সাতক্ষীরায় সার ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
সাতক্ষীরায় সরকারি সার ডিলার নিয়োগের তালিকা ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ডিলার নিয়োগে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নাম আসার পর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাংশের ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত ব্যবসায়ী ও যোগ্য আবেদনকারীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় কাউকে কাউকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিতর্কিত নিয়োগ বাতিলের দাবি উঠেছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে সাতক্ষীরার পলাশপোল এলাকায় জেলা জজ আদালতের সামনে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে মানববন্ধন করেন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। একই দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনেও পৃথক কর্মসূচি পালন করে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাতক্ষীরা জেলা শাখা।
নিয়োগ তালিকায় রাজনৈতিক নেতাদের নাম, যাচাইয়ের দাবি
স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন কলারোয়ার যুবদল নেতা মমতাজুল ইসলাম চন্দন, সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জে এম দুদায়েভ মাসুদ অর্ঘ্য এবং তালা উপজেলার খলিষখালী ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান।
অভিযোগকারীদের দাবি, জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ডিলারশিপ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যুবদল, ছাত্রদল, কৃষক দল ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের পদধারী নেতাকর্মী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কারা দীর্ঘদিন ধরে সার বা কৃষি উপকরণের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং কারা নিয়োগের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছেন, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে রাজনৈতিক দলের পদে থাকা মানেই কেউ ডিলারশিপ পাওয়ার অযোগ্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে আবেদনকারীদের ব্যবসায়িক নথি, যোগ্যতা এবং মূল্যায়নপ্রক্রিয়া পরীক্ষা করা জরুরি।
পাটকেলঘাটা বাজারের সার ব্যবসায়ী কেশব সাধু ও জামাল উদ্দিন বলেন, ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের পরিবর্তে ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং সরকারি নীতিমালায় নির্ধারিত যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। তাঁদের দাবি, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে নিয়োগের শর্ত ও সংশ্লিষ্টদের ব্যবসায়িক নথি যাচাইয়ের আহ্বান জানান তাঁরা।
সরুলিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রাশেদুল হক রাজু ও বিএনপি নেতা কামরুজ্জামানও নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন।
মানববন্ধনে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
পলাশপোল এলাকায় খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কসংলগ্ন মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সাতক্ষীরা জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুস সামাদ, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান ভুট্টো, সদস্যসচিব শেখ শরিফুজ্জামান সজীবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।
জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুস সামাদ বলেন, সার ডিলার নিয়োগে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও যোগ্য আবেদনকারীদের বঞ্চিত করা হয়েছে। কোথাও কোথাও অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি। এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কামরুজ্জামান ভুট্টো বলেন, সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম হলে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তাই বিতর্কিত নিয়োগের অভিযোগ তদন্ত করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ডিলার নিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া ও শ্যামনগর উপজেলায় সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। কয়েকটি ডিলারশিপের বরাদ্দ এবং একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তির ডিলারশিপ পাওয়ার বিষয়টি নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে দাবি করেন তিনি।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব শেখ শরিফুজ্জামান সজীব অভিযোগ করেন, প্রকৃত ব্যবসায়ী ও যোগ্য ব্যক্তিদের বঞ্চিত করে অনিয়ম এবং অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকেরা সময়মতো ও ন্যায্যমূল্যে সার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এসব ঘটনায় প্রশাসনের পাশাপাশি জেলার কয়েকজন নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তোলেন সজীব। তিনি বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন করে ডিলার নিয়োগের দাবি জানান। এ বিষয়ে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
নিজের নিয়োগের বিষয়ে যা বললেন মাসুদ অর্ঘ্য
সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে আলোচনায় থাকা সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জে এম দুদায়েভ মাসুদ অর্ঘ্য বলেন, তিনি রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সব নিয়ম মেনেই তিনি ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
সংসদ সদস্যেরও তদন্তের দাবি
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহ বলেন, জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিএনপি নোংরা রাজনীতি করেছে। তাঁর অভিযোগ, প্রকৃত ব্যবসায়ীদের পরিবর্তে দলের নেতাকর্মীদের নামে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে, যা কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ঘোষিত ডিলারশিপের তালিকা তদন্ত করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সার ডিলারদের পৃথক কর্মসূচি
অন্যদিকে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাতক্ষীরা জেলা শাখার উদ্যোগে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে পৃথক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সংগঠনের জেলা সভাপতি শেখ শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন সার ডিলার মো. কুদরতই খোদা, সোলাইমান হোসেন, মো. ইব্রাহিম খান, মৃণাল মণ্ডল ও মো. বদিউজ্জামান।
বক্তারা কৃষি মন্ত্রণালয়ের সদ্য প্রণীত সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালার খসড়ার অনুমোদন স্থগিত করে ২০০৯ সালের নীতিমালা বহাল রাখার দাবি জানান। পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সার বিক্রিতে ডিলারদের কমিশন বাড়ানোর আহ্বান জানান তাঁরা।
তদন্তের অপেক্ষায় নিয়োগ বিতর্ক
সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনকারীদের যোগ্যতা যাচাই, মূল্যায়নপ্রক্রিয়া এবং চূড়ান্ত তালিকা তৈরির মানদণ্ড প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীদের একাংশ। তাঁদের মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হলে নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের সার সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও অনিশ্চয়তা কমবে।
