৯৯৯-এ ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ, হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবি; এলাকায় আতঙ্ক
খাইরুল ইসলাম, মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি:
মাগুরার মহম্মদপুরে গভীর রাতে একটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের বাড়ির সামনে পার্কিং করে রাখা প্রাইভেটকারে হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর এবং প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ উঠেছে। সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তদের এ হামলায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে।
বুধবার (২১ অক্টোবর ২০২৬) দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টা ১৫ মিনিটে মহম্মদপুর বাজার থেকে প্রায় ১৫০ মিটার উত্তরে মহম্মদপুর বাজার–রাজবাড়ী সড়কসংলগ্ন এলাকায় সাপ্তাহিক একুশে নিউজ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হাসানুজ্জামান সুমনের বাড়ির সামনে এ ঘটনা ঘটে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশের এলাকা। সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা বাড়ির সামনে পার্কিং করে রাখা একটি প্রাইভেটকারে অতর্কিত হামলা চালায়। এ সময় গাড়িটির তিনটি কাচ ভেঙে ভেতরে থাকা ল্যাপটপ, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, দুটি লাগেজ ও নগদ অর্থসহ আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
হামলার শিকার গাড়িটি ২০০৫ মডেলের টয়োটা এলিয়েন, যার রেজিস্ট্রেশন নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ-২১-০০২৮।
সম্পাদকের গাড়ি ভেবে পরিকল্পিত হামলার সন্দেহ
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় সম্পাদক হাসানুজ্জামান সুমন নিজ বাড়িতে ছিলেন না। তিনি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর হাটবাড়িয়া গ্রামের বাড়িতে একটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে অবস্থান করছিলেন।
এ কারণে তাঁর ব্যক্তিগত টয়োটা একজিও গাড়িটি নির্ধারিত পার্কিং স্থানে ছিল না। ওই স্থানে তাঁর নিকটাত্মীয় রফিকুল ইসলাম রউফের জামাতা শাহিনুর রহমান মিলনের টয়োটা এলিয়েন প্রাইভেটকারটি রাখা ছিল।
ভুক্তভোগীদের ধারণা, দুর্বৃত্তরা গাড়িটিকে সম্পাদক হাসানুজ্জামান সুমনের ব্যক্তিগত গাড়ি মনে করে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। তবে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও এর সঙ্গে কোনো পূর্বশত্রুতার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে, পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শাহিনুর রহমান মিলন জানান, গভীর রাতে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। বাইরে এসে দেখতে পান, বাড়ির সামনে রাখা প্রাইভেটকারটির তিনটি কাচ ভাঙা। গাড়ির ভেতরে থাকা ল্যাপটপ, লাগেজ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নগদ অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি অভিযোগ করেন, দুর্বৃত্তরা গাড়িটি ভাঙচুর করে মূল্যবান মালামাল নিয়ে পালিয়ে গেছে।
অন্যদিকে গাড়ি মালিকের ছেলে মো. রিফাত ইসলাম জানান, গাড়ির কাচ ভাঙার শব্দ শুনে তাঁরা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন। এ সময় পাঁচ থেকে ছয়জন ব্যক্তিকে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে দেখেন।
তাঁর দাবি, দুর্বৃত্তদের পিছু নিয়ে আমবাগানের সামনে একজনকে জাপটে ধরতে সক্ষম হন তাঁরা। কিন্তু ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যায়।
রিফাত ইসলাম আরও দাবি করেন, হামলার ঘটনায় সিরাজুল ইসলাম মুকুলের ছেলে হিমেল ও তাঁর মাকে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে তাঁদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা
গাড়ি ভাঙচুরের বিকট শব্দ শুনে সম্পাদকের ভাই মো. ফারুক হোসেন, বাবুল আক্তার বাবু ও আখতারুজ্জামান কাবুলসহ আশপাশের বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী রাজিব সিকদারসহ অন্যরা এগিয়ে এলে হামলাকারীরা দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যে জানা গেছে।
ঘটনার আকস্মিকতায় আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গভীর রাতে বসতবাড়ির সামনে এ ধরনের হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
৯৯৯-এ জরুরি ফোন, ঘটনাস্থলে পুলিশের অভিযান
হামলার পরপরই পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সম্পাদকের বড় ভাই মো. ফারুক হোসেন জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশের সহযোগিতা চান।
খবর পেয়ে মহম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে ক্ষতিগ্রস্ত প্রাইভেটকারটি পরিদর্শন করে এবং প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর অভিযুক্তদের শনাক্ত ও আটকের লক্ষ্যে পুলিশ তৎপরতা শুরু করে। তবে তাৎক্ষণিক অভিযানে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তদের বাড়িতে পুলিশ অভিযান চালালেও তাঁদের পাওয়া যায়নি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে অভিযুক্ত সিরাজুল ইসলাম মুকুলের স্ত্রী পুলিশের কাছে ঘটনার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন বলে একটি সূত্র দাবি করেছে। তবে এ দাবির বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
‘এটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ঘটনা, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’—সম্পাদক সুমন
এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন সাপ্তাহিক একুশে নিউজ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হাসানুজ্জামান সুমন।
তিনি বলেন, “সারাদিন আমি উপজেলার বিভিন্ন শারদীয় দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শনে ছিলাম। এরই ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১১টা ৩০ মিনিটে পত্রিকার সহকারী সম্পাদক এবং দৈনিক খোলা কাগজ ও এশিয়া পোস্টের জেলা প্রতিনিধি এস. এম. ফারহান, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আখতারুজ্জামান বিল্লাহ ও গোলাম মোরশেদ শিবলুকে সঙ্গে নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে দীঘা ইউনিয়নের হাটবাড়িয়া এলাকায় সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর বাড়ির পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যাই।”
তিনি আরও বলেন, “সেখানে অবস্থানকালেই জানতে পারি, মহম্মদপুরে আমার বাড়ির সামনে পার্কিং করে রাখা গাড়িতে দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মহম্মদপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এম শামীম আহমেদকে বিষয়টি অবহিত করি।”
হাসানুজ্জামান সুমন বলেন, “একজন সংবাদকর্মীর বাড়ির সামনে গভীর রাতে এ ধরনের হামলা অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ও নিন্দনীয়। আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। একই সঙ্গে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”
মামলা দায়েরের প্রস্তুতি, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির মালিকের পরিবার জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজনদের নাম উল্লেখ করে মহম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ ও মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, গভীর রাতে সংঘবদ্ধভাবে গাড়ি ভাঙচুর, মালামাল লুট এবং অস্ত্র দিয়ে আঘাতের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। তাঁরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
সাংবাদিকের বাড়ির সামনে হামলা, উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা
একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও পত্রিকার সম্পাদকের বাড়ির সামনে গভীর রাতে এমন হামলার ঘটনায় মহম্মদপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে হামলার নেপথ্যে ব্যক্তিগত শত্রুতা, পরিকল্পিত নাশকতা কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
তাঁদের মতে, আবাসিক এলাকায় রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধ হামলা ও লুটপাটের মতো অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। অন্যথায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
The post সম্পাদকের বাড়ির সামনে মধ্যরাতে দুর্বৃত্তদের তাণ্ডব: প্রাইভেটকার ভাঙচুর, ৫ লাখ টাকার মালামাল লুটের অভিযোগ appeared first on Daily Khaborer Alo.
