হৃদ্যন্ত্রের পাম্প করার ক্ষমতা স্বাভাবিক থাকলেও অনেকের শরীরে দেখা দিতে পারে হার্ট ফেইলিউরের লক্ষণ। এ অবস্থায় হৃদ্যন্ত্রের বাম নিলয় যথাযথভাবে শিথিল হতে না পারায় রক্ত গ্রহণে সমস্যা হয়। ফলে শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি ও শরীরে পানি জমার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ সমস্যাকে বলা হয় সংরক্ষিত ইজেকশন ফ্র্যাকশনসহ হার্ট ফেইলিউর (এইচএফপিইএফ)।
এ রোগের চিকিৎসায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চিকিৎসা নির্দেশিকায় কী ধরনের মিল ও অমিল রয়েছে, তা নিয়ে একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘কিউরিয়াস’-এ। গবেষণাটির শিরোনাম ‘গ্লোবাল কনভারজেন্স অ্যান্ড ডাইভারজেন্স ইন ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস গাইডলাইনস ফর হার্ট ফেইলিউর উইথ প্রিজার্ভড ইজেকশন ফ্র্যাকশন: আ সিস্টেম্যাটিক কম্পারেটিভ রিভিউ’।
গবেষণাটিতে এইচএফপিইএফ চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক নির্দেশিকাগুলোর সুপারিশ তুলনা করা হয়েছে। রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা নির্বাচন এবং রোগীর ব্যবস্থাপনায় নির্দেশিকাগুলোর মধ্যে কোথায় সামঞ্জস্য রয়েছে, আর কোথায় পার্থক্য রয়েছে, সেটিই পর্যালোচনার মূল বিষয়।
হৃদ্যন্ত্রের প্রতিটি সংকোচনের সময় বাম নিলয় থেকে যে পরিমাণ রক্ত বেরিয়ে যায়, তাকে ইজেকশন ফ্র্যাকশন বলা হয়। এইচএফপিইএফে এই অনুপাত সাধারণত সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু হৃদ্যন্ত্রের পেশি শক্ত হয়ে যাওয়া বা যথাযথভাবে শিথিল হতে না পারার কারণে রক্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি হয়। ফলে হৃদ্যন্ত্রের ভেতরে চাপ বাড়তে পারে।
উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, বয়স বৃদ্ধি ও কিডনির বিভিন্ন সমস্যা এ রোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁটাচলায় শ্বাসকষ্ট, সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়া, পা ফুলে যাওয়া কিংবা শুয়ে থাকার সময় শ্বাস নিতে অসুবিধা হতে পারে।
এইচএফপিইএফের চিকিৎসায় শুধু উপসর্গ কমানো নয়, রোগীর সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করাও জরুরি। চিকিৎসকেরা সাধারণত কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেন।
১. শরীরে অতিরিক্ত পানি কমানো: শরীরে তরল জমে গেলে মূত্রবর্ধক ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। এতে পা ফোলা ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ কমতে পারে।
২. উপযুক্ত ওষুধ নির্বাচন: সোডিয়াম-গ্লুকোজ কোট্রান্সপোর্টার-২ (এসজিএলটি-২) ইনহিবিটর শ্রেণির ওষুধ নির্দিষ্ট রোগীদের ক্ষেত্রে হার্ট ফেইলিউরের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে।
৩. সহাবস্থানকারী রোগ নিয়ন্ত্রণ: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও কিডনির সমস্যার যথাযথ ব্যবস্থাপনা চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৪. নিয়মিত পর্যবেক্ষণ: রোগীর উপসর্গ, শারীরিক সক্ষমতা, ওষুধের প্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে চিকিৎসা পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হতে পারে।
আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় পার্থক্য কেন?
বিভিন্ন দেশের চিকিৎসা নির্দেশিকা তৈরির ক্ষেত্রে গবেষণার ফলাফল, রোগীদের বৈশিষ্ট্য, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এবং স্থানীয় চিকিৎসাব্যবস্থা বিবেচনা করা হয়। এ কারণে একই রোগের চিকিৎসায় কিছু সুপারিশে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে রোগ নির্ণয়ের মানদণ্ড, পরীক্ষার ফলের ব্যাখ্যা, নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহারের উপযুক্ত সময় এবং রোগীকে পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি চিকিৎসা সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। নির্দেশিকাগুলোর তুলনামূলক পর্যালোচনা চিকিৎসকদের এসব পার্থক্য বুঝতে এবং রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা বেছে নিতে সহায়তা করতে পারে।
তবে কোনো একটি নির্দেশিকাকে সবার জন্য সর্বোত্তম ধরে নেওয়া যায় না। রোগীর বয়স, অন্যান্য রোগ, উপসর্গের তীব্রতা ও চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার ধরন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।