রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পর্যটন কার্যক্রম চালু ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে খাগড়াছড়িতে মানববন্ধন করেছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীরা। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ১০টায় খাগড়াছড়ি শহরের শাপলা চত্বরে আয়োজিত এ কর্মসূচি থেকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সাজেক পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। অন্যথায় বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দেন আন্দোলনকারীরা।
মানববন্ধনে সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজ ব্যবসায়ী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অংশ নেন। কর্মসূচি শেষে পর্যটন কার্যক্রম স্বাভাবিক করা, নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং পর্যটননির্ভর মানুষের জীবিকা রক্ষাসহ বিভিন্ন দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, সাজেকের পর্যটনশিল্পের সঙ্গে রিসোর্ট, কটেজ, পরিবহন, রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন খাতের বহু মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা জড়িত। পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপনও কঠিন হয়ে উঠেছে। শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকদের আগমনকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীরা যে প্রত্যাশা করেছিলেন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
খাগড়াছড়ি যানবাহন মালিক সমিতির সভাপতি আয়ুস চাকমা বলেন, সাজেকের পর্যটন কার্যক্রমের সঙ্গে অনেক পরিবহন শ্রমিকের জীবিকা জড়িত। তাঁদের অনেকে দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কাজ বন্ধ থাকলে পরিবারের খাবার ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুত পর্যটনকেন্দ্রটি চালুর দাবি জানান তিনি।
কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন ছিল। দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ও ঋণের দায় নিয়ে ব্যবসায়ীরা আর্থিক চাপে রয়েছেন। দ্রুত পর্যটন কার্যক্রম চালু না হলে বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।
ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ইটাব)-এর সদস্য উজ্জ্বল দে বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে সাজেকের বিভিন্ন রিসোর্ট ও কটেজে পর্যটকদের বুকিং ছিল। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে রিসোর্ট-কটেজ মালিকদের পাশাপাশি পরিবহন শ্রমিক, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পর্যটনকেন্দ্রটি খুলে দেওয়ার দাবি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১১ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ডাকে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়। সাজেক থেকে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা পক্ষের সদস্যদের সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। অবরোধের কারণে পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটে। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়।
অন্যদিকে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১১ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের ১৩ অক্টোবর বিকেল ৫টার মধ্যে সাজেক ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে, দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় বৃহস্পতিবার (১৫অক্টোবর) সকাল থেকে সাজেক-দীঘিনালা সড়কে পুনরায় অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। সংবাদমাধ্যমে পাঠানো যৌথ বিবৃতিতে সংগঠন দুটির নেতারা এ ঘোষণা দেন।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা বলেন, তাঁদের দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা পার হলেও দাবিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি। দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে বলেও জানান তিনি।
যৌথ বিবৃতিতে জরুরি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যান, সংবাদপত্র বহনকারী যান এবং সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত সাংবাদিকদের গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে। একই বিবৃতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে অভিযান চালানোর অভিযোগও করা হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানান, ১১ অক্টোবরের অবরোধের পর অবরোধকারীদের কারও বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়নি। তাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কোনো ঘটনাও ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি।
ওসি আরও জানান, সাজেক এলাকায় সক্রিয় সশস্ত্র দলগুলোর বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর অভিযান চলছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ইউপিডিএফ ও জেএসএস—উভয় পক্ষকে লক্ষ্য করে এ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
স্মারকলিপিতে পর্যটকদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, ভ্রমণসংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া, পর্যটননির্ভর মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষা এবং বিরাজমান সমস্যার স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনার দাবি জানানো হয়।
আয়োজকেরা বলেন, নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম স্বাভাবিক করা প্রয়োজন। এতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট মানুষের জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।

