।। জেমস আব্দুর রহিম রানা ।।
জনদুর্ভোগ কমানো, জনচলাচল নির্বিঘ্ন করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা—স্থানীয় প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যশোরের মণিরামপুরে দীর্ঘদিনের যানজট, ফুটপাত দখল ও বাজারকেন্দ্রিক নানা সমস্যার সমাধানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সম্রাট হোসেনের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মণিরামপুর বাজারের গরুহাটাসহ ব্যস্ততম সড়কগুলোর আশপাশের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ফুটপাত চলাচলের উপযোগী করা, দোকানপাটের অতিরিক্ত চালা ও ঝুলচালা অপসারণ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিকল্প স্থানে ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপগুলো নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের কোনো সমস্যা সমাধানে প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া এক বিষয়, আর সেই উদ্যোগের সুফল ধরে রাখা আরেক বিষয়। মণিরামপুরে সাম্প্রতিক কার্যক্রমের ইতিবাচক দিক হলো, জনদুর্ভোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কয়েকটি সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে মাঠপর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের অভিজ্ঞতায় চলাচলে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে এসব উদ্যোগের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে নিয়মিত তদারকি, আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতার ওপর।
মণিরামপুরের যানজট ও ফুটপাত দখলের সমস্যা নতুন নয়। বাজার এলাকায় ফুটপাত দখল হয়ে থাকলে পথচারীদের মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়ে, যান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্কদের ভোগান্তি তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে গরুহাটার আশপাশের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ফুটপাত উন্মুক্ত করা এবং দোকানের বাড়তি চালা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ জননিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল চলাচলের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।
স্থানীয় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুরাইয়া ইয়াসমিনের ভাষ্য, পৌরসভার পাশে মুরগিহাটা এলাকার রাস্তা ও আশপাশে মানুষের ভিড় এবং যানবাহনের কারণে আগে স্কুলে যাতায়াত করতে অসুবিধা হতো। রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় যানবাহনের ঝুঁকিও ছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো বলে সে জানায়। পথচারী আবু হাসান বলেন, ফুটপাত দখল থাকায় তাঁকে অনেক সময় মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হতো। যানবাহন খুব কাছ দিয়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকত; কখনো যানবাহনের সংস্পর্শে পোশাক ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি জানান।
পথচারী রুবি আক্তারের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের। তাঁর মতে, আগে সড়কে চলাচলের সময় যানবাহন খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করত। যানবাহনকে জায়গা দিতে গিয়ে কখনো অন্য পথচারীর সঙ্গে ধাক্কা লাগত, আবার কখনো পড়ে যাওয়ার উপক্রম হতো। এখন চলাচলে কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছেন বলে তিনি জানান।
যানবাহনচালকদের বক্তব্যেও বাজার এলাকার চলাচলে পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। ইজিবাইকচালক আবু তাহের বলেন, আগে বাজার এলাকা পার হতে কখনো কখনো এক ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যেত। বর্তমানে ভিড় কমায় চলাচল তুলনামূলক সহজ হয়েছে। ভ্যানচালক ওবায়দুর রহমানের ভাষ্য, দক্ষিণ মাথা থেকে গরুহাটায় যাত্রী নিয়ে আসা এবং যাত্রী ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে আগে নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় সমস্যা হতো। এখন নির্ধারিত স্থানে এ কাজ করা যাওয়ায় চলাচলে কিছুটা শৃঙ্খলা এসেছে।
গরুহাটার নিরাপত্তার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। গরু ব্যবসায়ী আবদুস সালামের বক্তব্য অনুযায়ী, হাটের বিভিন্ন স্থানে দোকানের সামনের অতিরিক্ত চালা ও সেগুলোর খুঁটি গবাদিপশু আনা-নেওয়ার সময় ঝুঁকি তৈরি করত। কখনো বাঁধন ছিঁড়ে গরু সড়কের দিকে চলে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে দড়ি চালার খুঁটিতে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত। গাড়িতে গবাদিপশু ওঠানো-নামানোর সময়ও অতিরিক্ত চালার সঙ্গে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। এ ধরনের স্থাপনা অপসারণ তাই শুধু চলাচলের পথ উন্মুক্ত করার বিষয় নয়; হাটের নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তবে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও জরুরি। কোথায় ব্যবসায়ীরা বসবেন, ক্রেতারা কীভাবে নির্বিঘ্নে কেনাকাটা করবেন এবং পথচারীদের চলাচলের জায়গা কীভাবে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকবে—এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। নিয়মিত তদারকি না থাকলে উচ্ছেদের পর আবারও ফুটপাত ও সড়কের পাশ দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
