ভারতের বড় শহরগুলোর বাইরে জেলা ও মফস্বল পর্যায়ে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা। ব্ল্যাকস্টোন, কেকেআর, টিপিজি ও জেনারেল আটলান্টিকের মতো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে।
এতে ছোট শহরগুলোতে হাসপাতাল ও শয্যাসংখ্যা বাড়ছে। তবে চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে ভারতের স্বাস্থ্যসেবা খাতে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে বিভিন্ন বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এ খাতে প্রাইভেট ইক্যুইটি ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
ছোট শহরে হাসপাতাল ব্যবসার সম্ভাবনা
ব্ল্যাকস্টোনের অর্থায়নে পরিচালিত অ্যাস্টার ডিএম কোয়ালিটি কেয়ারের প্রধান নির্বাহী বরুণ খান্না বলেন, একসময় ছোট শহরে হাসপাতাল পরিচালনার লাভজনকতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের সংশয় ছিল। এখন সেই ধারণা বদলেছে। প্রতিষ্ঠানটির অধীনে ভারতে বর্তমানে ৩৯টি হাসপাতাল ও ১০ হাজারের বেশি শয্যা রয়েছে।
আগামী তিন থেকে চার বছরে আরও পাঁচ হাজার শয্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। গত আগস্টে কেকেআর প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে মেডিকভার ইন্ডিয়ার প্রায় পাঁচ হাজার শয্যার হাসপাতাল ব্যবসা অধিগ্রহণ করে। এ ছাড়া ব্ল্যাকস্টোন ও কার্লাইলের মতো প্রতিষ্ঠানও হাসপাতাল ও রোগনির্ণয়কেন্দ্রে বিনিয়োগ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রকোপ এবং মানুষের চিকিৎসার ব্যয় বহনের সক্ষমতা বাড়ায় এ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি
ভারতে বেসরকারি হাসপাতাল ব্যবসার প্রসারের অন্যতম কারণ সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা। অনেক সরকারি হাসপাতালে শয্যা, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথকেয়ার প্রোভাইডার্স ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে হাসপাতালের শয্যাসংখ্যায় আনুমানিক ২৪ লাখ ঘাটতি রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশ এবং বহির্বিভাগের ৭০ শতাংশ সেবা দেয় বেসরকারি খাত। অন্যদিকে, দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৫ শতাংশেরও কম স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হয়। গত আগস্টে প্রকাশিত এক সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনেও সরকারি বরাদ্দকে অপর্যাপ্ত বলা হয়েছে।
চার বছরে বাড়বে ৩৪ হাজার শয্যা
ভারতের রেটিং সংস্থা ইকরা জানিয়েছে, দেশটির ১৮টি বড় হাসপাতাল চেইন আগামী চার বছরে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন রুপি বা ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে। এতে ৩৪ হাজারের বেশি নতুন শয্যা যুক্ত হবে, যার প্রায় ৪০ শতাংশ হবে ছোট শহরগুলোতে।
দক্ষিণ ভারতের নাগেরকয়েল শহরের উপকণ্ঠে অ্যাস্টারের ২১০ শয্যার একটি হাসপাতাল এ সম্প্রসারণের উদাহরণ।
দুই বছর আগে চালু হওয়া হাসপাতালটির কারণে স্থানীয় রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রায় ৫০ মাইল দূরের তিরুবনন্তপুরম শহরে যেতে হচ্ছে না। এতে যাতায়াত ও আবাসন খরচও কমছে।
চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ
বেসরকারি হাসপাতালের বিস্তারে চিকিৎসার সুযোগ বাড়লেও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে পরিবারগুলোকে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৪০ শতাংশ নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়। চিকিৎসার ব্যয় বছরে ১২ থেকে ১৪ শতাংশ হারে বাড়ছে।
গত আগস্টে প্রকাশিত সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর গড় ভর্তি ব্যয় প্রায় ৫৩০ ডলার। সরকারি হাসপাতালে তা প্রায় ৭০ ডলার।
বেসরকারি হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) খরচ নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে কমিটি। চিকিৎসার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বিদেশি বিনিয়োগ ও বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের সুপারিশও করা হয়েছে।
পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রীতি কুমারের মতে, স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগ ও মুনাফার হিসাব ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে বিনিয়োগকারীদের যুক্তি, সরকারি স্বাস্থ্য খাতের অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ভারতের ছোট ও মাঝারি শহরগুলো হাসপাতাল ব্যবসার নতুন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ বাড়লেও চিকিৎসার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালে রাখা এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ।