মানুষের জীবনে আত্মমূল্যায়ন একটি স্বাভাবিক বিষয়। মাঝেমধ্যে আমরা নিজের যোগ্যতা, সামর্থ্য, অর্জন এবং জীবনে কতটা এগোতে পেরেছি, তা নিয়ে ভাবি। নিজের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করি, ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করি। কিন্তু এই আত্মমূল্যায়ন যখন অন্যের সঙ্গে তুলনা করার অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন তা অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের বদলে হতাশা তৈরি করে।
আমার বিশ্বাস, অন্যের সাফল্য কখনো আমার ব্যর্থতার প্রমাণ নয়। একইভাবে, আমার সাফল্যও অন্য কাউকে ছোট করে না। কারণ প্রত্যেক মানুষের জীবন আলাদা, বাস্তবতা আলাদা, স্বপ্ন আলাদা এবং এগিয়ে যাওয়ার পথও আলাদা। তাই অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন মেলাতে গিয়ে নিজের অর্জনকে ছোট করে দেখার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
বিজ্ঞাপন
আমাদের সমাজে তুলনা করার প্রবণতা বেশ পরিচিত। কে কতটা প্রতিষ্ঠিত, কার আয় কত, কে কত দ্রুত সফল হয়েছেন, কার জীবনে কী কী অর্জন এসেছে—এসব বিষয় প্রায়ই আলোচনায় আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। সেখানে মানুষের জীবনের সাফল্য, আনন্দ, ভ্রমণ, অর্জন কিংবা বিলাসিতার দৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, পর্দায় দেখা জীবনের পুরো গল্প সেটি নয়। একজন মানুষের সাফল্যের পেছনে কতটা পরিশ্রম, ত্যাগ, ব্যর্থতা কিংবা প্রতিকূলতা রয়েছে, তা বাইরে থেকে সব সময় বোঝা যায় না।
ফলে অন্যের জীবনের দৃশ্যমান অর্জনের সঙ্গে নিজের জীবনের বাস্তবতার তুলনা করে আমরা অনেক সময় অযথা হতাশ হই। নিজের যেসব অর্জন একসময় আনন্দের কারণ ছিল, সেগুলোকেও তখন তুচ্ছ মনে হতে শুরু করে। অথচ প্রত্যেকের জীবনযাত্রা, সুযোগ-সুবিধা, পারিবারিক পরিস্থিতি ও দায়িত্ব এক নয়। সবার কাছ থেকে একই সময়ে একই ধরনের সাফল্য প্রত্যাশা করাও বাস্তবসম্মত নয়।
বিজ্ঞাপন
আমার কাছে সফলতার অর্থ শুধু অর্থ, পদমর্যাদা কিংবা সামাজিক পরিচিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করা, প্রতিকূলতার মধ্যেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, মানুষের প্রতি সম্মান বজায় রাখা এবং প্রতিদিন নিজেকে আরও উন্নত করার প্রচেষ্টাও সাফল্যের অংশ। কারও অর্জন হয়তো সহজেই চোখে পড়ে, আবার কারও সংগ্রাম ও অগ্রগতি নীরবেই এগিয়ে চলে। তাই সাফল্যের একটিমাত্র সংজ্ঞা দিয়ে সব মানুষকে বিচার করা যায় না।
কেউ হয়তো অল্প বয়সেই নিজের অবস্থান তৈরি করে ফেলেন। কেউ দীর্ঘ সময় চেষ্টা করার পর কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছান। আবার কারও জীবনে দায়িত্ব, পারিবারিক পরিস্থিতি কিংবা অপ্রত্যাশিত বাধার কারণে পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। এসব বাস্তবতা একজন মানুষের সামর্থ্য কিংবা সম্ভাবনাকে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে না।
জীবনের কোনো একটি সময়ে পিছিয়ে থাকা মানেই সারাজীবন পিছিয়ে থাকা নয়। আজ যে মানুষটি সংগ্রাম করছেন, আগামী দিনে তার পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। আবার আজ যিনি সাফল্যের শিখরে রয়েছেন, তার জীবনেও নতুন চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। জীবন স্থির কোনো প্রতিযোগিতা নয়; এটি পরিবর্তন, অভিজ্ঞতা ও শেখার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
বিজ্ঞাপন
