পরিস্থিতির কারণে হোক কিংবা নিজের সিদ্ধান্তে, এককভাবে সন্তান পালনের এই পথ বেছে নেওয়া নারীদের প্রতিটি পদক্ষেপেই থাকে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ। ভিন্ন পেশা ও বাস্তবতার তিন নারীর জীবনের মধ্য দিয়ে উঠে আসছে সিঙ্গেল মাতৃত্বের সেই বহুমাত্রিক চিত্র। লিখেছেন এস লুপিন
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সিঙ্গেল মাদার পরিচয় এখনো নানা প্রশ্ন, কৌতূহল ও সামাজিক চাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তবে সিঙ্গেল মাদার হওয়া মানেই একই ধরনের জীবন নয়। কারও সামনে অর্থনৈতিক সংগ্রাম, কেউবা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মুখোমুখি আবার কেউ কর্মক্ষেত্রে চাপের সম্মুখীন হন। আবার অনেকের কাছে এই পরিচয়ই হয়ে উঠেছে নিজের শক্তিকে নতুন করে আবিষ্কারের পথ।
সিঙ্গেল মাদার বলতে এমন একজন মাকে বোঝায়, যিনি সঙ্গী বা স্বামীর সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়াই এককভাবে সন্তানের লালন-পালন ও জীবনের নানা দায়িত্ব সামলান। স্বামীহারা, বিবাহবিচ্ছিন্না কিংবা সচেতনভাবে একা সন্তান পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া বিভিন্ন পরিস্থিতিতেই একজন নারী সিঙ্গেল মাদার হয়ে উঠতে পারেন।
আমাদের সমাজে অনেকেই আছেন, যারা নারীর বর্তমান পরিচয় দিয়ে না দেখে অতীত বা বৈবাহিক অবস্থান দিয়ে বিচার করেন। একজন নারী একা সন্তান বড় করছেন এটি তার চরিত্রের কোনো সার্টিফিকেট নয়, আবার দুর্বলতারও প্রমাণ নয়। কিন্তু সমাজ অনেক সময় তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এমন প্রশ্ন করে, যা একই পরিস্থিতিতে থাকা একজন পুরুষকে করা হয় না।
একজন সিঙ্গেল মাদার একই সঙ্গে অভিভাবক, উপার্জনকারী, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। সিঙ্গেল মায়ের গল্প শুধু সংগ্রামের গল্প নয়। এর মধ্যে আছে নিজের শক্তি আবিষ্কার, সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করার আনন্দ, আত্মমর্যাদা ধরে রাখা এবং নিজের পরিচয়ে দাঁড়িয়ে থাকার গল্পও।
‘সিঙ্গেল মাদার আমার পরিচয়েরই একটি অংশ’
সাফিয়া শামা, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী
দুই সন্তানকে একাই বড় করছেন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী সাফিয়া শামা। দীর্ঘ ১৯ বছরের এই যাত্রায় তিনি একই সঙ্গে মা, বাবা, উপার্জনকারী ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারীর ভূমিকা পালন করে এসেছেন।
সিঙ্গেল মাদার হওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল জানতে চাইলে সাফিয়া শামা বলেন, ‘একদিকে এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন, অন্যদিকে জীবন বদলে দেওয়ার মতো একটি যাত্রা।’ ২০০৭ সাল থেকে দুই সন্তানের শিক্ষা, নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত তার ওপরই ছিল। তখন বড় সন্তানের বয়স ছিল সাত বছর ও ছোট সন্তানের বয়স ছয় বছর।
তার ভাষায়, বাংলাদেশে একজন নারীকে এমনিতেই অনেক জায়গায় নিজেকে প্রমাণ করতে হয়। সেখানে সিঙ্গেল মা হিসেবে ব্যবসা করা এবং একই সঙ্গে সন্তানদের মানুষ করা আরও কঠিন।
তবে আজ পেছনে তাকিয়ে সেই সময়ের কষ্টের পাশাপাশি সাফল্যের আনন্দও উপভোগ করেন তিনি। দুই সন্তান বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটিই তার দীর্ঘ সংগ্রামের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি বলে মনে করেন।
