রাজধানীর ভাটারা এলাকায় পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া দেওয়া বাড়িতে ডিজে পার্টিতে অভিযান চালিয়ে ৮৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে পুরুষদের এক মাস এবং নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির এ তথ্য জানান।
ইলিয়াস কবির জানান, ডিএমপির ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পুরুষদের এক মাসের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নারীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাদের আরও তিনদিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ইলিয়াস কবির বলেন, ২০২৫ সাল থেকে সেখানে এ ধরনের আয়োজন চলছিল। মাসে প্রায় ২০-২২টি অনুষ্ঠান হতো। বাড়িভাড়া বাবদ ১০ জনের প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হতো।
এছাড়া অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নিবন্ধনকারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা নেওয়া হতো। তিনি বলেন, সেখানে ২৬ জন তরুণী ছিলেন। তাদের অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ২২ বছরের মধ্যে। এ ঘটনায় মাদক আইনে মামলা রুজু হয়েছে।
ডিবি জানায়, অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া বাড়িতে প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। ২০২৫ সাল থেকে এসব আয়োজন চলছিল। অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা এসব পার্টিতে যোগ দিতেন। এখান থেকে আয়ের ৭০ ভাগ যেত আব্দুল্লাহ আল জহিরের অ্যাকাউন্টে। আব্দুল্লাহ আল জহির বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও প্রভাবশালী কর্মকর্তা ছিলেন।
এদিকে এ ঘটনার পর অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ডিএমপির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির বলেন, অভিযানে গিয়ে দেখা গেছে ডিজে পার্টি চলছে। বাড়িটির বাইরে বেশকিছু গাড়ি ছিল। ২৬টি মেয়ে ছিল ইয়াং, অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ২২ বছর। তারা বেশির ভাগই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। একজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ব্যাংকার এবং ছাত্রও ছিল সেখানে। মূলত ডিজে পার্টির নামে সেখানে অর্ধ-উলঙ্গ নাচ চলছিল। শিশার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ছিল পুরো পার্টি রুম। ৫টি রুমের মধ্যে মেয়ে-ছেলে ছিল। সেখানে গিয়ে বিভিন্ন ব্যান্ডের তিন বোতল মদ, কুশ (মাদক), ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের বেশ কিছু সামগ্রীও পেয়েছি।
তিনি বলেন, বাড়িটির সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল খোদ অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির স্যারের কাছে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে। তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।
বুধবার রাজধানীর খিলক্ষেত থানাধীন ৩০০ ফিট সড়কসংলগ্ন পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি (পিওএইচএস)-১-এ গিয়ে দেখা যায়, মূল সড়কের শেষ প্রান্তে দুই নম্বর প্লটের ‘গোল্ডেন সানরাইজ’ নামের বাড়িটির সামনে ৬টি প্রাইভেটকার রয়েছে। এগুলো আটক হওয়াদের বলে জানা গেছে। গাড়ির সামনের গ্লাসের স্টিকার দেখে বোঝা গেছে, তারা প্রভাবশালী ব্যক্তির সন্তান। এদিকে সাড়ে ছয় কাঠা জমির একপাশে ছোট্ট তিনতলা বাড়ি। বাড়িটির সামনে বেশ কিছু জায়গা ফাঁকা। সেখানে টেবিল-চেয়ার সাজানো। তবে মূল গেট তালাবদ্ধ। বাড়ির প্রধান ফটক বিভিন্ন ফুলের গাছে মোড়ানো। এরকম অপরূপ সাজে সজ্জিত বাড়িটিতে চলে আসছিল মাদক ও নারী নিয়ে অসামাজিক কর্মকাণ্ড।
এদিকে আলোচিত এই বাড়ির ৫০ গজের মধ্যেই খিলগাঁও থানার পুলিশ ফাঁড়ি। চলতি বছরের ৮ মে ছয়তলা ফাঁড়ি ভবনটির কার্যক্রম উদ্বোধন করেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির।
কীভাবে পুলিশ ফাঁড়ির নাকের ডগায় এভাবে অসামাজিক কাজ চলতে পারে জানতে চাইলে ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ফাঁড়িটি এখনো পুরোদমে চালু হয়নি। আর ওখানে সিনিয়র স্যারদের বাসা। এসপি স্যারদের নিচে কারও বাসা নেই। আমাদের এখানে কিছু করার সুযোগ নেই। বাসাগুলোয় কী হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্যও আমাদের কাছে থাকে না। সিনিয়র স্যাররাই বিষয়গুলো দেখেন।’
বাড়ির পাশেই হাউজিংয়ের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীদের চেকপোস্ট। সেখানে কথা হয় কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে। তারা জানান, প্রায়ই বেশকিছু গাড়ি বাড়িটির সামনে পার্কিং করা থাকে। এখানে রাতভর গানবাজনা চলে। বিষয়টি সবারই জানা ছিল।
