বিশ্বের বৃহত্তম সামুদ্রিক খাদ্য রফতানিকারক চীন গত বছর প্রথমবারের মতো মুরগির মাংসে নিট রফতানিকারক হয়েছে। শুল্ক বিভাগের তথ্যানুযায়ী, গত বছর দেশটি ২৬০ কোটি ডলারের মুরগিজাত পণ্য রফতানি করেছে, যা ২০২০ সালের প্রায় দ্বিগুণ। চলতি বছর চীনের দুগ্ধপণ্য রফতানি ৬০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর পথে, যা তিন বছরে দ্বিগুণ হবে
চীনের মাংস ও দুগ্ধপণ্য উৎপাদনকারীরা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন করছেন। ফলে বাড়তি পণ্য রফতানি করে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছেন তারা। তুলনামূলক কম দামে মুরগির মাংস, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও দুগ্ধপণ্য সরবরাহ করে ইউরোপ থেকে ব্রাজিল ও থাইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠিত উৎপাদকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছে চীন। এতে বিশ্ববাজারে সস্তা প্রোটিনের জোগান বাড়লেও নতুন বাণিজ্যিক টানাপড়নের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
চীনের উইনটপ ফুডের মহাব্যবস্থাপক দাং ইয়াংইয়াং সম্প্রতি ঘানা, ইরাক, জর্ডান, রাশিয়া ও সেনেগালের ক্রেতাদের সময় দিয়েছেন। তাদের সবার আগ্রহ চীনা মুরগির মাংসে। প্রতিষ্ঠানটি বছরে ৬ কোটি মুরগি প্রক্রিয়াজাত করে ২০টির বেশি দেশে মুরগির বুকের মাংস, নাগেট, মিটবল ও ডাম্পলিং বিক্রি করে। গত বছর প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার অর্ধেক এসেছে রফতানি থেকে। এ আয় দিয়ে ৩৩ একর জমিতে সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
গত আগস্টে দাং বলেন, আগে বিদেশী ক্রেতারা পণ্যের মান নিয়ে সন্দেহ করতেন। কিন্তু প্রতি টনে ব্রাজিল ও থাইল্যান্ডের প্রতিযোগীদের তুলনায় এক হাজার ডলার কম দামে মাংস পাওয়া গেলে তাদের সামনে চীন থেকে কেনা অথবা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার বিকল্প থাকে।
চীনের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে অতীতের উদ্বেগ কাটিয়ে দেশটির উৎপাদকরা নতুন প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছেন। খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে বেইজিংয়ের উদ্যোগ এবং দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। তবে উৎপাদন অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাড়তি পণ্য বিদেশে বিক্রি করতে হচ্ছে।
চীনের সস্তা প্রোটিনপণ্যের এই উত্থান পশ্চিমা উৎপাদক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজর কেড়েছে। ইস্পাত, সৌর প্যানেল ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির মতো এসব পণ্যও কম দামে বাজারে প্রবেশ করে বিদেশী প্রতিযোগীদের ওপর চাপ তৈরি করছে। জুলাইয়ে চীনা পেকিন হাঁস আমদানির বিরুদ্ধে ভর্তুকিজনিত অসম প্রতিযোগিতার অভিযোগে তদন্ত শুরু করে ইউরোপীয় কমিশন। গত মাসে চীনা মটরশুঁটির প্রোটিনের ওপর ৪১ থেকে ৬৭ শতাংশ অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করা হয়। মুরগির মাংস এখনো একই ধরনের পদক্ষেপের মুখে পড়েনি, তবে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ বাজার পর্যবেক্ষণ করছে।
কৃষি ও খাদ্যপণ্য এমন কয়েকটি খাতের মধ্যে পড়ে, যেখানে এখনো চীনের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। গত বছর এ ঘাটতি ছিল ১০০ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি, তবে তা ছিল ২০২৪ সালের তুলনায় কম।
বিশ্বের বৃহত্তম সামুদ্রিক খাদ্য রফতানিকারক চীন গত বছর প্রথমবারের মতো মুরগির মাংসে নিট রফতানিকারক হয়েছে। শুল্ক বিভাগের তথ্যানুযায়ী, গত বছর দেশটি ২৬০ কোটি ডলারের মুরগিজাত পণ্য রফতানি করেছে, যা ২০২০ সালের প্রায় দ্বিগুণ। চলতি বছর চীনের দুগ্ধপণ্য রফতানি ৬০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর পথে, যা তিন বছরে দ্বিগুণ হবে।
শূকরের মাংস থেকে মুরগিতে ঝোঁক
দীর্ঘদিন ধরে চীনের মানুষের প্রধান প্রোটিনের উৎস ছিল শূকরের মাংস। দেশটির দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের সঙ্গে শূকর পালন এবং সয়াবিনের চাহিদাও বেড়েছিল। কিন্তু স্বাস্থ্যসচেতন শহুরে ভোক্তাদের মধ্যে চর্বিযুক্ত শূকরের মাংসের জনপ্রিয়তা কমেছে। সরকারি তথ্য ও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর মাথাপিছু শূকরের মাংস খাওয়ার পরিমাণ ১৩ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মাথাপিছু মুরগির মাংস খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ৫০ শতাংশের বেশি।