এ কারণে আমি অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে চাই না। বরং নিজের গতকালের অবস্থানের সঙ্গে আজকের অবস্থান মিলিয়ে দেখতে চাই। গতকাল যে ভুল করেছি, আজ তা থেকে শিখতে পারলাম কি না; যে কাজটি করতে ভয় পেয়েছিলাম, আজ সেটির মুখোমুখি হতে পারলাম কি না; নিজের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে পালন করতে পারলাম কি না—আমার কাছে এসব প্রশ্ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যের সঙ্গে তুলনা করার পরিবর্তে নিজের উন্নতির দিকে মনোযোগ দিলে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখা সহজ হয়। এতে অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হওয়ার বদলে অনুপ্রাণিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। কারও ভালো কাজ থেকে শেখা যায়, কারও অভিজ্ঞতা থেকে নিজের ভুল সংশোধন করা যায়। কিন্তু সেই শেখার প্রক্রিয়াকে নিজের অপ্রতুলতা প্রমাণের উপায় বানিয়ে ফেলা উচিত নয়।
বিজ্ঞাপন
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, নিজের মূল্য অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল নয়। সবাই আমার কাজের প্রশংসা করবেন, সবাই আমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবেন কিংবা সবাই আমার অর্জনকে গুরুত্ব দেবেন—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, পছন্দ ও মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে। তাই অন্যের মতামত শোনা জরুরি হলেও নিজের আত্মমর্যাদা সম্পূর্ণভাবে অন্যের হাতে তুলে দেওয়া ঠিক নয়।
এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে হবে কিংবা নিজের ভুল ও সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করতে হবে। বরং নিজের মূল্য বোঝার পাশাপাশি নিজের দুর্বলতাগুলোও স্বীকার করতে হবে। কোথায় উন্নতি প্রয়োজন, কোন দক্ষতা অর্জন করা দরকার এবং কীভাবে আরও দায়িত্বশীল হওয়া যায়—এসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। আত্মবিশ্বাস তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সঙ্গে আত্মসমালোচনা ও শেখার মানসিকতাও থাকে।
আমি মনে করি, অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার তাড়নার চেয়ে নিজেকে উন্নত করার ইচ্ছা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যকে হারানোর লক্ষ্য নিয়ে এগোলে আমাদের মনোযোগ থাকে অন্যের অবস্থানের দিকে। আর নিজেকে উন্নত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোলে মনোযোগ থাকে নিজের কাজ, সিদ্ধান্ত ও সম্ভাবনার দিকে। প্রথমটি অনেক সময় অস্থিরতা বাড়ায়, দ্বিতীয়টি নিজের উন্নতির জন্য কার্যকর পথ তৈরি করে।
বিজ্ঞাপন
দিনশেষে প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কিছু অপূর্ণতা থাকবে, কিছু স্বপ্ন পূরণ হবে, কিছু স্বপ্নের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে। সবকিছু একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নিজের অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে নতুন করে শুরু করার সাহস রাখাও জরুরি।
আমি অন্য কাউকে ছাড়িয়ে যেতে চাই না। আমি চাই, গতকালের নিজের চেয়ে আজ একটু ভালো হতে। নিজের ভুল থেকে শিখতে, নিজের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে পালন করতে এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সামনে এগিয়ে যেতে। অন্যের সাফল্যকে সম্মান করতে চাই, কিন্তু সেই সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে মেপে নিজের অর্জনকে ছোট করতে চাই না।
কারণ শেষ পর্যন্ত জীবনের প্রকৃত প্রতিযোগিতা অন্যের সঙ্গে নয়, নিজের সীমাবদ্ধতা, ভয়, ভুল ও গতকালের অবস্থানের সঙ্গে। নিজের মূল্য বুঝতে অন্যের চেয়ে এগিয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নিজের প্রতি সৎ থাকা, নিজের পথকে সম্মান করা এবং থেমে না গিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা।
এমআরএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