সিঙ্গেল মা হওয়ার পর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার গুরুত্ব তিনি খুব কাছ থেকে বুঝেছেন। ব্যবসা শুরু করার পেছনে সেই অভিজ্ঞতারও বড় ভূমিকা ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিঙ্গেল মা হওয়ার পর তিনি খুব পরিষ্কারভাবে বুঝেছিলেন নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
সন্তানদের প্রয়োজনের জন্য অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হবে না, এমন একটি অবস্থানে পৌঁছানোর তাগিদই তাকে আরও পরিশ্রমী ও উদ্যোক্তা হতে সাহসী করেছে বলে জানান তিনি।
এ প্রসঙ্গে সাফিয়া শামা বলেন, তার সবচেয়ে বড় চেষ্টা ছিল সন্তানরা যেন কখনো মনে না করে তার কাজ বা ব্যবসার কারণে তারা অবহেলিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, একজন মায়েরও নিজের কাজ, দায়িত্ব ও স্বপ্ন থাকতে পারে। সব সময় হয়তো নিখুঁতভাবে ভারসাম্য রাখা সম্ভব হয়নি, তবে প্রতিটি সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিল সন্তানদের কল্যাণ।
এই যাত্রায় অর্থনৈতিক চাপও কম ছিল না। ব্যবসায় বিনিয়োগ, সংসারের খরচ এবং দুই সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় সব একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে তাকে। জীবনে অনেকবার আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষ করে দুই সন্তানকে বিদেশে পড়াশোনা করানো ছিল বড় আর্থিক দায়িত্ব।
ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। সিঙ্গেল মাকে অনেক সময় তার কাজের চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচয় দিয়ে বিচার করা হয় বলে মনে করেন তিনি।
ব্যবসার জগতেও একজন নারী হিসেবে নিজেকে অন্যদের চেয়ে বেশি প্রমাণ করতে হয়েছে। অবমূল্যায়ন, অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন ও বিভিন্ন সামাজিক বাধার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে তার কাজ, সিদ্ধান্ত ও অর্জনই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। সাফিয়া শামার বিশ্বাস, মানুষের ধারণা বদলানোর সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো নিজের কাজের মাধ্যমে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করা।
মায়ের এই সংগ্রাম সন্তানরা কতটুকু উপলব্ধি করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সন্তানদের ছোটবেলায় হয়তো তার সংগ্রামের পুরোটা বোঝার মতো বয়স ছিল না। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা বুঝতে পেরেছে, তাদের জন্য মাকে কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছে।
নিজের জীবনের দিকে তাকিয়েও এখন নতুন উপলব্ধি হয়েছে তার। অনেক বছর নিজের জন্য সময় বের করা কঠিন ছিল। সন্তান ও ব্যবসার দায়িত্বের মধ্যে নিজের প্রয়োজন বারবার পিছিয়ে গেছে। বয়স ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে তিনি বুঝেছেন, নিজের যত্ন নেওয়াও দায়িত্বের অংশ।
অন্য সিঙ্গেল মায়েদের উদ্দেশে তাই তার পরামর্শ, ‘ছোট থেকে শুরু করুন, কিন্তু শুরু করুন।’ চাকরি, ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন কাজ কিংবা নিজের কোনো দক্ষতাকে কাজে লাগানো, যে পথই হোক, নিজের একটি আয়ের উৎস তৈরি করা জরুরি।
নিজের প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা থেকে সাফিয়া শামা মনে করেন, সিঙ্গেল মা হওয়ার পর তার জীবন সহজ হয়নি; বরং দায়িত্ব বেড়েছে। তাকে আরও শক্ত হতে হয়েছে, অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত একা নিতে হয়েছে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সামলাতে হয়েছে।
তাই নিজের পরিচয় প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, ‘সিঙ্গেল মা হওয়া আমার পরিচয়ের একটি অংশ, কিন্তু আমার পুরো পরিচয় নয়। আমি একজন মা, একজন নারী, একজন উদ্যোক্তা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নিজের সিদ্ধান্তে নিজের জীবন গড়ে তোলা একজন মানুষ।’
‘আমি নিজেকে সিঙ্গেল মা হিসেবে দেখি না, আমি সিঙ্গেল প্যারেন্টস’
ফারহাতুল জান্নাত, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী
২০১০ সাল থেকে একমাত্র ছেলেকে বড় করছেন লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী ফারহাতুল জান্নাত। পারিবারিক কলহসহ নানা বাস্তবতার মধ্য দিয়ে একা সন্তান পালনের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। তবে নিজের পরিচয় নিয়ে তার একটি নিজস্ব অবস্থান আছে। তিনি নিজেকে ‘সিঙ্গেল মাদার’ না বলে ‘সিঙ্গেল প্যারেন্টস’ বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
কেন এমন পরিচয় জানতে চাইলে ফারহাতুল জান্নাত বলেন, ‘আমি নিজেকে সিঙ্গেল মা বলি না। আমি সিঙ্গেল প্যারেন্টস। তার মানে সন্তানের মা ও বাবা দুটোই আমি।’
একজন মা একা সন্তান বড় করার বাস্তবতা বাইরে থেকে দেখা আর নিজের জীবনে অনুভব করা এক বিষয় নয় বলে মনে করেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা তাকে সমাজের অনেক আচরণকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে। কারণ একা সন্তান বড় করতে গিয়ে একজন নারীকে শুধু সন্তানের দায়িত্বই নিতে হয় না; একই সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক প্রশ্ন, সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিজের মানসিক শক্তিও সামলাতে হয়।
একজন সামাজিক কর্মী হিসেবেও তিনি সিঙ্গেল মায়েদের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত। নিজের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক কাজ দুই জায়গার অভিজ্ঞতা তার চিন্তাকে আরও গভীর করেছে বলে জানান তিনি।
সিঙ্গেল মায়ের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়, যখন একজন নারীকে তার বর্তমান পরিচয় দিয়ে না দেখে অতীত বা বৈবাহিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা হয়। একজন নারী একা সন্তান বড় করছেন এটি তার চরিত্রের কোনো সার্টিফিকেট নয়, আবার দুর্বলতারও প্রমাণ নয়। কিন্তু সমাজ অনেক সময় তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এমন প্রশ্ন করে, যা একই পরিস্থিতিতে থাকা একজন পুরুষকে করা হয় না।
তার মতে, কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও একজন নারী দায়িত্ব নিয়ে সন্তান বড় করছেন এটি অসহায়ত্বের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ়তার পরিচয়।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রসঙ্গে ফারহাতুল জান্নাত বলেন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে একজন নারী নিজের ও সন্তানের বিষয়ে অনেক সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিতে পারেন না।
সিঙ্গেল মায়ের ক্ষেত্রে আয় শুধু নিজের জীবন চালানোর জন্য নয়; সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। তাই কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, ন্যায্য মজুরি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, সিঙ্গেল মায়েদের নিয়ে সমাজে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো যে, মানুষ ধরেই নেয় একজন সিঙ্গেল মা নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে ‘ভুল’ করেছেন।
