যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা কমে যেতে পারে। একপর্যায়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে, এমনকি বিচারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও এর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্বল। নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হলেও আদালতকে সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ ধরনের পদক্ষেপের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলো ২০ মাসের বেশি সময় পেয়েছে। এ সময়ে আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সংকট মোকাবিলার শক্তি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।
তবে এখনো পদক্ষেপ নেওয়ার সময় শেষ হয়ে যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ছাড়ের সময়টুকু নিষ্ফল আলোচনা চালানোর জন্য নয়, বরং আদালতকে রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে হবে।
নিষেধাজ্ঞায় যেভাবে অচল হতে পারে আইসিসি
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় দেশটিতে থাকা বা মার্কিন নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকা আইসিসির সম্পদ ও অন্যান্য সম্পত্তিগত স্বার্থ জব্দ করা হয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি বা নির্দিষ্ট ছাড়ের আওতায় না পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইসিসির সঙ্গে ব্যবসা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
মার্কিন ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আইসিসিকে পণ্য বা সেবা দিতে কিংবা আদালতের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতে পারবে না, যদি এতে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের অনেক প্রতিষ্ঠানও সম্ভাব্য মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে আইসিসিকে সেবা দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে।
সরবরাহকারী ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে বিভিন্ন ঘটনায় আইসিসির তদন্ত ও অভিযোগ গঠনের কার্যক্রম অচল হয়ে যেতে পারে।
তবে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে ১৮০ দিনের একটি ‘ছাড়ের সময়সীমা’ রাখা হয়েছে। এ সময়ে আইসিসির কিছু কার্যক্রম চালু রাখা অথবা সেগুলো গুটিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এর আওতায় রয়েছে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে আদালতের অর্থপ্রাপ্তি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, স্বাস্থ্যবিমা ও চিকিৎসাসেবা। আদালতের কর্মী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের এসব সুবিধার পাশাপাশি বাড়িভাড়া, ইউটিলিটি বিল এবং নিয়মিত সেবার খরচ পরিশোধের সুযোগও রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া পৃথক অনুমতির মাধ্যমে নির্দিষ্ট টেলিযোগাযোগ, ক্লাউড ও সফটওয়্যার সেবা দেওয়া, আইসিসির পেনশনের অর্থ পরিশোধ এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন বন্দীর কল্যাণে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ওয়াশিংটন এই ছাড়ের সময়সীমাকে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি নিরসনে ‘কূটনৈতিক ও আইনি সমাধানে অর্থবহ অগ্রগতি’ দেখানোর সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু বাস্তবে এটি সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করার একটি প্রকাশ্য রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার।
‘সংলাপের’ নামে আপসের সুযোগ নেই
নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর আইসিসির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে অনেক সদস্যরাষ্ট্র। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনাও করেছে। কিন্তু এখন শুধু বিবৃতি দিয়ে আদালতকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা এবং আইসিসির স্বাধীনতা রক্ষায় সুসংগত ও সমন্বিত কৌশল ছাড়া এসব সমর্থন অর্থহীন। বিবৃতি দিয়ে ব্যাংকগুলোকে আইসিসির হিসাব বন্ধ করা থেকে, বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা প্রত্যাহার থেকে কিংবা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সেবা বন্ধ করা থেকে বিরত রাখা যাবে না। মার্কিন প্রতিশোধের ভয়ে অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও আদালতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বারবার বলেছে, আইসিসি আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের অন্যতম ভিত্তি। বাইরের চাপ থেকে আদালতের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। গত ১০ অক্টোবর ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস আবারও এ অবস্থান তুলে ধরেন। আদালত, এর কর্মকর্তা এবং আদালতের সঙ্গে সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধে হামলা বা হুমকিকে তিনি ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেন।
কিন্তু এসব বক্তব্যের বাইরে ইইউ কার্যত নিষ্ক্রিয় রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আরো ক্ষুব্ধ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের ঝুঁকি বাড়ানোর আশঙ্কা থেকে তারা এমন অবস্থানে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্র ও ইইউ যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এই অপমানজনক ছাড়ের সময়সীমাকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ‘সংলাপের সুযোগ’ এবং ‘কূটনীতির পরিসর’ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্যই যদি আদালতকে ধ্বংস করা হয়, তাহলে অর্থবহ সমঝোতার সুযোগ কোথায়?
