্ত-স্নিগ্ধ প্রাঙ্গণে শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ঢাকের বোলে রচিত হয় সম্প্রীতির অনন্য এক মিলনমেলা।
শিকড়ের টানে এক টুকরো বাংলা: নতুন প্রজন্মের উচ্ছ্বাস
জার্মানিতে বাংলা ভাষা, কৃষ্টি ও সনাতন ঐতিহ্য প্রসারে দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘স্টুটগার্ট দুর্গাবাড়ী’। তবে এবারের আয়োজনটি ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালির খাঁটি রূপটি তুলে ধরতে বিশেষ উদ্যোগ নেয় আয়োজক কমিটি। বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ঐতিহ্যবাহী পূজার উপকরণ ও সামগ্রী এনে প্রথমবারের মতো সফলভাবে গড়ে তোলা হয় নান্দনিক এক পূজামণ্ডপ। মাটির সুনিপুণ প্রতিমার ভেতর দিয়ে বাংলার লোকঐতিহ্য ও নিখুঁত কারুশিল্পের যে প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে, তা প্রবাসে বসবাসকারী সনাতন ধর্মাবলম্বী ও বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে। প্রবাসের কৃত্রিমতায় নয়, বরং দেশীয় আবহে দেবীকে বরণ করে নেওয়ার এই প্রয়াস উপস্থিত সবাইকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে ন্যায়ের আহ্বান
এক যৌথ শুভেচ্ছা বার্তায় উদ্যাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচার বা উৎসব নয়; এটি আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও আত্মপরিচয়ের এক চিরন্তন প্রতিচ্ছবি। পৌরাণিক দর্শন অনুযায়ী, মহিষাসুরের অন্যায় ও অত্যাচারের হাত থেকে সৃষ্টিকে রক্ষা করতেই দেবতাদের তেজ থেকে আবির্ভাব হয়েছিল দেবী দুর্গার। তাঁর দশ হাতে ধারণ করা বিভিন্ন অস্ত্র সমাজে ন্যায়বিচার, অদম্য সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামের প্রতীক। নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন, ২০২৬ সালের এই শুভ দুর্গোৎসব যেন ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে সারা বিশ্বে শান্তি, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করে।
এই সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দেন পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি শ্রী বিমল আগরওয়ালা, সহ-সভাপতি শ্রী প্রদীপ সাহা, সাধারণ সম্পাদক শ্রী সঞ্জীব কুমার দাস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্রী অভিষেক বাগ, কোষাধ্যক্ষ শ্রী পরীক্ষিত কুমার রায়, সহ-কোষাধ্যক্ষ শ্রী রজত বর্মন এবং ইভেন্ট কো-অর্ডিনেটর শ্রী কিশোর কুমার দাস।
ভক্তিময় আরাধনা ও সাংস্কৃতিক বর্ণচ্ছটা
উৎসবের প্রতিটি দিন সকাল ও সন্ধ্যায় ভক্তিভরে অনুষ্ঠিত হয় পূজা-অর্চনা, তিন বেলা পুষ্পাঞ্জলি এবং ধূপ-প্রদীপের আরতি। সন্ধ্যার প্রদীপের আলোয় তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। সন্ধ্যা, অর্চনা, সেতু, দীপা, সঞ্চিতা, বৃষ্টি, মিঠু, পলি, তুম্পা ও তপোতি গুড্ডি বৌদির চমৎকার সমবেত প্রদীপ নৃত্য উপস্থিত দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
জেনেট ও সঞ্চিতার প্রাঞ্জল উপস্থাপনায় আয়োজিত নাচ ও গানের মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উৎসবের আবহকে আরও রঙিন ও প্রাণবন্ত করে তোলে। শুধু আচার-অনুষ্ঠানই নয়, উৎসবের পাঁচ দিনজুড়েই ভক্তদের জন্য ছিল সুস্বাদু মধ্যাহ্নভোজ ও রাতের প্রসাদ বিতরণ। সঙ্গে ফুচকা, চটপটি ও ঝালমুড়ির মতো পরিচিত দেশীয় স্ট্রিট ফুডের আয়োজন প্রবাসের বুকেও দেশের মেলা প্রাঙ্গণের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনে।
এয়ার ইন্ডিয়ার সৌজন্যে ইতিহাস ও লাকি ড্র
উৎসবের আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ করে বিশ্বখ্যাত বিমান সংস্থা 'এয়ার ইন্ডিয়া'-র পৃষ্ঠপোষকতা। দুর্গাবাড়ী স্টুটগার্টের ইতিহাসে এই প্রথম যুক্ত হয় এয়ার ইন্ডিয়ার সৌজন্যে আকর্ষণীয় একটি লাকি ড্র। এতে রেজিস্ট্রেশন নম্বর #১০৪৮ নিয়ে বিজয়ী হন তিথি ঘোষ। প্রবাসের মাটিতে এমন ব্যতিক্রমী সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য এয়ার ইন্ডিয়ার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে পূজা উদ্যাপন পরিষদ।
অসুরশক্তি ও সকল অশুভের বিনাশ ঘটিয়ে দেবী দুর্গা মানবজাতিকে সম্প্রীতি, প্রজ্ঞা, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির শুভশক্তিতে জাগ্রত করবেন—এমনই শুভ প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে স্টুটগার্টের এই ঐতিহাসিক শারদ মিলনমেলার।