আরেকটি হলো, মায়ের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অতিরিক্ত কৌতূহল। কেন তার সংসার টেকেনি, তার সঙ্গে কী হয়েছিল, তিনি আবার বিয়ে করবেন কি না–এই প্রশ্নগুলো অনেক সময় সহানুভূতির নামে করা হলেও এগুলো একজন মানুষকে আরও অস্বস্তিতে ফেলে। আমাদের বুঝতে হবে, একজন নারীর জীবনে যা ঘটেছে তার সবকিছুর ব্যাখ্যা সমাজকে দিতে হবে না।
সিঙ্গেল মায়েদের সন্তানদের নিয়েও নানা ধরনের সামাজিক মন্তব্য বা প্রশ্ন থাকে। আমি মনে করি, সন্তানের মানসিক সুস্থতা ও আত্মমর্যাদা রক্ষায় প্রথমেই শিশুকে বোঝাতে হবে, তার পরিবার অন্যদের পরিবারের মতো না হলেও তার কোনো কমতি নেই। শিশুর সামনে অন্য অভিভাবককে নিয়ে অসম্মানজনক কথা বলা উচিত নয়। একই সঙ্গে শিশুর প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়।
সবচেয়ে প্রয়োজন এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ, যেখানে সন্তান তার মায়ের সঙ্গে নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। স্কুলেও শিক্ষকদের সচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। কারণ অনেক সময় সমস্যাটি পরিবারে নয়, বাইরের মানুষের মন্তব্য থেকেই তৈরি হয়।
সিঙ্গেল মায়েদের উদ্দেশে তার বার্তা, নিজেকে কখনো শুধু ‘সিঙ্গেল মা’ পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা যাবে না। একজন নারী মা, কিন্তু তার আগে তিনি একজন মানুষ। তার নিজের স্বপ্ন, পছন্দ, সম্মান, আনন্দ ও ভবিষ্যৎও আছে।
সন্তানের জন্য বাঁচার পাশাপাশি নিজের জীবনটার জন্যও বাঁচার কথা বলেন ফারহাতুল জান্নাত। তার প্রত্যাশা, সন্তান বড় হয়ে যেন দেখে–তার মা কঠিন সময়ের কাছে হার মানেননি; বরং নিজের সম্মান ধরে রেখে জীবনকে এগিয়ে নিয়েছেন। তার কথায়, ‘একজন সিঙ্গেল মা করুণা পাওয়ার মানুষ নন। তিনি সম্মান পাওয়ার মানুষ।’
‘সিঙ্গেল মায়েরা পারে না–এটি প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া যাবে না’
লাবণ্য লিপি, সাংবাদিক
লাবণ্য লিপির গল্পটি অন্য দুই নারীর গল্প থেকে কিছুটা আলাদা। তার সিঙ্গেল মাতৃত্বের শুরু হয়েছিল প্রিয় মানুষকে হারানোর গভীর শোকের মধ্য দিয়ে। তখন তার ছেলের বয়স মাত্র আট মাস। স্বামীর মৃত্যুর পর শোকের চেয়েও বড় হয়ে সামনে এসেছিল সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তা। কীভাবে একা একটি শিশুকে বড় করবেন, কীভাবে সংসার চালাবেন, আর কর্মজীবী মা হিসেবে সবকিছু সামলাবেন–এসব প্রশ্ন একসঙ্গে ঘিরে ধরেছিল তাকে।
পেশায় সাংবাদিক এবং একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র সাব-এডিটর হিসেবে কর্মরত আছেন লাবণ্য লিপি। তার ছেলের বয়স এখন ১৮ বছরের বেশি। অর্থাৎ প্রায় ১৭ বছর ধরে একাই সন্তানকে বড় করছেন তিনি।
স্বামী মারা যাওয়ার পরের সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে লাবণ্য লিপি বলেন, প্রিয় মানুষটিকে হারানোর শোকের সঙ্গে বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সন্তানকে নিয়ে। তার মনে হচ্ছিল, এত বড় পৃথিবীতে একা একটি শিশুকে কীভাবে মানুষ করবেন। কারণ, একটি শিশুকে বড় করতে বাবা-মা দুজনই যেখানে হিমশিম খান, সেখানে কর্মজীবী একজন মা একা কীভাবে সব সামলাবেন–এই প্রশ্নই তাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছিল।