গত ২০ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে আইসিসির বিরুদ্ধে চাপ বাড়িয়েছে। এখন সদস্যরাষ্ট্র ও ইইউ ভিন্ন ফল আশা করলে তা হবে আত্মপ্রবঞ্চনা। এর মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্য এবং আত্মমর্যাদার অভাব—দুটিই প্রকাশ পাবে। চাপ সৃষ্টিকারীদের তুষ্ট করার চেষ্টা তাদের আরো বেপরোয়া করে তোলে।
এ ধরনের চাপের মধ্যে সংলাপে বসলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে ফিলিস্তিনে আইসিসির তদন্ত থেকে সরে আসার চাপ তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিয়ে, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের প্রশাসনকে সন্তুষ্ট করতে ফিলিস্তিনবিষয়ক তদন্ত বিসর্জন দিলে আদালতের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা ধ্বংস হবে।
এতে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়—এমন ধারণা আরও জোরালো হবে। আইসিসির দায়িত্ব এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় থাকা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে আদালতের গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এই নীতির ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়বে।
আইসিসি রক্ষায় এখনই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন
কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় অনেক আগেই এসেছে। তবু এখনো দেরি হয়ে যায়নি। সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে নীতিগত অবস্থান নিতে হবে এবং তাতে অটল থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈরী একটি সদস্যবহির্ভূত দেশের সঙ্গে নিষ্ফল সংলাপ চালানো, তাদের কাছে করুণা ভিক্ষা করা কিংবা নিজেদের ও আদালতের পক্ষে বহন করা অসম্ভব—এমন ছাড় দেওয়ার পরিবর্তে আইসিসিকে রক্ষা এবং এর কার্যক্রম সচল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে প্রকাশ্যে আদালতের বাজেট বাড়ানোর অঙ্গীকার করতে হবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় আইসিসির প্রয়োজনীয় অর্থ, সম্পদ ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বহির্দেশীয় প্রভাব থেকে আদালত, এর কর্মকর্তা এবং সহযোগীদের সুরক্ষায় কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য নিষেধাজ্ঞা অমান্য করতে বাধ্য করার মতো পাল্টা আইন এবং আর্থিক ঝুঁকির অজুহাতে ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা প্রত্যাহার ঠেকানোর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আদালতের তদন্তে সহযোগিতা করার কারণে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া ফিলিস্তিনি নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোকেও একই সুরক্ষা দিতে হবে।
ইইউর উচিত অবিলম্বে তাদের ‘ব্লকিং স্ট্যাটিউট’ কার্যকর করা। এর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা নিষিদ্ধ করা সম্ভব হবে। এই পদক্ষেপ একাই সব সমস্যার সমাধান করবে না। তবে আইসিসিকে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
ইউরোপীয় কমিশনের কাছে ইইউর একাধিক সদস্যরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা এই আইন আইসিসিবিরোধী নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন। আদালতের ওপর সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও যাতে সুরক্ষাব্যবস্থা কার্যকর থাকে, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা। এ পদক্ষেপ আর পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
পাশাপাশি সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে বিকল্প ব্যাংকিং, অর্থ পরিশোধ ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ব্যবস্থা দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। এর মাধ্যমে আদালতের প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে। এসব উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে নিলে চলবে না। বরং রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি যুক্তরাষ্ট্রকে আইসিসি ধ্বংস করতে দেখে নীরব থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক আদালত, এমনকি কোনো জাতীয় আদালতের পক্ষেও ভয় বা পক্ষপাত ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করা অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
এএম
