দরজা খুলতেই ঘরে অধিষ্ঠিতা শ্বেতহস্তীর উপরে দেবী লক্ষ্মী! পূর্বপুরুষের দেখা সেই স্বপ্নই নাকি বদলে দিয়েছিল অধিকারী পরিবারের ইতিহাস। সেই থেকে শুরু। দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর। সময় বদলেছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসেছে, কিন্তু সিউড়ির অধিকারী বাড়িতে লক্ষ্মীপুজোর সেই পুরনো রীতিতে আজও ছেদ পড়েনি। দুর্গাপুজোর মতোই সপ্তমী থেকে দশমী, এই চারদিন ধরে চলে দেবীর আরাধনা।
পরিবারের সদস্য গৌর অধিকারী জানান, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ব্যবসার সূত্রে হুগলি জেলার দেবানন্দপুর থেকে সিউড়িতে এসেছিলেন। তখন তাঁরা রাধাবল্লভ মন্দিরে থাকতেন। পরে তৈরি হয় তাঁদের নিজস্ব বাড়ি। সেই সময়ই স্বপ্নাদেশ পান এক পূর্বপুরুষ। লক্ষ্মীপুজোর দিন দরজা খুলে দেখেন, ঘরে সামনে রয়েছেন শ্বেতহস্তীর উপরে অধিষ্ঠিতা মা লক্ষ্মী। সেই ঘটনাকে ঘিরেই শুরু হয় পারিবারিক পুজো।
এই পুজোয় প্রতিদিনের ভোগেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। সপ্তমীতে খিচুড়ি, অষ্টমীতে অন্নের ভোগ, নবমীতে পোলাও আর দশমীতে দই-চিঁড়ে নিবেদন করা হয় দেবীকে। কোজাগরী পূর্ণিমার দিনটিকে এই পরিবারে লক্ষ্মীপুজোর সপ্তমী হিসেবে পালন করা হয়। সেই দিন পরিবারের ছোট-বড় সকলেই উপবাস করেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলে পুজো ও যজ্ঞ। বাড়ির মহিলারাই নিজেদের হাতে ভোগ রান্না করেন। তবে এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ দশমীর কনকাঞ্জলি। নাটমন্দির থেকে দেবীকে বের করে বরণ করার পরে ধান-চাল পিছন দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়, আর সেই ধান-চাল আঁচলে গ্রহণ করেন পরিবারের গৃহকর্ত্রী। দেবীর বিদায়বেলায় এই রীতির মধ্যেই জড়িয়ে রয়েছে সংসারের মঙ্গল ও সমৃদ্ধির কামনা।
গৌর অধিকারী জানান, প্রতিমার ডাকের সাজ থেকে শুরু করে ঢাকি, পুরোহিত ও বিসর্জনের সময় কাঁধে করে প্রতিমা বহন—সব ক্ষেত্রেই বংশপরম্পরার রীতি বজায় রয়েছে। শ্বেতহস্তীর উপরে দেবী লক্ষ্মী, পাশে জয়া ও বিজয়া—এই বিশেষ প্রতিমাও পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আড়ম্বরের চেয়েও এখানে বড় হয়ে উঠেছে পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর পরিবারের ঐতিহ্যকে ধরে রাখার টান। সেই টানেই সাড়ে তিনশো বছর ধরে অধিকারী বাড়িতে ফিরে ফিরে আসে লক্ষ্মীপুজোর আনন্দ।