তার সামনে তখন ছিল দ্বৈত সংকট। কাজ না করলে সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব কীভাবে সামলাবেন, আবার এসব সামলে চাকরিই বা করবেন কীভাবে–এই ভাবনা তাকে ঘিরে থাকত। একসময় নিজেকেই বোঝান, তাকে পারতেই হবে।
নিজের সেই মানসিক অবস্থার কথা বলতে গিয়ে লাবণ্য লিপি বলেন, ‘আমাকে পারতে হবে। ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই পারতে হবে। নাহলে সিঙ্গেল মা পারে না–এটি আরও একবার প্রতিষ্ঠিত হবে।’
এরপর খুব দ্রুতই নিজেকে সামলে নেন তিনি। স্বামীর মৃত্যুর মাত্র ১৬ দিন পর সন্তানকে তার মায়ের কাছে রেখে অফিসে ফিরে যান। পেশাজীবনের শুরু থেকেই সাংবাদিকতার কাজের ধরন সম্পর্কে তার ধারণা ছিল। তাই ‘পারব না’–এই ভাবনাকে কখনো নিজের মধ্যে জায়গা দেননি।
রাত হোক বা দিন, জরুরি কাজ হোক কিংবা সন্তানের অসুস্থতা–সবকিছুকে মাথায় রেখেই এগিয়েছেন তিনি। কারণ, তার কাছে পরিষ্কার ছিল, সন্তানকে মানুষ করতে হলে এবং নিজে আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে হলে তাকে কাজ করতে হবে, উপার্জন করতে হবে। কখনো কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেরিয়ে গেছেন, আবার কখনো পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে কাজে ফিরেছেন। সব সময় চেষ্টা করেছেন দুই দিক সামলে চলতে।
কর্মক্ষেত্রে এই পথচলায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ে সহকর্মীদের কাছ থেকেই বেশি সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান লাবণ্য লিপি। খুব বেশি বিপদে পড়লে অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন। তবে প্রয়োজনের সময় সহকর্মীরা তার কাজ করে দিয়েছেন, দিয়েছেন মানসিক সমর্থনও। অবশ্য সবার আচরণ এক রকম ছিল না। কেউ কেউ আড়ালে সমালোচনাও করেছেন। কিন্তু তার অভিজ্ঞতায় নেতিবাচকতার চেয়ে ইতিবাচক মানুষের সংখ্যাই বেশি।
সিঙ্গেল মা হিসেবে সামাজিক মন্তব্যের মুখোমুখি হওয়া প্রসঙ্গেও তার অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন। তিনি মনে করেন, তার পেশাই অনেক সময় তার জন্য এক ধরনের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাংবাদিক পরিচয়ের কারণে মানুষ কোনো কথা বলার আগে কয়েকবার ভাবে। একই সঙ্গে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তও তাকে শক্ত অবস্থানে থাকতে সাহায্য করেছে।
তার ভাষায়, ‘নিজে কাজ করি, স্বাবলম্বী, কারও কাছে হাত পাতি না, তাই মাথা উঁচু করে চলি।’ এই আত্মনির্ভরতার কারণেই সমালোচনার পাশাপাশি মানুষের কাছ থেকে সমীহও পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
সন্তান অসুস্থ হলে কিংবা জরুরি কাজ থাকলে কখনো তাকে বোনদের বাসায় রেখে অফিসে যেতে হয়েছে। এভাবেই বড় হয়েছে তার ছেলে। এখন সে প্রাপ্তবয়স্ক। তাই আগের মতো শুধু মায়ের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করার বয়সে নেই; বরং জীবনের নানা বিষয় নিয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলে, নিজের মতামতও জানায়।
এখন তিনি নিজের সমস্যা, সুবিধা-অসুবিধা–সবকিছুই সন্তানের সঙ্গে ভাগ করে নেন। তার বিশ্বাস, এত বছরের অভিজ্ঞতায় ছেলে এখন তার পরিস্থিতি বোঝে। তবে সন্তান বড় হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুশ্চিন্তার ধরনও বদলেছে।
সিঙ্গেল মা হিসেবে নিজের অনুভূতি বলতে গিয়ে লাবণ্য লিপি বলেন, ‘আমার সন্তান এই পৃথিবীতে একা। আমি নিজের জীবনের কথা ভাবলে ওর দিকটা অনিশ্চয়তা হয়ে যায়। ওর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে ওর পাশে শক্ত হয়ে আমাকে দাঁড়াতে হবে। আমি তাই আছি।’
/এসএল