এ ক্ষেত্রে উচ্ছেদ হওয়া ক্ষুদ্র মুরগি ব্যবসায়ীদের মণিরামপুর মাছবাজারের দ্বিতীয় তলায় স্থান দেওয়ার উদ্যোগটি আলোচনার দাবি রাখে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের মতে, একই স্থানে একাধিক দোকান থাকায় ক্রেতারা বিভিন্ন দোকানের দাম, ওজন ও পণ্যের মান তুলনা করে কেনাকাটার সুযোগ পাচ্ছেন। নতুন স্থানে বিক্রির সুযোগও আগের তুলনায় ভালো বলে তাঁরা জানিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা ইতিবাচক হলেও ব্যবসায়ীদের প্রকৃত সুবিধা নিশ্চিত করতে বিক্রির পরিবেশ, ক্রেতাদের যাতায়াত, স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থা এবং দোকান পরিচালনার বাস্তব পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার।
একটি প্রসঙ্গে আলোচনার সময় ইউএনও মো. সম্রাট হোসেন লেখককে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পৌরসভার পাশে সরকারি জমি উদ্ধারের পর সেখানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি পৌর সুপারমার্কেট নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনার নেয়া হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে সকলের সহযোগিতায় পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য পরিকল্পিত পরিবেশ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এটি এখনো প্রাথমিক পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। তাই প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থায়ন, নকশা, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সম্ভাব্য সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। সরকারি জমির ব্যবহার যেন স্বচ্ছতা, জনস্বার্থ ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সম্রাট হোসেনের উদ্যোগগুলোর আরেকটি আলোচিত দিক হলো, স্থানীয়দের একটি অংশের মতে, তিনি রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে থেকে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। অতীতে রাজনৈতিক জটিলতা ও মতপার্থক্যের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে। সে প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে আইন ও বিধি অনুসরণ করে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা—রাজনৈতিক পরিচয় বা মতভেদ নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত এ ধরনের উদ্যোগের মূল ভিত্তি।
জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইউএনও মো. সম্রাট হোসেনের বদলির আদেশ ইতিপূর্বে দুইবার জারি হয়েছিল এবং পরে উভয় আদেশই বাতিল করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর কর্মস্থলে থাকা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তাঁর সাম্প্রতিক জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলোও মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে বলে বিভিন্ন মহলের বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে বদলির আদেশ বাতিলের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছাড়া এর সঙ্গে জনমত বা কোনো নির্দিষ্ট উদ্যোগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। প্রশাসনিক বদলি ও পদায়ন সরকারের নিজস্ব প্রক্রিয়ার অংশ; এ বিষয়ে মূল্যায়ন হওয়া উচিত প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে।
একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার কাজের মূল্যায়ন শুধু ব্যক্তিগত প্রশংসা বা সমালোচনার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। তাঁর সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি, নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব—এসবই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড। সেই বিবেচনায় মণিরামপুরে যানজট কমানো, ফুটপাত উন্মুক্ত করা, বাজার এলাকার নিরাপত্তা বাড়ানো এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিকল্প ব্যবস্থা দেওয়ার উদ্যোগগুলো ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে এসব পদক্ষেপের ফলাফল পর্যবেক্ষণ এবং কোনো সীমাবদ্ধতা থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধান করাও জরুরি।
মণিরামপুরের মতো জনবহুল বাজারকেন্দ্রিক এলাকায় জনদুর্ভোগ কমাতে শুধু উচ্ছেদ অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান বিধি প্রয়োগ, ব্যবসায়ীদের জন্য বাস্তবসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা এবং পথচারীদের চলাচলের অধিকার রক্ষায় ধারাবাহিক উদ্যোগ। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা যাতে অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টিও মানবিক ও বাস্তবসম্মতভাবে বিবেচনা করা দরকার। প্রশাসন, পৌর কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
মণিরামপুরে জনদুর্ভোগ কমাতে উপজেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো ইতিবাচক আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। ইউএনও মো. সম্রাট হোসেনের নেতৃত্বে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ধারাবাহিকতা পেলে নাগরিক চলাচল, বাজার ব্যবস্থাপনা ও জননিরাপত্তায় আরও সুফল আসতে পারে। তবে প্রশংসার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ফলাফল মূল্যায়নের চর্চাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য শুধু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদে কতটা নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে চলাচল করতে পারছেন, ব্যবসায়ীরা কতটা সুশৃঙ্খলভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন এবং সরকারি সেবা কতটা নিরপেক্ষভাবে নিশ্চিত হচ্ছে—তার মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।
লেখক: জেমস আব্দুর রহিম রানা।
সিনিয়র গণমাধ্যমকর্মী, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট।