চাহিদা কমলেও মাংস ও দুগ্ধপণ্যের উৎপাদন বেড়েছে। ২০১৮ সালের আফ্রিকান সোয়াইন ফিভারের প্রাদুর্ভাব এবং করোনা মহামারীর পর পশুর সংখ্যা পুনর্গঠন ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় উৎপাদকদের ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। ওইসিডির তথ্যানুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনের কৃষি উৎপাদকদের মোট খামার আয়ের প্রায় ১৩ শতাংশ এসেছে ভর্তুকি থেকে, যা ২০০০-এর দশকের শুরুর তুলনায় প্রায় তিন গুণ।
বিদেশের বাজারে বাড়ছে প্রতিযোগিতা
চীনের বড় উৎপাদকদের জন্য বাড়তি উৎপাদন সামাল দেয়ার অন্যতম পথ এখন রফতানি। দুগ্ধপণ্য উৎপাদক ইলির বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা ঝাং ইউয়ান বলেন, চীনের প্রতিটি পশুপালন কোম্পানি বিদেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। প্রবৃদ্ধি চাইলে বিদেশের বাজারে যেতে হবে। ইলি আগামী বছর থেকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শিশুখাদ্য বিক্রি শুরু করার পরিকল্পনা করছে।
২০০৮ সালে মেলামিন দূষণে হাজার হাজার শিশু অসুস্থ হওয়ার পর চীনের দুগ্ধপণ্যের ওপর আস্থা সংকটে পড়েছিল। তবে বর্তমানে ইলির শিশুখাদ্য গুঁড়া চীনের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ব্র্যান্ড। প্রতিদ্বন্দ্বী ফেইহে এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়ায় তাদের শিশুখাদ্য বাজারজাত শুরু করেছে। এর আগে পণ্যটি ফিলিপাইনে চালু করেছিল প্রতিষ্ঠানটি।
পোলট্রি খাতেও উৎপাদন বাড়ছে। শানডং প্রদেশে উইনটপ গত এক দশকে প্রতিটি শেডে মুরগির সংখ্যা ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার করেছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্যানুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির মুরগির গড় ওজন ২ দশমিক ৫ কেজি, যেখানে ব্রাজিলের ব্রয়লারের গড় ওজন ২ দশমিক ২ কেজি। উইনটপ ৪২ দিনেরও কম সময়ে মুরগি জবাইয়ের উপযোগী করছে। তবে এর লক্ষ্য মার্কিন মানদণ্ডে ৩৫ দিনের মধ্যে মুরগি প্রস্তুত করা। প্রতিষ্ঠানটির ২ হাজারের বেশি কর্মীর বেতন ব্যয়ের একটি অংশ ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে স্থানীয় তেংঝৌ সরকার।
চীনের প্রতিযোগিতা এখন আন্তর্জাতিক বাজারেও স্পষ্ট। খাদ্যবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গিরার তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালের পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রক্রিয়াজাত পোলট্রি বাজারে চীনের হিস্যা দ্বিগুণ হয়ে ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। যুক্তরাজ্যে তা তিন গুণ বেড়ে ১৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। জাপানের বাজারেও চীনের অংশ বাড়ছে, বিপরীতে শীর্ষ সরবরাহকারী থাইল্যান্ডের অংশ কমছে।
থাই ব্রয়লার প্রসেসিং এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তা কুক্রিত আরেপাগর্ন বলেন, ক্রেতারা দর-কষাকষির সময় ক্রমেই চীনা মুরগির কম দামকে মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করছেন। লিসবনভিত্তিক মাংস ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ব্রানেক্সের চেয়ারম্যান এজেকিয়েল পিরেস জানান, আফ্রিকার ক্রেতারা ব্রাজিলের তুলনায় সস্তা পণ্য চাওয়ায় মার্চ থেকে তারা চীনা পোলট্রি কিনতে শুরু করেছেন। তার হিসাবে, চীনা মুরগির বুকের মাংস ও পায়ের অংশ ব্রাজিলের পণ্যের তুলনায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ সস্তা।
তবে চীনের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে অতীতের কেলেঙ্কারির কারণে আস্থার সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বিশ্লেষকদের মতে, পণ্যের নিরাপত্তা, উৎস শনাক্তযোগ্যতা ও মানের ধারাবাহিকতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরি করাই চীনা রফতানিকারকদের বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, আমদানি করা খাদ্যপণ্যকে স্থানীয় পণ্যের মতোই স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মান পূরণ করতে হয়। ২০২৭ সালে পোলট্রি পণ্য দিয়ে শুরু করে ইউরোপীয় ইউনিয়নে উৎপত্তিস্থল উল্লেখের নিয়ম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তারপরও দামের সুবিধাই চীনা পণ্যের বড় শক্তি। উইনটপের দাং জানান, তারা যত দেশে সম্ভব রফতানি করছেন। দামের উল্লেখযোগ্য সুবিধা থাকলে অনেক ক্রেতাই নিজেরা তাঁদের খুঁজে নেন।
রয়টার্স অবলম্বনে
