খুলনার ফুলতলা উপজেলা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে খুলনা-যশোর মহাসড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন ব্যক্তি মালিকানাধীন সুপার জুট মিল। অন্যদিকে, ফুলতলার শেষ সীমানায় উত্তর ডিহিতে রয়েছে বিশ্বমানের চামড়া কারখানা সুপারেক্স লেদার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠান দুটির অবকাঠামো ও সম্পত্তির বাজারমূল্য হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে একদিনে গড়ে ওঠেনি এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান দুটি। কঠোর পরিশ্রম ও অদম্য প্রচেষ্টায় তিল তিল করে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান দুটি এখন লোকসানের মুখে। অথচ একসময় এসব ব্যবসা থেকে দিনে ৩০ লাখ টাকা আয় হতো।
ফুলতলার হতদরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা শিল্পপতি ফিরোজ আহমেদ ভূইয়া বলেন, “জীবনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ শুরু করি। প্রথমে কাঁচামাল বিক্রি, পরে আম ব্যবসা, জ্বালানি কাঠ ও সাইজ কাঠের ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলাম। এসব ব্যবসা থেকে অনেক লাভ হচ্ছিল। পরবর্তীতে ইটভাটার ব্যবসা শুরু করি। সেখানেও ভালো আয় হচ্ছিল।”
ব্যবসা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০০৬ সালে মাত্র ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে সুপার জুট মিল প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ইরানের একটি পরিত্যক্ত জুট মিলের যন্ত্রাংশ ২৫ কোটি টাকায় কিনে ২০ কোটি টাকা লাভ করেন বলে জানান ফিরোজ আহমেদ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
প্রায় ১৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত জুট মিলটি বিশ্বের ২৪টি দেশে পাটের সুতা রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। একসময় এটি দেশের চতুর্থ বৃহৎ ব্যক্তি মালিকানাধীন জুট মিল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরপর তিন বছর সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সম্মাননাও অর্জন করে। প্রতিষ্ঠান দুটিতে প্রায় ১ হাজার ১০০ শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। প্রতিষ্ঠান দুটির অধিকাংশ লেনদেন হতো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মাধ্যমে।
যেভাবে ম্লান হতে থাকে সব অর্জন
ফিরোজ আহমেদ ভূইয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের দিকে ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার তারল্য ছিল। সে সময় ভালো ও সৎ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ঋণ বিতরণের জন্য ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল মান্নান দেশের ২০ জন শিল্পপতিকে ডাকেন। খুলনা থেকে শিল্পপতি ফিরোজ আহমেদকে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়। ব্যাংকের এমডি ও জোনাল ব্রাঞ্চ ম্যানেজারের মাধ্যমে তাকে মৌখিকভাবে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ফিরোজ আহমেদ বলেন, অতীতে ব্যাংকের সঙ্গে তার সবচেয়ে ভালো লেনদেন থাকায় কর্তৃপক্ষ তাকে বেছে নিয়েছিল। সেই আশ্বাসে তিনি ফুলতলার উত্তর ডিহিতে নিজের ও ইসলামী ব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ৪০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বমানের সুপারেক্স লেদার লিমিটেড।
মাত্র দুই বছরের মধ্যে সেখানে ৪ লাখ বর্গফুটের লেদার ট্যানারি স্থাপন করা হয়। কারখানাটিতে রয়েছে বিশ্বমানের যন্ত্রপাতি, ইটিপি প্ল্যান্ট ও অন্যান্য অবকাঠামো। কারখানার কোল্ড স্টোরে ৫ লাখ গরু ও ২ লাখ ছাগলের চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।
ফিরোজ আহমেদের দাবি, কারখানাটি পরিদর্শন করে ইউরোপের ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশের পরিদর্শকরা এটিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিহিত করেন। তারা কারখানাটিকে গ্রিন ফ্যাক্টরি হিসেবেও মূল্যায়ন করেন। কারখানার ভেতরে ছায়াঘেরা পরিবেশে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরাজি এর সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্যকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রতিষ্ঠানটির ডব্লিউএলজি সনদ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তার দাবি, পরিবেশবান্ধব এই গ্রিন ফ্যাক্টরি এশিয়ার মধ্যে সর্ববৃহৎ এবং বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম। পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন শুরু হলে দেশের মোট কাঁচা চামড়ার ২০ শতাংশ এখানে প্রক্রিয়াজাত করে পাকা চামড়ায় রূপান্তর করা সম্ভব। কারখানাটি প্রতিষ্ঠা করতে তিনি নিজের মূলধন ও জুট মিলের অর্থ থেকে ২০০ কোটি টাকা লেদার ফ্যাক্টরিতে স্থানান্তর করেন।
তবে ফিরোজ আহমেদের অভিযোগ, ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ব্যাংক থেকে তাকে মাত্র ২৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়। এরপর আর কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, মূলধনের সংকটে সুপার জুট মিলে কাঁচামালের অভাবসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। ফলে তিনি উভয় সংকটে পড়েন। একদিকে জুট মিল ঠিকমতো পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছিল না, অন্যদিকে লেদার ফ্যাক্টরিও পূর্ণমাত্রায় চালু করা যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে।
৯০০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা
ফিরোজ আহমেদ বলেন, “বর্তমানে ব্যাংক আমাকে খেলাপি ঋণ পরিশোধের তাগিদ দিচ্ছে।” তার দাবি, তিল তিল করে গড়ে তোলা শিল্পপ্রতিষ্ঠান দুটি এখন তার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাভাবে কারখানা দুটিতে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে, প্রতিদিন বাড়ছে ঋণের বোঝা।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিষ্ঠান দুটির ঋণ রয়েছে ৪৩০ কোটি টাকা। সুদসহ গ্রস ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকায়।
আক্ষেপ করে ফিরোজ আহমেদ বলেন, “জুট মিল থেকে আমার দিনে ৩০ লাখ টাকা আয় হতো। ইসলামী ব্যাংক আমাকে লেদার ফ্যাক্টরির স্বপ্ন না দেখালে আমি আজ ঋণখেলাপি হতাম না।”
তিনি আরও বলেন, “আমার দুটি কারখানা চালাতে এখন ৩০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। ইসলামী ব্যাংক অথবা অন্য কোনো ব্যাংক সুদমুক্ত সুবিধায় নতুন করে ৩০০ কোটি টাকা ঋণ দিলে আগামী দুই বছরের মধ্যে আমি সমুদয় ঋণ পরিশোধ করতে পারব।”
লেদার ফ্যাক্টরির ভেতরে থাকা ১৫ একর জায়গায় শতভাগ রপ্তানিযোগ্য চামড়ার ব্যাগ ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানান তিনি। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, সেখানে প্রতিদিন ১০ হাজার ব্যাগ তৈরি করা সম্ভব হবে। এতে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
