মতামত ডেস্ক: সম্প্রতি বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী ও বিসিএস ক্যাডার হওয়ার সুযোগ ছেড়ে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা বেছে নেওয়া এক নারীর জীবন নিয়ে বেশ আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক বা পাগলামি মনে করলেও এই ঘটনা মানুষের মনে সুখের সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে। কারণ একেক জনের কাছে সুখ বা শান্তির অর্থ একেক রকম হয়ে থাকে। কেউ বিলাসবহুল জীবন ও অর্থবিত্তে আনন্দ খুঁজে পান, আবার কেউ সাধারণ জীবনযাপন করেই তৃপ্ত হন। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষ অন্যের জীবনকে নিজের মতো করে মাপতে শুরু করে এবং সমাজের নির্দিষ্ট ছকের বাইরে কাউকে দেখলে তা সহজে মেনে নিতে পারে না।
আমাদের সমাজে এখনো ধরে নেওয়া হয় যে একটি নির্দিষ্ট পেশা, বড় অঙ্কের আয় কিংবা উচ্চপদস্থ চাকরি ছাড়া বুঝি জীবনে সুখী হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অথচ যাকে একজন নিজের সাফল্য বা স্বস্তি মনে করেন, অন্য কারও কাছে ঠিক সেটাই হতে পারে মানসিক বন্দিত্বের কারণ। মনের ভেতর যদি সবসময় অতৃপ্তি ও অস্থিরতা কাজ করে, তবে কেবল বাহ্যিক অর্জন দিয়ে কখনো মানুষের ভেতরের শূন্যতা দূর করা যায় না। অন্যের পছন্দ বা জীবনপদ্ধতির সঙ্গে নিজের মিল না থাকলেই যে সেই মানুষটির ভালো থাকার সম্ভাবনাকে খাটো করে দেখা হবে, তা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সুখী মানুষের জীবনযাত্রা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা গবেষণা ও সমীক্ষা পরিচালিত হয়ে আসছে। ফিনল্যান্ডসহ নরডিক দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব সুখ সূচকের শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে এবং এই দেশগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে সুখ কেবল ব্যক্তিগত অর্জন বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ওপর নির্ভর করে না। বরং কোনো রাষ্ট্র বা সমাজের সুশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, পারস্পরিক বিশ্বাস, সুযোগের সমতা এবং মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার পরিবেশ নাগরিকদের সুখী হতে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ডেনমার্ক, সুইডেন কিংবা নরওয়ের মতো দেশে নাগরিকদের জন্য উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাপনের নানা সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়, যা মানুষের মানসিক শান্তি বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভুটান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে জাতীয় সুখ বা সামগ্রিক কল্যাণকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে আসছে, যা প্রমাণ করে যে মানসিক শান্তি ও পরিবেশের সঙ্গেও সুখের গভীর সংযোগ রয়েছে। তবে ফিনল্যান্ড বা অন্যান্য উন্নত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার অনেক ফারাক রয়েছে। বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই জীবিকা হারানোর ভয়ে বা চিকিৎসার অনিশ্চয়তার কারণে নিজের ইচ্ছামতো জীবন বেছে নেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারেন না। ফলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা না থাকলে অনেকের কাছেই সুখের প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিগত পছন্দের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
সবশেষে বলা যায়, সুখের কোনো সর্বজনীন বা ধরাবাঁধা সংজ্ঞা তৈরি করা সম্ভব নয় কারণ একেকটি মানুষের ভাবনা, পছন্দ ও তৃপ্তির জায়গা সম্পূর্ণ আলাদা। নিজের ভালো লাগার কাজটি করে কেউ যদি আনন্দ পান, তবে সেটাই তার কাছে সুখের আসল রূপ হতে পারে। অন্যের সুখের পরিমাপ নিজের নিক্তি দিয়ে না মেপে যার যার মতো করে ভালো থাকার স্বাধীনতাকে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। দিনশেষে নিজের মনের সন্তুষ্টি এবং ব্যক্তিগত স্বস্তির ওপরই মানুষের প্রকৃত সুখ বহুলাংশে নির্ভর করে।
